দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র রূপপুর থেকে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরুর অপেক্ষা শেষ হতে পারে শিগগিরই। সব ধরনের কারিগরি পরীক্ষা ও নিরাপত্তা যাচাই সন্তোষজনক হলে ডিসেম্বরের আগেই কেন্দ্রটির প্রথম ইউনিট থেকে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু হওয়ার আশা করছেন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম। প্রাথমিকভাবে ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) সচিবালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে মন্ত্রী এ আশার কথা জানান। তিনি বলেন, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিট বর্তমানে কমিশনিংয়ের সি-পর্যায়ে রয়েছে। সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষের অনুমোদন নিয়ে ধাপে ধাপে পরবর্তী কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
মন্ত্রী জানান, কেন্দ্রটি ইতোমধ্যে ২০ শতাংশ তাপীয় সক্ষমতা অর্জন করেছে। এই সক্ষমতা ৩৫ থেকে ৪০ শতাংশে পৌঁছালে উৎপাদিত বাষ্প দিয়ে টারবাইন ঘোরানো হবে। এরপর জেনারেটরের মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরবর্তী ধাপ সম্পন্ন হবে।
নিরাপত্তা পরীক্ষায় ছাড় নেই
বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু করার আগে আরও বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ কারিগরি পরীক্ষা সম্পন্ন করতে হবে। মন্ত্রী স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, নিরাপত্তার বিষয়ে কোনো ধরনের ছাড় দেওয়া হবে না।
পরীক্ষায় কোনো যন্ত্রপাতির কার্যকারিতা নিয়ে অসংগতি পাওয়া গেলে প্রয়োজনে তা খুলে আবার পরীক্ষা ও মেরামত করা হবে। একই পরীক্ষা একাধিকবার করার প্রয়োজন হলেও তা করা হবে। সব বিষয়ে সন্তুষ্ট না হওয়া পর্যন্ত জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হবে না।
মন্ত্রী বলেন, আগামী পাঁচ থেকে ছয় সপ্তাহের মধ্যে কার্যক্রম পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোলে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু করা সম্ভব হতে পারে। তবে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রতিটি ধাপে সূক্ষ্ম কারিগরি পরীক্ষা ও নিরাপত্তা যাচাই থাকায় নির্দিষ্ট সময়সীমা নিশ্চিত করে বলতে চান না তিনি।
ভালভের সমস্যায় আটকে ছিল কার্যক্রম
রূপপুর কেন্দ্রের প্রথম ইউনিটে বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রস্তুতিতে আগে একটি ভালভের সমস্যা দেখা দিয়েছিল। এ সমস্যার সমাধানে প্রায় দুই মাস কাজ করতে হয়েছে বলে জানান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী।
রাশিয়ার ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান রোসাটমের সঙ্গে সমন্বয় করে শেষ পর্যন্ত সমস্যাটির সমাধান করা হয়েছে। বর্তমানে বাংলাদেশি ও রাশিয়ান বিজ্ঞানী, প্রকৌশলী এবং বিশেষজ্ঞরা যৌথভাবে কমিশনিং কার্যক্রম এগিয়ে নিচ্ছেন।
এর আগে গত ৩০ অক্টোবর প্রথম ইউনিটের বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রস্তুতিমূলক কার্যক্রম শুরু হয়। বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (বিএইআরএ) অনুমোদনের পর টারবাইন গরম করা ও বিভিন্ন কারিগরি পরীক্ষা শুরু করেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
বিএইআরএর চেয়ারম্যান মাহমুদুল হাসান জানিয়েছিলেন, ৩০০ মেগাওয়াট উৎপাদনের পর্যায়ে পৌঁছানোর পর আরও একটি পরিদর্শন করা হবে। সবকিছু সন্তোষজনক হলে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহের অনুমতি দেওয়া হবে।
প্রথমে ৩০০, ছয় মাসে ১১০০ মেগাওয়াটের বেশি লক্ষ্য
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী জানিয়েছেন, প্রথম পর্যায়ে ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনা রয়েছে। এরপর ধাপে ধাপে উৎপাদন বাড়িয়ে প্রথম ছয় মাসের মধ্যে ১ হাজার ১০০ মেগাওয়াটের বেশি করার আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
তবে উৎপাদন বাড়ানোর গতি নির্ভর করবে কেন্দ্রের বিজ্ঞানী, প্রকৌশলী ও কারিগরি বিশেষজ্ঞদের কাজের অগ্রগতির ওপর। প্রতিটি ধাপে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদন নিশ্চিত করেই সক্ষমতা বাড়ানো হবে।
উল্লেখ্য, পাবনার ঈশ্বরদীতে রাশিয়ার সহযোগিতায় নির্মিত হচ্ছে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র। প্রকল্পটির দুটি ইউনিটের প্রতিটির উৎপাদন সক্ষমতা ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট। অর্থাৎ দুটি ইউনিট পুরোপুরি চালু হলে কেন্দ্রটির মোট উৎপাদন সক্ষমতা হবে ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট।
প্রথম ইউনিটে পারমাণবিক জ্বালানি লোডিং কার্যক্রম শুরু হয় ২০২৬ সালের ২৮ এপ্রিল। এরপর বিভিন্ন ধাপের পরীক্ষা ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদন নিয়ে কেন্দ্রটি বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রস্তুতির দিকে এগিয়েছে।
এখন প্রথম ইউনিটের পরীক্ষামূলক বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং জাতীয় গ্রিডের সঙ্গে সংযোগের অপেক্ষা। সব পরীক্ষা সফল হলে রূপপুর থেকেই দেশের বিদ্যুৎ ব্যবস্থায় প্রথমবারের মতো পারমাণবিক শক্তির অবদান যুক্ত হবে।



