চাকরির বাজারের উপযোগী দক্ষতা অর্জনে জোর, বদলাতে হবে শিক্ষার ধরন
বাংলাদেশে তরুণদের কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়াতে প্রচলিত সনদনির্ভর শিক্ষার পাশাপাশি দক্ষতাভিত্তিক ও কর্মমুখী শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অর্জিত জ্ঞানের সঙ্গে কর্মক্ষেত্রের চাহিদার ব্যবধান কমানো, ইংরেজিতে যোগাযোগের সক্ষমতা বাড়ানো, প্রযুক্তিগত জ্ঞান অর্জন এবং বাস্তব কাজের অভিজ্ঞতা নিশ্চিত করাকে এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন শিক্ষা ও কর্মসংস্থান খাতের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
চলতি বছরের ১৯ মে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) ও ডেনমার্ক দূতাবাসের যৌথ আয়োজনে ঢাকায় অনুষ্ঠিত এক আলোচনায় শিক্ষা থেকে কর্মসংস্থানে উত্তরণের দুর্বলতা নিয়ে উদ্বেগ উঠে আসে। আলোচনায় বলা হয়, শিক্ষার সুযোগ বাড়লেও তরুণদের উপযুক্ত ও মর্যাদাপূর্ণ কর্মসংস্থানে যুক্ত করার ক্ষেত্রে এখনও বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে। শিক্ষার পাঠ্যক্রম, দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচি এবং শ্রমবাজারের চাহিদার মধ্যে সমন্বয় বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়।
ডিগ্রি আছে, কাজের দক্ষতায় ঘাটতি
দেশে উচ্চশিক্ষার সুযোগ বাড়লেও অনেক স্নাতক চাকরির বাজারে প্রবেশের সময় প্রয়োজনীয় ব্যবহারিক দক্ষতার অভাবে সমস্যায় পড়েন। অন্যদিকে, নিয়োগদাতাদের অভিযোগ, আবেদনকারীদের অনেকের মধ্যেই নির্দিষ্ট কাজের দক্ষতা, সমস্যা সমাধানের সক্ষমতা এবং কর্মক্ষেত্রে কার্যকর যোগাযোগের ঘাটতি রয়েছে।
সিপিডির আলোচনায় উপস্থাপিত তথ্য অনুযায়ী, ২০১৫ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশের গড় মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি ছিল ৬ দশমিক ২৯ শতাংশ, আর গড় কর্মসংস্থান প্রবৃদ্ধি ছিল ৩ দশমিক ৮৬ শতাংশ। একই আলোচনায় বছরে প্রায় সাত লাখ স্নাতক তৈরি হওয়ার বিপরীতে প্রায় তিন লাখ কর্মসংস্থান সৃষ্টির হিসাব তুলে ধরা হয়। এসব পরিসংখ্যান শিক্ষা বিস্তারের সঙ্গে কর্মসংস্থান সৃষ্টির সামঞ্জস্য নিয়ে প্রশ্ন সামনে এনেছে।
তবে কর্মসংস্থানের সংকট শুধু শিক্ষার্থীদের দক্ষতার ঘাটতির কারণে হচ্ছে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক হবে না। নতুন চাকরি সৃষ্টি, বেসরকারি বিনিয়োগ, শিল্পের সম্প্রসারণ এবং নিয়োগপ্রক্রিয়ায় বিদ্যমান সীমাবদ্ধতাও এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। ফলে শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কারের পাশাপাশি কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ানোও জরুরি।
ইংরেজি ও প্রযুক্তিগত জ্ঞান কেন জরুরি
বর্তমান চাকরির বাজারে শুধু পাঠ্যবইয়ের জ্ঞান দিয়ে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা কঠিন। বিশেষ করে বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান, তথ্যপ্রযুক্তি খাত, অনলাইনভিত্তিক কাজ এবং আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে যুক্ত পেশায় ইংরেজিতে যোগাযোগ, ডিজিটাল সরঞ্জাম ব্যবহারের দক্ষতা ও দলগতভাবে কাজ করার সক্ষমতা প্রয়োজন হয়।
