আইসক্রিম, কেক কিংবা সুগন্ধি পণ্যের পরিচিত উপাদান ভ্যানিলা। বিশ্বজুড়ে জনপ্রিয় এই মসলাপণ্যের প্রাকৃতিক ধরনটি বেশ দামি। আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতি কেজি ভ্যানিলা প্রায় ২৫০ ডলার বা ৩০ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এবার বাংলাদেশেও এই মূল্যবান ফসলের চাষ বাড়ানোর চেষ্টা করছেন গবেষক ও উদ্যোক্তারা।
২০১৯ সালে বগুড়ার মসলা গবেষণা কেন্দ্রে পরীক্ষামূলকভাবে ভ্যানিলা চাষ শুরু হয়। এরপর যশোর, ঝিনাইদহ, চুয়াডাঙ্গা, রংপুর, দিনাজপুর, সিলেট ও পার্বত্য চট্টগ্রামের কয়েকটি এলাকায় ব্যক্তি উদ্যোগে এর চাষ শুরু হয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত দেশে বড় পরিসরে বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু করতে পারেননি চাষিরা।
যশোরের চৌগাছা উপজেলার জগদীশপুর ইউনিয়নের স্বর্পরাজপুর গ্রামের উদ্যোক্তা মো. সারোয়ার হোসেন তাঁদের একজন। আম ও ড্রাগন ফলের পাশাপাশি ছায়াযুক্ত পরিবেশে ভ্যানিলা চাষ করছেন তিনি। প্রায় চার বছর ধরে পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর তাঁর বাগানে এখন প্রায় ১৫০টি ভ্যানিলাগাছ বেড়ে উঠছে। শুরুতে অভিজ্ঞতার অভাবে কিছু গাছ মারা গেলেও পরিচর্যার মাধ্যমে বাগানটি টিকিয়ে রেখেছেন তিনি।
বগুড়ার মসলা গবেষণা কেন্দ্রে ভ্যানিলা চাষের পরীক্ষামূলক উদ্যোগ শুরু করেন ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা আবু হেনা ফয়সাল ফাহিম। ২০১৯ সালে ইন্দোনেশিয়ায় প্রশিক্ষণে গিয়ে ভ্যানিলা চাষ সম্পর্কে জানার পর সেখান থেকে একটি গাছের কাটিং এনে গবেষণা কেন্দ্রে রোপণ করেন তিনি। সেই গাছ থেকে চারা তৈরি করে বর্তমানে তিন শতক জায়গায় প্রায় ৬০টি ভ্যানিলাগাছের পরিচর্যা করা হচ্ছে।
চুয়াডাঙ্গাতেও ভ্যানিলা চাষে সাফল্যের সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে। জেলার সদর উপজেলার বেগমপুর কলোনিপাড়ায় উদ্যোক্তা হুমায়ুন কবীর ফরাজী তাঁর সমন্বিত কৃষি খামারে ভ্যানিলা চাষ করছেন। চার বছর পরিচর্যার পর তাঁর গাছে ফুল ও ফল এসেছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারাও উদ্যোগটি পর্যবেক্ষণ করছেন। বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদন বাড়ানো গেলে দেশের চাহিদা পূরণের পাশাপাশি রপ্তানির সুযোগ তৈরি হতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
ভ্যানিলা মূলত অর্কিড-জাতীয় একধরনের লতানো গাছের ফল। কাঁচা অবস্থায় এর ফলে পরিচিত সুগন্ধ থাকে না। গাছ থেকে ফল সংগ্রহের পর বিশেষ পদ্ধতিতে গাঁজন ও শুকানোর মাধ্যমে এর স্বতন্ত্র ঘ্রাণ তৈরি হয়। এই প্রক্রিয়ায় সময় ও শ্রম দুটোই প্রয়োজন।
ভ্যানিলা চাষে সাধারণ মাটির পরিবর্তে জৈব উপাদানসমৃদ্ধ বিশেষ চাষমাধ্যম এবং ছায়াযুক্ত পরিবেশ দরকার। একটি কাটিং রোপণের দুই থেকে তিন বছর পর গাছে ফুল আসতে পারে। ফুল ফোটার পর তা সাধারণত কয়েক ঘণ্টা স্থায়ী হয়। এই অল্প সময়ের মধ্যেই পরাগায়ন করতে হয়। পরাগায়নের পর ফল পরিপক্ব হতে আরও সাত থেকে আট মাস সময় লাগে।
