জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে আটলান্টিক মহাসাগরের গুরুত্বপূর্ণ স্রোতব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়লেও ভবিষ্যতে তা আবার শক্তি ফিরে পেতে পারে। ডেনিশ আবহাওয়া ইনস্টিটিউটের (DMI) নতুন এক গবেষণায় এমন সম্ভাবনার কথা উঠে এসেছে। তবে এ জন্য বৈশ্বিক উষ্ণতা কমাতে হবে এবং পুরো প্রক্রিয়া সম্পন্ন হতে কয়েক শতাব্দীও লেগে যেতে পারে।
১৪ অক্টোবর বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, গবেষণাটি বিজ্ঞান সাময়িকী Science Advances-এ প্রকাশিত হয়েছে। এতে আটলান্টিক মেরিডিওনাল ওভারটার্নিং সার্কুলেশন বা AMOC নামের গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রস্রোতব্যবস্থার ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।
AMOC আটলান্টিক মহাসাগরের এমন একটি স্রোতব্যবস্থা, যা ক্রান্তীয় অঞ্চল থেকে উষ্ণ পানি উত্তর দিকে আর্কটিক অঞ্চলের দিকে পরিবহন করে। এই প্রক্রিয়া ইউরোপের শীতকাল তুলনামূলকভাবে মৃদু রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। পাশাপাশি বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের তাপমাত্রা, বৃষ্টিপাত ও সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতার ওপরও এর প্রভাব রয়েছে।
বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির ফলে সমুদ্রের পানির তাপমাত্রা বাড়ছে। একই সঙ্গে গ্রিনল্যান্ডের বরফ গলে বিপুল পরিমাণ মিঠাপানি আটলান্টিকে মিশছে। এতে সমুদ্রের পানির লবণাক্ততা ও ঘনত্বের পরিবর্তন ঘটছে, যা AMOC-এর স্বাভাবিক প্রবাহ দুর্বল হওয়ার অন্যতম কারণ।
নতুন গবেষণায় বিজ্ঞানীরা একটি জলবায়ু মডেল ব্যবহার করে দেখেছেন, তাপমাত্রা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে স্রোতব্যবস্থাটি ধীরে ধীরে দুর্বল হতে পারে। তবে মডেলটিতে এমন কোনো অপরিবর্তনীয় পর্যায়ের প্রমাণ পাওয়া যায়নি, যেখানে পৌঁছানোর পর তাপমাত্রা কমলেও স্রোতব্যবস্থার পুনরুদ্ধার আর সম্ভব হবে না।
গবেষণার প্রধান লেখক চুনচেং গুও জানিয়েছেন, তাঁদের মডেলে বৈশ্বিক উষ্ণতা কমতে শুরু করলে AMOC-ও আবার শক্তি ফিরে পেতে শুরু করে। তবে পুনরুদ্ধার শুরু হওয়া এবং আগের অবস্থায় পুরোপুরি ফিরে আসা এক বিষয় নয়। সম্পূর্ণ প্রক্রিয়ায় কয়েক শতাব্দী লেগে যেতে পারে।
গবেষণায় একটি চরম পরিস্থিতিও পরীক্ষা করা হয়েছে। সেখানে বৈশ্বিক তাপমাত্রা প্রায় ৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস বাড়লে প্রতি সেকেন্ডে প্রায় ১ কোটি ৭০ লাখ ঘনমিটার পানির প্রবাহ কমে প্রায় ৬০ লাখ ঘনমিটারে নেমে আসতে পারে বলে দেখা যায়। তবে এই তাপমাত্রা বৃদ্ধির পরিস্থিতি বর্তমান জলবায়ু পূর্বাভাসের তুলনায় অনেক বেশি এবং মূলত বৈজ্ঞানিক পরীক্ষার উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হয়েছে।
গবেষণার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ হলো, AMOC পুনরুদ্ধার করতে পারলেও গ্রিনল্যান্ডের গলে যাওয়া বরফ একইভাবে ফিরে আসবে না। একবার বিপুল পরিমাণ বরফ গলে সমুদ্রে মিশে গেলে বৈশ্বিক তাপমাত্রা পরবর্তী সময়ে কমলেও সেই ক্ষতি সহজে পূরণ হওয়ার সুযোগ নেই।
গবেষকদের হিসাবে, বৈশ্বিক উষ্ণতা ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বাড়ার পর গ্রিনল্যান্ডের বরফ গলার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা প্রায় ২০ সেন্টিমিটার পর্যন্ত বাড়তে পারে।
তবে গবেষণাটির কিছু গুরুত্বপূর্ণ সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। পুরো ফলাফল একটি জলবায়ু মডেলের ওপর ভিত্তি করে তৈরি। এ ছাড়া AMOC পুনরুদ্ধারের জন্য মডেলটিতে যে হারে পৃথিবীর তাপমাত্রা কমানো হয়েছে, বর্তমান প্রযুক্তি দিয়ে বাস্তবে তা অর্জন করা সম্ভব বলে মনে করা হচ্ছে না।
গবেষণার সঙ্গে যুক্ত নন এমন বিজ্ঞানীরাও ফলাফলটি সতর্কতার সঙ্গে দেখার পরামর্শ দিয়েছেন। পটসডাম ইনস্টিটিউট ফর ক্লাইমেট ইমপ্যাক্ট রিসার্চের গবেষক উইলেম হুইসক্যাম্পের মতে, বাস্তব পরিস্থিতিতে AMOC মডেলে দেখানোর মতো এতটা স্থিতিশীল কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
বিজ্ঞানীরা বলছেন, AMOC দুর্বল হয়ে পড়লে বিশ্বের বৃষ্টিপাতের ধরনে পরিবর্তন আসতে পারে এবং উপকূলীয় অঞ্চলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির ঝুঁকি বাড়তে পারে। তাই ভবিষ্যতে স্রোতব্যবস্থা পুনরুদ্ধারের সম্ভাবনা থাকলেও দীর্ঘ সময় ধরে এর বিরূপ প্রভাব মোকাবিলা করতে হতে পারে।
গবেষণার প্রধান বার্তা হলো, সম্ভাব্য পুনরুদ্ধারের ওপর নির্ভর না করে এখনই বৈশ্বিক উষ্ণতা সীমিত রাখার উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন দ্রুত কমানো গেলে AMOC-এর দুর্বল হয়ে পড়ার ঝুঁকিও কমবে।
নতুন এই গবেষণা আটলান্টিকের স্রোতব্যবস্থা সম্পর্কে আশাব্যঞ্জক একটি বৈজ্ঞানিক সম্ভাবনা তুলে ধরলেও জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি কমানোর বিকল্প হিসেবে এটিকে দেখার সুযোগ নেই।

