দুর্গাপূজা ঘনিয়ে আসায় দেশের বিভিন্ন এলাকার প্রতিমা তৈরির কারখানাগুলোতে এখন ব্যস্ততা তুঙ্গে। দিন-রাত কাজ করছেন প্রতিমা শিল্পীরা। তবে কাজ বাড়লেও আগের মতো লাভ থাকছে না তাদের হাতে। বাঁশ, খড়, মাটি, রংসহ প্রয়োজনীয় উপকরণের দাম এবং শ্রমিকের মজুরি বেড়ে যাওয়ায় প্রতিমা তৈরির মোট খরচও বেড়েছে।
প্রতিমা নির্মাতারা বলছেন, প্রতিবছর পূজার আগে অর্ডার বাড়লেও উপকরণের দাম বৃদ্ধির সঙ্গে তাল মিলিয়ে প্রতিমার দাম বাড়ানো সম্ভব হয় না। ফলে বাড়তি খরচের বড় অংশই তাদের লাভ থেকে সমন্বয় করতে হচ্ছে।
প্রতিমা তৈরির শুরুতেই কাঠামো বানাতে লাগে বাঁশ ও খড়। এরপর মাটি দিয়ে গড়ে তোলা হয় প্রতিমার অবয়ব। শুকানোর পর চলে রং ও সাজসজ্জার কাজ। প্রতিটি ধাপে আলাদা শ্রম দরকার হওয়ায় শ্রমিকের মজুরি বাড়ার প্রভাবও সরাসরি পড়ে মোট উৎপাদন খরচে।
কারিগরদের ভাষ্য, আগে একটি প্রতিমা তৈরিতে যে খরচ হতো, এখন একই ধরনের প্রতিমায় তার চেয়ে অনেক বেশি ব্যয় হচ্ছে। কিন্তু পূজার কমিটি বা আয়োজকদের বাজেটের বিষয়টি বিবেচনায় রেখে প্রতিমার দাম ইচ্ছেমতো বাড়ানো যায় না। ফলে বিক্রি বাড়লেও লাভের হার আগের জায়গায় থাকছে না।
এদিকে প্রতিমা তৈরির কাজেও পরিবর্তন আসছে। অনেক জায়গায় কাঠামো ও নকশার কাজে আধুনিক সরঞ্জাম ও প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ছে। এতে কিছু কাজ দ্রুত করা সম্ভব হলেও হাতে তৈরি প্রতিমার ঐতিহ্যবাহী কারিগরি দক্ষতার প্রয়োজনীয়তা পুরোপুরি কমেনি।
বরং অভিজ্ঞ শিল্পীদের মতে, প্রতিমার মুখাবয়ব, চোখের কাজ, হাতের ভঙ্গি ও সাজসজ্জায় দক্ষতার বিষয়টি এখনো গুরুত্বপূর্ণ। এসব কাজ দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা ছাড়া নিখুঁতভাবে করা কঠিন।
তবে এই পেশায় নতুন প্রজন্মের আগ্রহ কমে যাওয়াকে বড় উদ্বেগ হিসেবে দেখছেন প্রবীণ কারিগররা। তাদের অনেকের সন্তানই অন্য পেশায় যেতে চান। কারণ হিসেবে তারা আয়-রোজগারের অনিশ্চয়তা, দীর্ঘ সময় কাজ এবং মৌসুমি পেশার সীমাবদ্ধতার কথা বলছেন।
প্রতিমা তৈরির কাজ মূলত পূজার মৌসুমকে কেন্দ্র করে বাড়ে। বছরের অন্য সময়ে একই মাত্রায় কাজ থাকে না। ফলে শুধু প্রতিমা বানিয়ে সারা বছর সংসার চালানো অনেক শিল্পীর জন্য কঠিন হয়ে পড়ে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বাজারের পরিবর্তন। একদিকে আয়োজকদের মধ্যে নকশা ও সাজসজ্জায় বৈচিত্র্যের চাহিদা বাড়ছে, অন্যদিকে নির্দিষ্ট বাজেটের মধ্যে সেই চাহিদা পূরণ করতে হচ্ছে শিল্পীদের। ফলে প্রতিমার নকশা, আকার ও সাজসজ্জার ক্ষেত্রে নতুন হিসাব করতে হচ্ছে তাদের।
প্রতিমা শিল্পীরা বলছেন, এই পেশা টিকিয়ে রাখতে শুধু পূজার সময়ের অর্ডারের ওপর নির্ভর করলে হবে না। শিল্পীদের নিয়মিত কাজের সুযোগ, প্রশিক্ষণ এবং ন্যায্য পারিশ্রমিক নিশ্চিত করা গেলে নতুন প্রজন্মকেও এ পেশায় আনা সম্ভব।
দুর্গাপূজার প্রস্তুতির ব্যস্ততার মধ্যে তাই প্রতিমা শিল্পীদের সামনে একদিকে যেমন বাড়তি কাজের সুযোগ তৈরি হয়েছে, অন্যদিকে বেড়েছে খরচের চাপ। প্রতিমার বাজারমূল্য বাড়লেও সেই বাড়তি অর্থ শিল্পীদের আয় হিসেবে পুরোপুরি থাকছে না। ফলে উৎসবের আগে তাদের হিসাবটা এখন শুধু কত প্রতিমা তৈরি হলো, তা নয়—শেষ পর্যন্ত হাতে কতটা লাভ থাকল, সেটিও।