বিশ্বের প্রায় ১০০টি দেশে ২০২৬ সালের অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত এল নিনোর প্রভাবে অস্বাভাবিক বৃষ্টিপাত ও খরার ঝুঁকিতে থাকা এলাকায় বসবাস করবে ৩৪ কোটি ৭০ লাখের বেশি শিশু। এসব এলাকায় কোথাও তীব্র খরা, কোথাও অতিবৃষ্টি ও বন্যার আশঙ্কা রয়েছে। এর প্রভাব পড়তে পারে শিশুদের স্বাস্থ্য, পুষ্টি, নিরাপদ পানির প্রাপ্যতা ও শিক্ষার ওপর। ৬ অক্টোবর প্রকাশিত এক সতর্কবার্তায় এ তথ্য জানিয়েছে জাতিসংঘের শিশু তহবিল ইউনিসেফ।

সংস্থাটির পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ সালের এল নিনো সাম্প্রতিক ইতিহাসের সবচেয়ে শক্তিশালী ঘটনাগুলোর একটি হয়ে উঠতে পারে। প্রশান্ত মহাসাগরের পানির তাপমাত্রার পরিবর্তনের সঙ্গে সম্পর্কিত এই জলবায়ু পরিস্থিতি বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে বৃষ্টিপাতের স্বাভাবিক ধরন বদলে দিতে পারে। ফলে কিছু অঞ্চলে বৃষ্টির ঘাটতি দেখা দিতে পারে, অন্যদিকে কোথাও বাড়তে পারে অতিবৃষ্টি ও আকস্মিক বন্যার ঝুঁকি।

ইউনিসেফের নির্বাহী পরিচালক ক্যাথরিন রাসেল বলেছেন, শিশুদের জন্য এল নিনোর প্রভাব কেবল আবহাওয়ার পরিবর্তনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর ফলে বাস্তুচ্যুতি, অপুষ্টি, পানির সংকট ও রোগের প্রাদুর্ভাব বাড়তে পারে। পাশাপাশি স্কুল বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং পরিবারের আর্থিক সংকট আরও তীব্র হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে।

এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে সবচেয়ে বেশি শিশু ঝুঁকিতে

ইউনিসেফের হিসাব অনুযায়ী, এল নিনোর প্রভাবে অস্বাভাবিক বৃষ্টিপাতের ঝুঁকিতে থাকা এলাকাগুলোতে এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের প্রায় ১৯ কোটি শিশু বসবাস করে। অঞ্চলভিত্তিক হিসাবে এটিই সর্বোচ্চ সংখ্যা।

পূর্ব ও দক্ষিণ আফ্রিকায় এমন শিশুর সংখ্যা প্রায় ৪ কোটি ১০ লাখ। লাতিন আমেরিকা ও ক্যারিবীয় অঞ্চলেও প্রায় ৪ কোটি ১০ লাখ শিশু ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় রয়েছে। ইউরোপ ও মধ্য এশিয়ায় এ সংখ্যা ২ কোটি ২০ লাখ, মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকায় ২ কোটি এবং পশ্চিম ও মধ্য আফ্রিকায় আরও প্রায় ২ কোটি।

তবে এই পরিসংখ্যানের অর্থ এই নয় যে উল্লিখিত সব শিশুই সরাসরি দুর্যোগের শিকার হবে। ইউনিসেফের বিশ্লেষণে মূলত এমন এলাকাগুলো চিহ্নিত করা হয়েছে, যেখানে ২০২৬ সালের অক্টোবর-ডিসেম্বর সময়ে এল নিনোর কারণে স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি বা কম বৃষ্টিপাত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

সংস্থাটি ইউরোপীয় মধ্যমেয়াদি আবহাওয়া পূর্বাভাস কেন্দ্রের (ইসিএমডব্লিউএফ) মৌসুমি পূর্বাভাস, শিশুদের জনসংখ্যার তথ্য এবং অতীতের এল নিনো পরিস্থিতিতে বৃষ্টিপাতের ধরন বিশ্লেষণ করে এই হিসাব তৈরি করেছে। পূর্বাভাসে অস্বাভাবিক বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা ৭০ শতাংশ ধরে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলো চিহ্নিত করা হয়েছে। তবে অঞ্চলভেদে পূর্বাভাসের অনিশ্চয়তা রয়েছে এবং নতুন তথ্যের ভিত্তিতে হিসাব পরিবর্তিত হতে পারে।

