বিশ্বের পোশাকবাজারে তুলাভিত্তিক পণ্যের বাইরে ম্যান মেইড ফাইবার, সিনথেটিক, অ্যাকটিভওয়্যার ও বিভিন্ন বিশেষায়িত পোশাকের চাহিদা বাড়ছে। তবে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি এখনো বড়ভাবে তুলার ওপর নির্ভরশীল।
সাম্প্রতিক বাণিজ্যতথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানির প্রায় ৭২ দশমিক ৭ শতাংশ তুলাভিত্তিক। বিপরীতে বিশ্ববাজারে তুলাভিত্তিক পোশাকের গড় অংশ প্রায় ৪১ দশমিক ৬ শতাংশ।
অর্থাৎ বৈশ্বিক পোশাকবাজার যেখানে ক্রমেই নন কটন পণ্যের দিকে এগোচ্ছে, সেখানে বাংলাদেশের রপ্তানি কাঠামো এখনো তুলাভিত্তিক পোশাককেন্দ্রিক। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই ব্যবধান বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতের পণ্য বহুমুখীকরণ নিয়ে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
বাংলাদেশ গার্মেন্ট ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন, বিজিএমইএর তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বে টেক্সটাইল ও পোশাকপণ্যের প্রায় ৭৫ শতাংশই নন কটন। অথচ বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানিতে নন কটন পণ্যের অংশ প্রায় ২৭ শতাংশের কাছাকাছি।
বিজিএমইএর জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি ইনামুল হক খান এর আগে বলেছেন, বিশ্ববাজার যখন সিনথেটিক, ব্লেন্ডেড ও কার্যকর বৈশিষ্ট্যের কাপড়ের দিকে এগোচ্ছে, তখন বাংলাদেশের পোশাক শিল্পকে পণ্য বহুমুখীকরণে আরও গুরুত্ব দিতে হবে। তবে নন কটন পণ্যের অংশ ধীরে ধীরে বাড়ছে বলেও শিল্প খাতের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
বাণিজ্যতথ্য বলছে, বিশ্বব্যাপী তুলাভিত্তিক পোশাকের অংশ ২০২১ সালের ৪৪ দশমিক ৯ শতাংশ থেকে ২০২৫ সালে ৪১ দশমিক ৬ শতাংশে নেমেছে। একই সময়ে নন কটন পোশাকের অংশ বেড়ে ৫৮ দশমিক ৪ শতাংশে পৌঁছেছে।
বাংলাদেশে চিত্রটি ভিন্ন। ২০২১ সালে দেশের পোশাক রপ্তানিতে তুলাভিত্তিক পণ্যের অংশ ছিল ৭২ দশমিক ৭ শতাংশ, যা ২০২৫ সালে বেড়ে ৭৪ দশমিক ৪ শতাংশে পৌঁছেছে। একই সময়ে নন কটন পোশাকের অংশ ২৬ দশমিক ৮ শতাংশ থেকে বেড়ে মাত্র ২৭ দশমিক ৩ শতাংশ হয়েছে।
শিল্পসংশ্লিষ্টদের মতে, আন্তর্জাতিক বাজারে এখন অ্যাকটিভওয়্যার, স্পোর্টসওয়্যার, পারফরম্যান্স পোশাক, প্রযুক্তিনির্ভর টেক্সটাইল ও ম্যান মেইড ফাইবারভিত্তিক পণ্যের চাহিদা বাড়ছে। চীন ও ভিয়েতনামের মতো প্রতিযোগী দেশগুলো এসব পণ্যে সক্ষমতা বাড়িয়েছে।
বাংলাদেশ ফরেন ট্রেড ইনস্টিটিউটের এক সাম্প্রতিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, বৈশ্বিক ম্যান মেইড ফাইবার পোশাকবাজার ২০৩০ সালের মধ্যে প্রায় ৩৭৫ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে। সঠিক নীতি, বিনিয়োগ ও শিল্প সক্ষমতা বাড়াতে পারলে এই বাজারে বাংলাদেশের অংশ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে।
বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাত দেশের প্রধান রপ্তানি আয়ের উৎস। ২০২৫ থেকে ২৬ অর্থবছরে এই খাত থেকে প্রায় ৩৮ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলারের রপ্তানি আয় হয়েছে, যা দেশের মোট রপ্তানি আয়ের প্রায় ৮০ দশমিক ৬ শতাংশ। ফলে বৈশ্বিক বাজারের পরিবর্তনের সঙ্গে পণ্যের ধরন ও উৎপাদন সক্ষমতা মানিয়ে নেওয়া খাতটির দীর্ঘমেয়াদি প্রতিযোগিতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
২০২৬ থেকে ২৭ অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়েও তৈরি পোশাক রপ্তানি ছিল প্রায় ৩ দশমিক ৮৯ বিলিয়ন ডলার। তবে আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় রপ্তানি কমেছে ১ দশমিক ৯২ শতাংশ।
বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্প এখন একদিকে বিশ্ববাজারে নিজেদের শক্ত অবস্থান ধরে রাখার চেষ্টা করছে, অন্যদিকে নতুন ধরনের পণ্যে সক্ষমতা বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তার মুখে রয়েছে। তুলাভিত্তিক মৌলিক পোশাকের বাইরে ম্যান মেইড ফাইবার ও উচ্চমূল্যের পণ্যে বিনিয়োগ বাড়াতে পারলে রপ্তানি বহুমুখীকরণে নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে।



