বাংলাদেশের বাজারে বিক্রি হওয়া চালের ১০৪টি নমুনার মধ্যে ১৯টিতে আন্তর্জাতিকভাবে নির্ধারিত সীমার চেয়ে বেশি অজৈব আর্সেনিক পাওয়া গেছে। বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের (ব্রি) রাইস অ্যানালিটিক্যাল ল্যাবরেটরিতে করা সাম্প্রতিক এক গবেষণায় এ তথ্য উঠে এসেছে।

গবেষণার জন্য দেশের আট বিভাগের ১৭টি বাজার থেকে ১০৪টি বাণিজ্যিক চালের নমুনা সংগ্রহ করা হয়। এসব নমুনায় ক্যাডমিয়াম, সীসা এবং ধান চাষে ব্যবহৃত ২২ ধরনের কীটনাশকের অবশিষ্টাংশের পাশাপাশি অজৈব আর্সেনিক পরীক্ষা করা হয়।

পরীক্ষায় ১৯টি নমুনায় অজৈব আর্সেনিকের মাত্রা কেজিতে ০ দশমিক ২ মিলিগ্রামের আন্তর্জাতিক সীমা ছাড়িয়ে যায়। অর্থাৎ ১০৪টি নমুনার প্রায় ১৮ শতাংশে নির্ধারিত সীমার বেশি অজৈব আর্সেনিক ছিল; বাকি প্রায় ৮২ শতাংশ নমুনা ওই সীমার মধ্যে ছিল।

সীসা-ক্যাডমিয়াম নিয়ে স্বস্তির তথ্য

গবেষণায় চালের আরেক দুই ভারী ধাতু সীসা ও ক্যাডমিয়ামের মাত্রা আন্তর্জাতিক অনুমোদিত সীমার নিচে পাওয়া গেছে। একইভাবে পরীক্ষায় অন্তর্ভুক্ত ২২ ধরনের কীটনাশকের অবশিষ্টাংশও অনুমোদিত মাত্রা ছাড়ায়নি। গবেষক দলের সদস্য ও রাইস অ্যানালিটিক্যাল ল্যাবরেটরির কোয়ালিটি ম্যানেজার হাবিবুল বারী সাজিব এটিকে ইতিবাচক দিক হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

আন্তর্জাতিক খাদ্যমান অনুযায়ী চালে অজৈব আর্সেনিকের সর্বোচ্চ সীমা প্রতি কেজিতে ০ দশমিক ২ মিলিগ্রাম। ক্যাডমিয়ামের সীমা ০ দশমিক ৪ মিলিগ্রাম এবং সীসার সীমা ০ দশমিক ২ মিলিগ্রাম প্রতি কেজি।

বাংলাদেশে চাল পরীক্ষা করার জন্য ব্রির রাইস অ্যানালিটিক্যাল ল্যাবরেটরি অনুমোদিত পরীক্ষাগারগুলোর একটি। বাংলাদেশ ফুড সেফটি অথরিটির পরীক্ষাগার তালিকাতেও এই ল্যাবরেটরিতে চালের আর্সেনিক, ক্যাডমিয়াম, সীসাসহ বিভিন্ন ভারী ধাতু পরীক্ষার ব্যবস্থা দেখানো হয়েছে।

আতঙ্ক নয়, নজরদারির পরামর্শ

গবেষক হাবিবুল বারী সাজিব বলেছেন, কিছু নমুনায় আন্তর্জাতিক সীমার বেশি অজৈব আর্সেনিক পাওয়া গেলেও এ নিয়ে আতঙ্কিত হওয়ার কারণ নেই। তাঁর মতে, চালের মতো নিয়মিত খাওয়া খাদ্যে এমন দূষকের উপস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে নিয়মিত নজরদারি এবং আরও বড় পরিসরে গবেষণা করা প্রয়োজন।

দীর্ঘ সময় ধরে অজৈব আর্সেনিকের সংস্পর্শে থাকলে স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে বাংলাদেশের মতো দেশে, যেখানে চাল খাদ্যতালিকার প্রধান অংশ, খাদ্যের মাধ্যমে আর্সেনিক গ্রহণের বিষয়টি আলাদাভাবে গুরুত্ব পায়। আগের গবেষণাতেও বাংলাদেশের মানুষের খাদ্যাভ্যাসে চালকে আর্সেনিকের সম্ভাব্য উৎস হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

চালে আর্সেনিকের উপস্থিতির সঙ্গে কৃষিতে ব্যবহৃত সেচের পানির মানেরও সম্পর্ক রয়েছে। বাংলাদেশের বিভিন্ন এলাকায় আর্সেনিকযুক্ত ভূগর্ভস্থ পানি দিয়ে দীর্ঘদিন সেচ দেওয়ার ফলে কৃষিজমির মাটিতে আর্সেনিক জমতে পারে এবং সেখান থেকে ধানের গাছেও তা প্রবেশ করতে পারে।

গবেষণার পরিধি কী বলছে

১০৪টি নমুনার এই ফলাফল পুরো দেশের বাজারে বিক্রি হওয়া সব চালের প্রতিনিধিত্ব করে—এমন দাবি গবেষণাটি করছে না। নমুনাগুলো ১৭টি বাজার ও আট বিভাগ থেকে নেওয়া হলেও আরও বিস্তৃত এলাকা, মৌসুম, চালের জাত ও উৎপাদন অঞ্চলের নমুনা নিয়ে ধারাবাহিক পরীক্ষা করলে পরিস্থিতির আরও পরিষ্কার চিত্র পাওয়া যেতে পারে।

গবেষকদের মূল বার্তাও সেদিকেই—কিছু নমুনায় সীমা ছাড়ানো অজৈব আর্সেনিক পাওয়া যাওয়ায় নিয়মিত নজরদারি চালিয়ে যেতে হবে এবং বড় পরিসরে গবেষণা প্রয়োজন। একই পরীক্ষায় সীসা, ক্যাডমিয়াম ও পরীক্ষিত কীটনাশকের মাত্রা সীমার মধ্যে থাকা অবশ্য সামগ্রিক খাদ্যনিরাপত্তার চিত্রে একটি ইতিবাচক দিক হিসেবে এসেছে।