বৈধ পাসপোর্ট, ভিসা বা এন্ট্রি পারমিশন এবং বিমান টিকিট থাকার পরও তিন প্রাপ্তবয়স্ক নারীকে নেপাল যেতে বাধা দেওয়ার অভিযোগে হাইকোর্ট রুল জারি করেছেন। তাঁদের বিদেশযাত্রায় বাধা দেওয়ার কার্যক্রম কেন আইনগত কর্তৃত্ববহির্ভূত ঘোষণা করা হবে না, তা জানতে চেয়েছেন আদালত।
মঙ্গলবার ২৯ সেপ্টেম্বর বিচারপতি কে এম কামরুল কাদের ও বিচারপতি ফাতেমা আনোয়ারের হাইকোর্ট বেঞ্চ এই রুল জারি করেন। রুলে স্বরাষ্ট্রসচিব, পুলিশের মহাপরিদর্শক, ইমিগ্রেশন পুলিশের অতিরিক্ত আইজিপি, ইমিগ্রেশন পুলিশের পরিচালক, হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ইমিগ্রেশন পুলিশের ওসি এবং সংশ্লিষ্ট ইমিগ্রেশন কর্মকর্তাদের বিবাদী করা হয়েছে। তাঁদের চার সপ্তাহের মধ্যে রুলের জবাব দিতে বলা হয়েছে।
রিটকারী তিন নারী হলেন রিফা তামান্না, সোহানি ইসলাম সমাপ্তি ও নাজনীন। তাঁদের আইনজীবী ইশরাত হাসানের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনজনই প্রাপ্তবয়স্ক এবং তাঁদের বিরুদ্ধে কোনো মামলা বা আদালতের বিদেশযাত্রা-সংক্রান্ত নিষেধাজ্ঞা ছিল না।
রিটের তথ্য অনুযায়ী, গত ৮ আগস্ট নেপাল যাওয়ার জন্য তাঁরা হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে যান। সেখানে ইমিগ্রেশন কর্মকর্তারা তাঁদের বিদেশ যাওয়ার বিষয়ে বিভিন্ন প্রশ্ন করেন। এর মধ্যে তাঁরা কেন অবিবাহিত এবং বিদেশ ভ্রমণের বিষয়ে পরিবারের সম্মতি আছে কি না—এমন প্রশ্নও করা হয়েছিল বলে আইনজীবী অভিযোগ করেছেন।
আইনজীবীর বক্তব্য অনুযায়ী, পরে তিন নারীকে ইমিগ্রেশন পার হতে দেওয়া হয়নি। তাঁদের বিদেশযাত্রায় বাধা দেওয়ার নির্দিষ্ট কারণও জানানো হয়নি বলে রিটে অভিযোগ করা হয়েছে। এতে বিমান টিকিট, হোটেল বুকিংসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে তাঁদের আর্থিক ক্ষতি হয়েছে বলেও দাবি করা হয়।
ঘটনার পর ৩১ আগস্ট পুলিশের ইমিগ্রেশন শাখার অতিরিক্ত আইজিপির কাছে লিখিত অভিযোগ করেন তিন নারী। অভিযোগে ঘটনার তদন্ত, বিমানবন্দরের সিসিটিভি ফুটেজ সংরক্ষণ, দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা এবং ক্ষতিপূরণের দাবি জানানো হয়।
অভিযোগের বিষয়ে কোনো জবাব না পাওয়ায় ৬ সেপ্টেম্বর সংশ্লিষ্টদের আইনি নোটিশ পাঠানো হয়। সেখান থেকেও জবাব না পেয়ে ১৫ সেপ্টেম্বর হাইকোর্টে রিট করা হয় বলে জানিয়েছেন রিটকারীদের আইনজীবী।
রিটে বাংলাদেশের সংবিধানে থাকা নাগরিকের চলাফেরার স্বাধীনতা ও আইনের দৃষ্টিতে সমতার অধিকার লঙ্ঘনের বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে। সংবিধানের ৩৬ অনুচ্ছেদে প্রত্যেক নাগরিকের বাংলাদেশ ত্যাগ ও বাংলাদেশে পুনঃপ্রবেশের অধিকার স্বীকৃত, যদিও জনস্বার্থে আইনের মাধ্যমে যুক্তিসঙ্গত বিধিনিষেধ আরোপের সুযোগ রয়েছে।
বিদেশযাত্রার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের পাসপোর্ট আইনের বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। ‘বাংলাদেশ পাসপোর্ট আদেশ, ১৯৭৩’-এর ৬ অনুচ্ছেদে নির্দিষ্ট কিছু পরিস্থিতিতে পাসপোর্ট দেওয়া বা বিদেশযাত্রা সীমিত করার ভিত্তি উল্লেখ রয়েছে। এর মধ্যে আদালতের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা, নির্দিষ্ট অপরাধে সংশ্লিষ্টতা এবং জনস্বার্থ বা রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তাসংক্রান্ত কিছু বিষয় রয়েছে; তবে অবিবাহিত হওয়াকে আলাদা কোনো কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়নি।
দ্য ডেইলি স্টারের আইনি ব্যাখ্যাতেও বলা হয়েছে, প্রাপ্তবয়স্ক নারীর বিবাহিত বা অবিবাহিত হওয়া কিংবা তাঁর সঙ্গে স্বামী বা অভিভাবক আছেন কি না—এসব বিষয়কে বিদেশযাত্রার সাধারণ আইনি শর্ত হিসেবে পাসপোর্ট আদেশে রাখা হয়নি। তবে পাসপোর্ট থাকলেই যে কোনো পরিস্থিতিতে বিদেশযাত্রা নিশ্চিত, এমন নয়; গন্তব্য দেশের ভিসা, প্রবেশের অনুমতি এবং অন্যান্য ভ্রমণশর্তও প্রযোজ্য হতে পারে।
হাইকোর্ট একই সঙ্গে পুলিশের ইমিগ্রেশন শাখার অতিরিক্ত আইজিপির কাছে করা অভিযোগটি তদন্ত করে সাত দিনের মধ্যে নিষ্পত্তি এবং আদালতে প্রতিবেদন দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। ফলে তিন নারীর অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্ত ও জবাব এখন আদালতের পরবর্তী কার্যক্রমের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে।
এই পর্যায়ে হাইকোর্টের রুল চূড়ান্ত রায় নয়। আদালত সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে ব্যাখ্যা চেয়েছেন এবং অভিযোগের আইনগত ভিত্তি ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভূমিকা পরবর্তী শুনানিতে বিবেচিত হবে। এ বিষয়ে কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক জবাব ও তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পর বিষয়টির পরবর্তী অবস্থান আরও স্পষ্ট হবে