কোথাও খরা, কোথাও বন্যার আশঙ্কা

এল নিনোর প্রভাব সব অঞ্চলে একই রকম হবে না। ইউনিসেফের তথ্য অনুযায়ী, ফিজি, ভানুয়াতু, সলোমন দ্বীপপুঞ্জ, তিমুর-লেস্তে, পাপুয়া নিউগিনি ও ফিলিপাইনের মতো কয়েকটি দেশে স্বাভাবিকের তুলনায় কম বৃষ্টিপাতের আশঙ্কা রয়েছে। এতে কৃষি উৎপাদন ব্যাহত হওয়া, পানির সংকট এবং খাদ্যনিরাপত্তার অবনতি ঘটতে পারে।

অন্যদিকে, আফ্রিকার বৃহত্তর হর্ন অঞ্চলে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা রয়েছে। বিশেষ করে সোমালিয়ায় অতিবৃষ্টির কারণে নদীর পানি বেড়ে বন্যা ও আকস্মিক প্লাবন দেখা দিতে পারে। এতে পানিবাহিত রোগ ছড়িয়ে পড়া, নিরাপদ পানির উৎস দূষিত হওয়া এবং শিশুদের পড়াশোনায় বিঘ্ন ঘটার ঝুঁকি রয়েছে।

ইউনিসেফের এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের পরিচালক সঞ্জয় উইজেসেকেরা বলেছেন, ওই অঞ্চলের বহু শিশু ও পরিবার আগে থেকেই জলবায়ুজনিত দুর্যোগ, সংঘাত, বাস্তুচ্যুতি ও অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যে রয়েছে। নতুন করে এল নিনোর প্রভাব দেখা দিলে তাদের স্বাস্থ্য, পুষ্টি, শিক্ষা ও নিরাপত্তার ওপর চাপ আরও বাড়তে পারে।

পড়াশোনা ও পুষ্টিতে বাড়তি চাপ

চরম আবহাওয়ার প্রভাব শিশুদের জীবনে শুধু তাৎক্ষণিক দুর্ভোগ তৈরি করে না; দীর্ঘমেয়াদেও এর পরিণতি হতে পারে। বন্যা বা খরায় পরিবারের আয় কমে গেলে শিশুদের পর্যাপ্ত খাবার, চিকিৎসা ও শিক্ষার ব্যয় বহন করা কঠিন হয়ে পড়ে। কৃষি উৎপাদন কমে গেলে খাদ্যের দাম বাড়তে পারে, আর পানির সংকট দৈনন্দিন জীবন ও স্বাস্থ্যবিধি বজায় রাখাকে কঠিন করে তুলতে পারে।

ইউনিসেফের হিসাবে, ২০২৫ সালে বিশ্বজুড়ে জলবায়ু-সংশ্লিষ্ট দুর্যোগের কারণে আনুমানিক ১৭ কোটি ১০ লাখ শিক্ষার্থীর পড়াশোনা ব্যাহত হয়েছিল। এল নিনোর কারণে বন্যা ও খরা বাড়লে স্কুল বন্ধ থাকা, নিয়মিত ক্লাসে যেতে না পারা এবং পড়াশোনা ছেড়ে দেওয়ার ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে।

বিশেষ করে সংঘাত ও বাস্তুচ্যুতিতে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোতে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে। আফগানিস্তান ও চাদের মতো দেশে খাদ্যসংকট, অপুষ্টি এবং প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবার সীমিত সুযোগের সঙ্গে জলবায়ুর বিরূপ প্রভাব যুক্ত হলে শিশুদের ঝুঁকি বাড়বে বলে সতর্ক করেছে সংস্থাটি।