ফল সংগ্রহের পরও প্রক্রিয়া শেষ হয় না। ভ্যানিলা বিন প্রথমে প্রায় ৬০ ডিগ্রি সেলসিয়াস গরম পানিতে অল্প সময় রাখা হয়। এরপর গাঁজনের জন্য নির্দিষ্ট সময় বাক্সে রেখে ধাপে ধাপে শুকানো হয়। প্রায় এক মাস ধরে নিয়মিত শুকানোর পর এটি বাজারজাতের উপযোগী হয়। বাংলাদেশে বাণিজ্যিকভাবে ভ্যানিলার নির্যাস তৈরির ব্যবস্থাও এখনো গড়ে ওঠেনি।
চাষের খরচও কম নয়। বগুড়ার মসলা গবেষণা কেন্দ্রের ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা আবু হেনা ফয়সাল ফাহিমের মতে, ৫০ শতক জমিতে এক হাজার ভ্যানিলাগাছের বাণিজ্যিক প্রকল্প গড়ে তুলতে প্রাথমিকভাবে ২০ থেকে ৫০ লাখ টাকা পর্যন্ত ব্যয় হতে পারে। ফসলটি শ্রমঘন হওয়ায় উৎপাদন খরচ ও সম্ভাব্য লাভ যাচাই করা জরুরি। এ কারণে কৃষকদের মধ্যে চারা বা কাটিং সরবরাহের আগে বাণিজ্যিক সম্ভাবনা পরীক্ষা করার কথা জানিয়েছেন তিনি।
অন্যদিকে, চুয়াডাঙ্গায় ভ্যানিলা চাষ করা হুমায়ুন কবীর ফরাজীর উদ্যোগের বিষয়ে বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস) জানিয়েছে, তাঁর খামারে উৎপাদিত শুকনো ভ্যানিলা কেজিপ্রতি ৩০ থেকে ৪০ হাজার টাকায় বিক্রির সম্ভাবনা রয়েছে। ঢাকার পাঁচ তারকা হোটেল ও বড় ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানগুলো সম্ভাব্য ক্রেতা হিসেবে আগ্রহ দেখাতে পারে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এই দাম ও ক্রেতার তথ্য নির্দিষ্ট উদ্যোক্তার বক্তব্যের ভিত্তিতে প্রকাশিত; এটি দেশের সব ভ্যানিলা চাষির জন্য নিশ্চিত বাজারদর নয়।
বিশ্ববাজারে প্রাকৃতিক ভ্যানিলার বড় উৎপাদক ও রপ্তানিকারক দেশ মাদাগাস্কার। বিশ্বব্যাংকের ওয়ার্ল্ড ইন্টিগ্রেটেড ট্রেড সলিউশনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে দেশটি প্রায় ১২ কোটি ৮৩ লাখ ডলারের ভ্যানিলা রপ্তানি করেছে। যুক্তরাষ্ট্র প্রাকৃতিক ভ্যানিলার অন্যতম বড় আমদানিকারক। খাদ্য ও পানীয় শিল্পের পাশাপাশি সুগন্ধি, প্রসাধনী এবং ওষুধশিল্পেও এর ব্যবহার রয়েছে।
তবে বাজারে ভ্যানিলা স্বাদের সব পণ্যে প্রাকৃতিক ভ্যানিলা ব্যবহার করা হয় না। আইসক্রিম, কেক ও অন্যান্য খাবারে ব্যবহৃত ভ্যানিলা ফ্লেভারের বড় অংশই কৃত্রিমভাবে তৈরি ভ্যানিলিন থেকে আসে। ফলে প্রাকৃতিক ভ্যানিলা বিনের বাজার এবং কৃত্রিম ভ্যানিলা ফ্লেভারের বাজারকে আলাদা করে দেখা জরুরি।
বাংলাদেশের আবহাওয়া ভ্যানিলা চাষের উপযোগী বলে পরীক্ষামূলক চাষে প্রমাণ পাওয়া গেলেও বাণিজ্যিক উৎপাদনের জন্য প্রয়োজন প্রশিক্ষিত চাষি, মানসম্মত চারা, পরাগায়ন ব্যবস্থাপনা, প্রক্রিয়াজাতকরণ সুবিধা এবং নিশ্চিত ক্রেতা। এসব ব্যবস্থা গড়ে উঠলে দেশের কৃষিতে নতুন উচ্চমূল্যের ফসল হিসেবে ভ্যানিলা জায়গা করে নিতে পারে। তবে বড় বিনিয়োগের আগে উৎপাদন খরচ, ফলন ও বাজারের চাহিদা যাচাই করাই হবে উদ্যোক্তাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

