দেশীয় পণ্যের প্রচার, প্রসার এবং ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পের উদ্যোক্তাদের বাজার সম্প্রসারণের লক্ষ্যে রাজধানীর তেজগাঁওয়ে শুরু হয়েছে পাঁচ দিনব্যাপী ‘বিসিক শরৎ মেলা-২০২৬’। বুধবার (৭ অক্টোবর) সকাল ১১টায় বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশনের (বিসিক) ভবনে মেলার উদ্বোধন করেন ঢাকা-৩ আসনের সংসদ সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়। আগামী ১১ অক্টোবর পর্যন্ত চলবে এ আয়োজন।

বাংলার ঐতিহ্য, কারুশিল্প ও দেশীয় ক্ষুদ্র শিল্পের বৈচিত্র্যময় পণ্য সাধারণ মানুষের কাছে তুলে ধরতে এ মেলার আয়োজন করেছে বিসিক। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের উদ্যোক্তারা নিজেদের তৈরি পণ্য সরাসরি প্রদর্শন ও বিক্রির সুযোগ পাচ্ছেন। পাশাপাশি ক্রেতাদের সঙ্গে উদ্যোক্তাদের যোগাযোগ বাড়ানোও এ আয়োজনের অন্যতম লক্ষ্য।

মেলায় মোট ৬০টি স্টল রয়েছে। এর মধ্যে বস্ত্রজাত পণ্যের ২০টি, পাটজাত পণ্যের ৮টি, গহনার ৬টি, খাদ্য ও খাদ্যজাত পণ্যের ৫টি, গৃহসজ্জার ৪টি, চামড়াজাত পণ্যের ৩টি, মধুর ৩টি এবং বাঁশ ও বেতজাত পণ্যের ২টি স্টল রয়েছে।

এ ছাড়া দেশের ঐতিহ্যবাহী ও ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) স্বীকৃত পণ্য তুলে ধরতে রাখা হয়েছে বিশেষ ব্যবস্থা। জামদানি, শতরঞ্জি, শীতলপাটি, নকশিকাঁথা ও রাজশাহী সিল্কসহ বিভিন্ন পণ্যের উদ্যোক্তাদের জন্য সাতটি স্টল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।

বিসিক নকশা কেন্দ্র থেকে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত উদ্যোক্তাদের পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পের উদ্যোক্তারাও মেলায় অংশ নিয়েছেন। দর্শনার্থীদের বিসিকের কার্যক্রম, প্রশিক্ষণ এবং উদ্যোক্তা উন্নয়নমূলক উদ্যোগ সম্পর্কে জানাতে তথ্যকেন্দ্র ও নকশা কেন্দ্রের পৃথক স্টল রাখা হয়েছে।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে গয়েশ্বর চন্দ্র রায় বলেন, দেশের কারিগরদের মেধা ও দক্ষতা কাজে লাগিয়ে উদ্যোক্তারা আকর্ষণীয় এবং মানসম্মত পণ্য তৈরি করছেন। তবে এসব পণ্য উৎপাদনের পাশাপাশি ক্রেতাদের কাছে পরিচিত করে তোলা এবং বিপণনের সুযোগ বাড়ানো প্রয়োজন।

দেশীয় ঐতিহ্যবাহী পণ্যের গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি বলেন, জামালপুরের নকশিকাঁথা, শীতলপাটি, মাটির তৈজসপত্র ও টেরাকোটার মতো পণ্যের চাহিদা এখনো রয়েছে। এসব শিল্প শুধু দেশের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য ধরে রাখছে না, নতুন কর্মসংস্থান তৈরিতেও ভূমিকা রাখছে।

বিশেষ করে গ্রামীণ নারীদের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণের বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে তিনি জানান, কুটির শিল্পের মাধ্যমে অনেক নারী ঘরে বসেই আয় করার সুযোগ পাচ্ছেন। তাঁদের দক্ষতা উন্নয়ন এবং পণ্যের বাজার সম্প্রসারণে প্রশিক্ষণ ও প্রয়োজনীয় সহযোগিতা বাড়ানো দরকার।

অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন শিল্প মন্ত্রণালয়ের সচিব আব্দুন নাসের খান। তিনি বলেন, দেশের অতিক্ষুদ্র, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের বিকাশে বিসিক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। উদ্যোক্তাদের প্রশিক্ষণ, পণ্যের প্রচার এবং বাজার সম্প্রসারণে প্রতিষ্ঠানটি বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করছে। শরৎ মেলার মতো আয়োজন উদ্যোক্তাদের জন্য নতুন ক্রেতা তৈরির সুযোগ এনে দিতে পারে।

অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বিসিক চেয়ারম্যান বেনজীর আহমেদ। তিনি জানান, উদ্যোক্তাদের তৈরি পণ্যের প্রচার ও বিক্রির সুযোগ বাড়াতে প্রতি মাসে মেলা আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে। একই সঙ্গে প্রশিক্ষণ থেকে শুরু করে পণ্যের বাজার সম্প্রসারণ পর্যন্ত বিভিন্ন পর্যায়ে উদ্যোক্তাদের সহায়তা দেওয়া হচ্ছে।

তিনি আরও জানান, সরকারের ‘একটি গ্রাম, একটি পণ্য’ উদ্যোগ বাস্তবায়নেও বিসিক কাজ করছে। এ উদ্যোগের মাধ্যমে স্থানীয় পর্যায়ের বিশেষায়িত পণ্য চিহ্নিত করে সেগুলোর উৎপাদন ও বাজারজাতকরণে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের পর দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে উৎপাদিত ঐতিহ্যবাহী ও কারুশিল্পজাত পণ্য নিয়ে বিসিকের প্রকাশনা ‘কারুপণ্য’ বইয়ের মোড়ক উন্মোচন করা হয়। এতে স্থানীয় শিল্প ও উদ্যোক্তাদের উৎপাদিত পণ্য সম্পর্কে তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।

বিসিকের এ আয়োজনের মাধ্যমে দেশীয় পণ্যের উৎপাদক ও ক্রেতাদের মধ্যে সরাসরি যোগাযোগের সুযোগ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা নিজেদের পণ্যের পরিচিতি বাড়ানোর পাশাপাশি নতুন বাজার খুঁজে পাওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন।

তেজগাঁও শিল্প এলাকায় অবস্থিত বিসিক ভবনের নিচতলায় আয়োজিত মেলা প্রতিদিন সকাল ১০টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত থাকবে। আগামী রোববার (১১ অক্টোবর) মেলার শেষ দিন।

আয়োজকদের প্রত্যাশা, এ ধরনের মেলার মাধ্যমে দেশীয় পণ্যের প্রতি ক্রেতাদের আগ্রহ বাড়বে এবং ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পের উদ্যোক্তারা নিজেদের উৎপাদিত পণ্য আরও বড় বাজারে পৌঁছে দেওয়ার সুযোগ পাবেন।