ডিসেম্বর পর্যন্ত শক্তিশালী হতে পারে এল নিনো

বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা (ডব্লিউএমও) ৮ অক্টোবর প্রকাশিত পূর্বাভাসে জানিয়েছে, প্রশান্ত মহাসাগরের মধ্য ও পূর্বাঞ্চলের গ্রীষ্মমণ্ডলীয় পানির তাপমাত্রা ২০২৬ সালের অক্টোবর-ডিসেম্বর সময়ে রেকর্ড পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে। সংস্থাটির পূর্বাভাস অনুযায়ী, এল নিনো ডিসেম্বরের দিকে সর্বোচ্চ তীব্রতায় পৌঁছাতে পারে এবং এর প্রভাব ২০২৭ সালেও অব্যাহত থাকার আশঙ্কা রয়েছে।

তবে এল নিনোর পূর্বাভাস দিয়ে নির্দিষ্ট কোনো এলাকায় ঠিক কখন বন্যা বা খরা হবে, তা নিশ্চিতভাবে বলা যায় না। স্থানীয় আবহাওয়া, ভৌগোলিক অবস্থান ও অন্যান্য জলবায়ুগত পরিস্থিতিও দুর্যোগের ধরন নির্ধারণে ভূমিকা রাখে। এ কারণে মৌসুমি পূর্বাভাসের পাশাপাশি নিয়মিত স্থানীয় আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ ও আগাম সতর্কবার্তা গুরুত্বপূর্ণ।

দুর্যোগের আগেই প্রস্তুতি নেওয়ার আহ্বান

ঝুঁকি মোকাবিলায় সংকট দেখা দেওয়ার পর ত্রাণ কার্যক্রম শুরু করার পরিবর্তে আগেভাগে প্রস্তুতি নেওয়ার ওপর জোর দিয়েছে ইউনিসেফ। সংস্থাটি সরকার, দাতা সংস্থা ও সহযোগী প্রতিষ্ঠানগুলোকে আগাম অর্থায়ন, দুর্যোগ মোকাবিলায় সক্ষম অবকাঠামো গড়ে তোলা এবং শিশুদের জন্য জরুরি সেবা সচল রাখার আহ্বান জানিয়েছে।

এর মধ্যে রয়েছে নিরাপদ পানির উৎস সুরক্ষিত রাখা, স্বাস্থ্য ও শিক্ষাসেবা চালু রাখার প্রস্তুতি, জরুরি প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম আগে থেকেই মজুত করা এবং ঝুঁকিতে থাকা পরিবারগুলোর কাছে দ্রুত সহায়তা পৌঁছানোর ব্যবস্থা করা। পাশাপাশি আগাম সতর্কবার্তা কার্যকর করা এবং দুর্যোগের সময় মানবিক সহায়তা পৌঁছানোর সুযোগ নিশ্চিত করার ওপরও গুরুত্ব দিয়েছে সংস্থাটি।

ইউনিসেফের হিসাবে, দুর্যোগের ঝুঁকি কমানো ও আগাম প্রস্তুতিতে ব্যয় করা প্রতি এক মার্কিন ডলারের বিপরীতে পুনরুদ্ধার ব্যয়ে সর্বোচ্চ ১৫ ডলার পর্যন্ত সাশ্রয় হতে পারে। অথচ সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, মানবিক সহায়তার মোট অর্থায়নের ১ শতাংশেরও কম আগাম পদক্ষেপে ব্যয় করা হয়।

আগামী কয়েক মাসে আবহাওয়ার পরিবর্তন কতটা তীব্র হবে, তা অঞ্চলভেদে ভিন্ন হতে পারে। তবে পূর্বাভাসের মাধ্যমে হাতে পাওয়া এই সময়কে কাজে লাগিয়ে শিশুদের খাদ্য, পানি, স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষা সুরক্ষিত রাখাই এখন সবচেয়ে বড় প্রস্তুতির বিষয়। দুর্যোগ আঘাত হানার পর পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার অপেক্ষায় না থেকে আগেই কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে ইউনিসেফ।