ব্রিটিশ কাউন্সিলের নেক্সট জেনারেশন বাংলাদেশ ২০২৪ প্রতিবেদনে যোগাযোগ, নেতৃত্ব, সমস্যা সমাধান, উপস্থাপনা ও ডিজিটাল দক্ষতার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা হয়েছে। প্রতিবেদনে ইংরেজি শেখার গুরুত্ব সম্পর্কে তরুণদের সচেতনতার কথাও উল্লেখ করা হয়। তবে বাস্তব যোগাযোগে দক্ষতা অর্জনের সুযোগ বাড়ানো প্রয়োজন বলে সেখানে সুপারিশ করা হয়েছে।
প্রযুক্তির পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে কাজের ধরনও বদলাচ্ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা, সাইবার নিরাপত্তা ও তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর সেবার বিস্তার নতুন ধরনের দক্ষতার চাহিদা তৈরি করছে। তাই শিক্ষার্থীদের শুধু নির্দিষ্ট সফটওয়্যার চালানো শেখালেই হবে না; নতুন প্রযুক্তি বুঝে কাজে লাগানো, তথ্য যাচাই করা এবং জটিল সমস্যার সমাধান করার সক্ষমতাও গড়ে তুলতে হবে।
ব্যবহারিক প্রশিক্ষণ ও ইন্টার্নশিপে গুরুত্ব
শিক্ষা ও চাকরির মধ্যে ব্যবধান কমানোর অন্যতম উপায় হলো পড়াশোনার সময় থেকেই শিক্ষার্থীদের বাস্তব কর্মপরিবেশের সঙ্গে পরিচিত করা। ইন্টার্নশিপ, শিক্ষানবিশি, শিল্পপ্রতিষ্ঠানে প্রশিক্ষণ এবং নিয়োগদাতাদের সঙ্গে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের যৌথ উদ্যোগ শিক্ষার্থীদের কাজের অভিজ্ঞতা অর্জনে সহায়তা করতে পারে।
সিপিডির আলোচনায় আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) ঢাকা কার্যালয়ের প্রতিনিধি তানজিলুত তাসনুবা শ্রমবাজারের তথ্যব্যবস্থা শক্তিশালী করা এবং নিয়োগদাতাদের চাহিদার সঙ্গে শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের সংযোগ বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন। আলোচনায় কর্মক্ষেত্রে সরাসরি প্রশিক্ষণ, ক্যারিয়ার পরামর্শ এবং চাকরির সুযোগ সম্পর্কে শিক্ষার্থীদের আগাম ধারণা দেওয়ার বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হয়।
এ ক্ষেত্রে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও শিল্প খাতের মধ্যে নিয়মিত যোগাযোগ প্রয়োজন। কোন খাতে কী ধরনের কর্মী দরকার, কোন দক্ষতার চাহিদা বাড়ছে এবং শিক্ষার্থীদের প্রশিক্ষণে কোথায় ঘাটতি রয়েছে—এসব তথ্যের ভিত্তিতে পাঠ্যক্রম ও প্রশিক্ষণ কর্মসূচি সাজানো গেলে চাকরির বাজারে প্রবেশ সহজ হতে পারে।
কর্মমুখী শিক্ষায় সরকারের গুরুত্বারোপ
গত ৭ জুন ঢাকায় জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের কর্মমুখী ও কারিগরি শিক্ষাবিষয়ক প্রশিক্ষণ কর্মসূচির উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সনদনির্ভর শিক্ষার পরিবর্তে দক্ষতা, প্রযুক্তি ও বাস্তব অভিজ্ঞতাভিত্তিক শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেন।
