বাংলার লোকসংগীত ও ঐতিহ্যবাহী বাদ্যযন্ত্রের চর্চা নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিতে ব্যতিক্রমী উদ্যোগ নিয়েছে সাংস্কৃতিক ও মানবিক সংগঠন ‘মায়ের তরী’। সংগঠনটির উদ্যোগে লালমনিরহাট ও কুড়িগ্রামের প্রত্যন্ত গ্রামে ছয় শতাধিক শিশু শিখছে লোকগান ও দেশীয় বাদ্যযন্ত্র বাজানোর কৌশল।
একতারা, দোতারা ও বাঁশির সুরে মুখর হয়ে উঠছে উত্তরাঞ্চলের গ্রামীণ জনপদ। শিশুদের কণ্ঠে শোনা যাচ্ছে ভাওয়াইয়া, লালনগীতি, বাউল, মারফতি ও মুর্শিদি গান।
লালমনিরহাটের আদিতমারী উপজেলার দেওডোবা গ্রামে অবস্থিত ‘সুরালয় গুরুগৃহে’ বর্তমানে প্রায় ৭০ থেকে ৮০ জন শিশু নিয়মিত সংগীত ও বাদ্যযন্ত্রের প্রশিক্ষণ নিচ্ছে।
সংগঠনের তথ্য অনুযায়ী, লালমনিরহাট ও কুড়িগ্রাম জেলার মোট নয়টি গুরুগৃহে ছয় শতাধিক শিশু এই সাংস্কৃতিক কার্যক্রমে যুক্ত রয়েছে।
প্রশিক্ষণের মাধ্যমে শিশুরা শুধু গান শেখার সুযোগ পাচ্ছে না, বরং নিজেদের এলাকার ইতিহাস, লোকজ সংস্কৃতি এবং প্রাচীন সংগীতধারার সঙ্গেও পরিচিত হচ্ছে।
‘মায়ের তরী’র অন্যতম সংগঠক ইউসুফ আলমগীর জানান, লোকসংগীত চর্চার মাধ্যমে শিশুদের আত্মশুদ্ধি, জীবনবোধ এবং মানবিক মূল্যবোধ বিকাশের উদ্দেশ্যে এই কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে।
তাঁর মতে, শিশুদের স্থানীয় ঐতিহ্যের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার পাশাপাশি তাদের মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সহমর্মিতা এবং নৈতিক শিক্ষার বিকাশ ঘটানোও গুরুত্বপূর্ণ।
২০১৬ সালে নরওয়ের কবি, আলোকচিত্রী ও গবেষক উয়েরা সেথের স্থানীয় শিল্পী ও সাংস্কৃতিক কর্মীদের সহযোগিতায় সংগঠনটি প্রতিষ্ঠা করেন।
কুড়িগ্রামের রৌমারী উপজেলার একটি চরাঞ্চলে বন্যাদুর্গত মানুষের সঙ্গে সময় কাটানোর সময় স্থানীয় নারীদের কণ্ঠে মারফতি ও মুর্শিদি গান শুনে বাংলা লোকসংগীতের প্রতি তাঁর আগ্রহ তৈরি হয়।
পরবর্তী সময়ে সেই আগ্রহ থেকেই বাংলার লোকসংগীত সংরক্ষণ এবং শিশুদের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়ার উদ্যোগ নেন তিনি। লালন শাহের ৫৩টি গান নরওয়েজীয় ভাষায় অনুবাদ করে বই আকারেও প্রকাশ করেছেন উয়েরা সেথের।
সংগঠনটির নির্বাহী পরিচালক সুজন কুমার বোস জানান, সীমিত আর্থিক সামর্থ্যের মধ্যেও নয়টি গুরুগৃহের কার্যক্রম চালু রাখা হয়েছে। প্রত্যন্ত এলাকার শিশুদের প্রশিক্ষণ দেওয়া অধিকাংশ শিক্ষক প্রায় স্বেচ্ছাশ্রমের ভিত্তিতে কাজ করছেন।
তবে পর্যাপ্ত অর্থায়ন, স্থায়ী অবকাঠামো এবং প্রযুক্তিগত সুবিধার অভাব সংগঠনটির কার্যক্রম সম্প্রসারণে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে রয়েছে।
সংগঠনটি প্রবীণ লোকসংস্কৃতিচর্চাকারীদের স্বীকৃতি ও নিরাপত্তার জন্য স্থায়ী প্রতিষ্ঠান এবং লোকসংস্কৃতি গবেষণাকেন্দ্র প্রতিষ্ঠার উদ্যোগও নিয়েছে।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করছেন, সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সহযোগিতা পাওয়া গেলে শিশুদের লোকসংগীত শিক্ষা আরও বিস্তৃত করা সম্ভব হবে।





