দেশে বর্তমানে ৬২ লাখ নারী-পুরুষ সরকারি বয়স্ক ভাতা পাচ্ছেন। চলতি অর্থবছরে এ কর্মসূচিতে নতুন করে এক লাখ প্রবীণকে যুক্ত করা হয়েছে। বেড়েছে মাসিক ভাতার পরিমাণও। তবে বয়স ও অন্যান্য শর্ত পূরণ করার পরও অনেক প্রবীণ এখনো ভাতার তালিকায় জায়গা পাননি। সরকারের বরাদ্দ না বাড়লে তাঁদের সবাইকে একসঙ্গে এই সুবিধা দেওয়া সম্ভব নয়।
বুধবার (৭ অক্টোবর) নিজ দপ্তরে বয়স্ক ভাতা কর্মসূচির বর্তমান অবস্থা নিয়ে কথা বলেন সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. মোহাম্মদ আবু ইউছুফ। তিনি জানান, প্রতিবছরই সুবিধাভোগীর সংখ্যা বাড়ানোর চেষ্টা চলছে। আগে ৬০ লাখ প্রবীণ ভাতা পেতেন। পরে তা ৬১ লাখে উন্নীত করা হয়। চলতি অর্থবছরে আরও এক লাখ মানুষ যুক্ত হওয়ায় সংখ্যাটি দাঁড়িয়েছে ৬২ লাখে।
ভাতা পাওয়ার যোগ্য হয়েও যাঁরা তালিকার বাইরে রয়েছেন, তাঁদের বিষয়টিও তুলে ধরেন সমাজকল্যাণ সচিব। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, নির্ধারিত বয়স হলেই সবাইকে ভাতা দেওয়া যাচ্ছে না। আবেদনকারীর আর্থিক অবস্থা ও অন্যান্য শর্ত যাচাইয়ের পর সুবিধাভোগী নির্বাচন করা হয়। কিন্তু চাহিদার তুলনায় বরাদ্দ কম থাকায় অনেক আবেদন অপেক্ষমাণ থেকে যাচ্ছে।
২০২৬-২৭ অর্থবছরে বয়স্ক ভাতার হারও বাড়িয়েছে সরকার। সাধারণ সুবিধাভোগীদের মাসিক ভাতা ৬৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৭০০ টাকা করা হয়েছে। এ হারে ভাতা পাচ্ছেন ৫৯ লাখ ৯৫ হাজার প্রবীণ। আর ৯০ বছরের বেশি বয়সী ২ লাখ ৫ হাজার মানুষের জন্য মাসিক এক হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।
বয়স্ক ভাতা মূলত এমন প্রবীণদের জন্য, যাঁদের নিয়মিত আয়ের ব্যবস্থা নেই কিংবা বয়সের কারণে উপার্জনের সুযোগ সীমিত হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে দরিদ্র পরিবারের বয়স্ক সদস্যদের নিত্যপ্রয়োজনীয় খরচ মেটাতে এই অর্থ সহায়তা করে। যদিও বর্তমান বাজারদরে মাসিক কয়েক শ টাকা দিয়ে সব প্রয়োজন মেটানো সম্ভব নয়।
বাংলাদেশে বয়স্ক ভাতা কর্মসূচি শুরু হয় ১৯৯৭-৯৮ অর্থবছরে। তখন উপকারভোগী ছিলেন ৪ লাখ ৩ হাজার মানুষ। জনপ্রতি মাসে দেওয়া হতো ১০০ টাকা। প্রায় তিন দশকে সুবিধাভোগীর সংখ্যা কয়েক গুণ বেড়েছে। ধাপে ধাপে বাড়ানো হয়েছে ভাতার পরিমাণও।
তবে কর্মসূচির পরিধি বাড়লেও আবেদনকারী ও সুবিধাভোগীর মধ্যে ব্যবধান রয়ে গেছে। সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, এখনো এমন প্রবীণ রয়েছেন, যাঁরা নির্ধারিত শর্ত পূরণ করলেও ভাতা পাচ্ছেন না। নতুন বরাদ্দ পাওয়া গেলে তাঁদের পর্যায়ক্রমে অন্তর্ভুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
সমাজকল্যাণ সচিব বলেন, প্রবীণদের কল্যাণ শুধু মাসিক আর্থিক সহায়তার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা উচিত নয়। তাঁদের চিকিৎসা, চলাচল, আবাসন ও সামাজিক অংশগ্রহণের সুযোগও বাড়ানো প্রয়োজন। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে অনেক মানুষ পরিবারের ওপর বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়েন। তাঁদের প্রয়োজনীয় সেবা সহজে পাওয়ার ব্যবস্থা থাকা জরুরি।
প্রবীণদের দীর্ঘ কর্মজীবনের অভিজ্ঞতা সমাজের কাজে লাগানোর বিষয়টিও উল্লেখ করেন তিনি। তাঁর মতে, বয়সের কারণে কেউ কর্মজীবন থেকে সরে গেলেও তাঁর জ্ঞান ও অভিজ্ঞতার গুরুত্ব শেষ হয়ে যায় না। পরিবার ও সমাজে প্রবীণদের অংশগ্রহণের সুযোগ ধরে রাখা প্রয়োজন।
এদিকে ভাতা বিতরণে প্রকৃত সুবিধাভোগী চিহ্নিত করার বিষয়েও কাজ করছে মন্ত্রণালয়। আবেদন যাচাই ও তালিকা তৈরির প্রক্রিয়া আরও কার্যকর করার কথা জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। এতে যোগ্য ব্যক্তিদের সরকারি সহায়তা পাওয়ার সুযোগ বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।
বাংলাদেশে মানুষের গড় আয়ু বাড়ার সঙ্গে প্রবীণ জনগোষ্ঠীর সংখ্যাও বাড়ছে। ফলে আগামী বছরগুলোতে বয়স্ক ভাতার চাহিদা আরও বাড়তে পারে। এ অবস্থায় কর্মসূচির জন্য বরাদ্দ এবং সুবিধাভোগী নির্বাচনের বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে।
সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, বয়স্ক ভাতার আওতা ও অর্থের পরিমাণ দুটোই ধাপে ধাপে বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। তবে নতুন করে কতজনকে যুক্ত করা যাবে কিংবা মাসিক ভাতা আরও কতটা বাড়বে, তা নির্ভর করবে আগামী বাজেটে বরাদ্দের ওপর।
বর্তমানে ৬২ লাখ প্রবীণ নিয়মিত সরকারি সহায়তা পেলেও অপেক্ষায় রয়েছেন আরও অনেকে। নতুন বরাদ্দের মাধ্যমে তাঁদের কতজন ভাতার তালিকায় জায়গা পান, সেটিই এখন দেখার বিষয়।