তিনি বলেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তির কারণে অনেক প্রচলিত পেশা পরিবর্তিত হচ্ছে, আবার নতুন কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রও তৈরি হচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে শিক্ষাক্রম আধুনিকায়ন এবং শিক্ষার্থীদের ব্যবহারিক দক্ষতা অর্জনের সুযোগ বাড়ানো প্রয়োজন। এ জন্য শিক্ষানবিশি, ইন্টার্নশিপ ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সহযোগিতা বাড়ানোর উদ্যোগের কথাও জানান তিনি।
জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত কলেজগুলোর শিক্ষার্থীদের কর্মমুখী শিক্ষার সুযোগ বাড়ানোর বিষয়টিও আলোচনায় আসে। পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের উদ্ভাবনী উদ্যোগকে সহায়তা করতে বীজ মূলধন বা উদ্ভাবনী অনুদান দেওয়ার পরিকল্পনার কথা জানান প্রধানমন্ত্রী।
শুধু কারিগরি শিক্ষা নয়, সাধারণ শিক্ষাতেও প্রয়োজন
দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষা বলতে শুধু কারিগরি প্রতিষ্ঠান বা বিশেষ প্রশিক্ষণকেন্দ্রে পড়াশোনাকে বোঝায় না। সাধারণ স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রমেও যোগাযোগ, বিশ্লেষণী চিন্তা, সমস্যা সমাধান, দলগত কাজ এবং প্রযুক্তি ব্যবহারের মতো দক্ষতা যুক্ত করা প্রয়োজন।
শিক্ষার্থীরা যে বিষয়েই পড়াশোনা করুন না কেন, ভবিষ্যৎ কর্মজীবনে জ্ঞান প্রয়োগ করার সক্ষমতা তাঁদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে পেশা নির্বাচন, জীবনবৃত্তান্ত তৈরি, সাক্ষাৎকারের প্রস্তুতি এবং চাকরির বাজার সম্পর্কে ধারণা দেওয়ার ব্যবস্থাও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে থাকা দরকার।
নারী ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রেও এসব সুযোগ সহজলভ্য করা জরুরি। নিরাপদ যাতায়াত, উপযুক্ত প্রশিক্ষণকেন্দ্র, আর্থিক সহায়তা এবং কর্মক্ষেত্রে অন্তর্ভুক্তিমূলক পরিবেশ নিশ্চিত করা না গেলে দক্ষতা উন্নয়নের সুযোগ সবার কাছে সমানভাবে পৌঁছাবে না।
সনদের সঙ্গে দক্ষতার সমন্বয়ই মূল লক্ষ্য
বাংলাদেশের তরুণ জনগোষ্ঠী দেশের অর্থনীতির জন্য বড় সম্ভাবনা। কিন্তু সেই সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে শিক্ষার পরিমাণ বাড়ানোর পাশাপাশি শিক্ষার মান, ব্যবহারিক প্রশিক্ষণ এবং চাকরির বাজারের সঙ্গে সংযোগ উন্নত করা প্রয়োজন।
বিশেষজ্ঞদের আলোচনায় উঠে আসা সুপারিশগুলোর মধ্যে রয়েছে—শ্রমবাজারের চাহিদা অনুযায়ী পাঠ্যক্রম হালনাগাদ, ইন্টার্নশিপ ও শিক্ষানবিশির সুযোগ সম্প্রসারণ, ইংরেজি ও ডিজিটাল দক্ষতা উন্নয়ন এবং শিক্ষার্থীদের জন্য কার্যকর ক্যারিয়ার পরামর্শ নিশ্চিত করা।
তবে দক্ষতা উন্নয়নই একা বেকারত্বের সমাধান নয়। নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি, শিল্পে বিনিয়োগ এবং প্রশিক্ষণ শেষে চাকরি পাওয়ার বাস্তব সুযোগও বাড়াতে হবে। শিক্ষার সনদ ও কাজের দক্ষতা যখন একসঙ্গে এগোবে, তখন তরুণদের জন্য উপযুক্ত কর্মজীবনে প্রবেশের পথ আরও কার্যকর হতে পারে।

