রাজধানীর সেগুনবাগিচায় বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির সামনের দেয়ালে আঁকা বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রতিকৃতিতে কালি দেওয়ার ঘটনা ঘিরে আলোচনা ও প্রতিবাদের মধ্যে কড়া ভাষায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন কবি মোহন রায়হান।

রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে কথা বলতে গিয়ে তিনি প্রশ্ন তোলেন, ‘বেয়াদব, মূর্খ, গা/ণ্ডু, তোরা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বানান জানোস?’

মোহন রায়হানের এই বক্তব্যে রবীন্দ্রনাথের নামের বানান ও তাঁর সাংস্কৃতিক পরিচয় সম্পর্কে জানার বিষয়টি উঠে এসেছে। তবে বক্তব্যটির পূর্ণ ভিডিও ও প্রেক্ষাপট স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। ফলে মন্তব্যটি নির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তি বা সংগঠনকে উদ্দেশ করে দেওয়া হয়েছে বলে নিশ্চিত করা যাচ্ছে না।

এর আগে শনিবার (১০ অক্টোবর) দুপুরে শিল্পকলা একাডেমির সামনে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রতিকৃতিতে কালো কালি লাগিয়ে সেটি মুছে ফেলার চেষ্টা করেন একদল ব্যক্তি। এ সময় পুলিশ বাধা দিলে উভয় পক্ষের মধ্যে বাগ্‌বিতণ্ডা হয়।

ঘটনাস্থল থেকে রাষ্ট্র সংলাপ ফোরামের সদস্যসচিব আ ন ম আয়াসসহ চারজনকে আটক করে শাহবাগ থানা-পুলিশ। পরে তাঁদের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়।

প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, ঘটনাস্থলে এক নারীকে রবীন্দ্রনাথের প্রতিকৃতিতে কালি দিতে দেখা যায়। পুলিশ তাঁকে বাধা দিলে তিনি দাবি করেন, তাঁরা ভারতীয় আগ্রাসনের প্রতিবাদ জানাতে সেখানে এসেছেন।

তবে রবীন্দ্রনাথের প্রতিকৃতি মুছে ফেলার সঙ্গে রাজনৈতিক প্রতিবাদের সম্পর্ক কী, তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। এ ঘটনার পর শিল্পী, সাহিত্যিক ও সাংস্কৃতিক কর্মীদের মধ্যে প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়।

রোববার (১১ অক্টোবর) ঢাকার অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট জশিতা ইসলামের আদালতে চারজনকে হাজির করা হয়। তদন্ত কর্মকর্তা প্রত্যেকের ১০ দিনের রিমান্ড আবেদন করেন।

শুনানি শেষে আদালত আ ন ম আয়াস ও সাকিবুল হাসানের তিন দিন এবং সুজন মিয়া ও মারজিয়া খন্দকার রিমির দুই দিন করে রিমান্ড মঞ্জুর করেন।

মামলায় আসামিদের বিরুদ্ধে অপরাধমূলক ষড়যন্ত্র, বিভিন্ন গোষ্ঠীর মধ্যে শত্রুতা সৃষ্টি এবং ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের অভিযোগ আনা হয়েছে। তবে এসব অভিযোগ এখনো আদালতে প্রমাণিত হয়নি।

জানা গেছে, গত ৫ অক্টোবর ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের উদ্যোগে সেগুনবাগিচার ফুটপাত দখলমুক্ত করা হয়। পরে ফুটপাতসংলগ্ন দেয়ালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম, জয়নুল আবেদিন, সত্যজিৎ রায় ও ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরসহ শিল্প-সাহিত্য ও সংস্কৃতির ১০ জন গুণী ব্যক্তিত্বের প্রতিকৃতি আঁকা হয়।

এসব প্রতিকৃতি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রশ্ন তোলা হলে বিষয়টি নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়। এর পরদিনই রবীন্দ্রনাথের প্রতিকৃতিতে কালি দেওয়ার ঘটনা ঘটে।

এদিকে ঘটনার প্রতিবাদে রোববার বিকেলে শিল্পকলা একাডেমিসংলগ্ন এলাকায় ‘যে কবি জনতার’ শিরোনামে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করে বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর একাংশ।

অনুষ্ঠানে রবীন্দ্রসংগীত, কবিতা আবৃত্তি, নাটক ও নৃত্যের মাধ্যমে প্রতিবাদ জানান সাংস্কৃতিক কর্মীরা।

উদীচীর ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক সঙ্গীতা ইমাম তাঁর বক্তব্যে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে বাঙালির ভাষা, সাহিত্য, সংগীত ও সাংস্কৃতিক চেতনার অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে উল্লেখ করেন। প্রতিকৃতিতে কালি দেওয়ার ঘটনাকে তিনি সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের প্রতি অসম্মানজনক বলে মন্তব্য করেন।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বাংলা সাহিত্য ও সংগীতের অন্যতম প্রধান ব্যক্তিত্ব। কবিতা, গান, গল্প, উপন্যাস ও নাটকের মাধ্যমে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যকে বিশ্বপরিসরে পরিচিত করে তুলেছেন তিনি। ১৯১৩ সালে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার অর্জন করেন রবীন্দ্রনাথ।

তাঁর সাহিত্যিক ও সাংস্কৃতিক অবদান নিয়ে মতামত প্রকাশের অধিকার সবার থাকলেও প্রতিকৃতিতে কালি দেওয়া এবং সেটি মুছে ফেলার চেষ্টাকে কেন্দ্র করে এবার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও মতপ্রকাশের সীমা নিয়ে আলোচনা তৈরি হয়েছে।