পোশাকশ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির আন্দোলন দমনে সরকার আওয়ামী লীগ সরকারের সময়কার মতোই বলপ্রয়োগের পথ বেছে নিয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক ও জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম। তাঁর মন্তব্য, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে যেকোনো আন্দোলনে জামায়াত-শিবিরের সংশ্লিষ্টতা খোঁজা হতো, আর এখন বিএনপি যেকোনো আন্দোলনে আওয়ামী লীগের সংশ্লিষ্টতা খুঁজছে। এভাবে আন্দোলনের যৌক্তিকতা নস্যাৎ করার চেষ্টা করা হচ্ছে বলেও দাবি করেন তিনি।

বুধবার (৪ নভেম্বর) রাতে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল প্রাঙ্গণে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে এসব কথা বলেন নাহিদ ইসলাম। গাজীপুরে পোশাকশ্রমিক তৌফিক শেখের মৃত্যুর প্রতিবাদে আয়োজিত গায়েবানা জানাজায় অংশ নিতে গিয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষের ঘটনায় আহত এনসিপি ও জাতীয় শ্রমিক শক্তির নেতা-কর্মীদের দেখতে হাসপাতালে যান তিনি।

নাহিদ ইসলামের অভিযোগ, নিহত শ্রমিক তৌফিক শেখের স্মরণে আয়োজিত শান্তিপূর্ণ গায়েবানা জানাজার কর্মসূচিতেও পুলিশ, বিজিবিসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী হামলা চালিয়েছে। এতে জাতীয় শ্রমিক শক্তির আহ্বায়ক মাজহারুল ইসলাম ফকিরসহ ১৭ জন আহত হয়েছেন। আহত ব্যক্তিদের মধ্যে নারী শ্রমিকও রয়েছেন। তাঁদের কয়েকজনের অবস্থা গুরুতর বলে জানান তিনি।

পোশাকশ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির দাবিকে অত্যন্ত যৌক্তিক উল্লেখ করে নাহিদ ইসলাম বলেন, সরকার শুরু থেকেই আন্দোলনটি যথাযথভাবে সামাল দিতে পারেনি। আন্দোলন শুরু হওয়ার এক সপ্তাহ পর মজুরি বোর্ড গঠন করা হয়েছে। বোর্ড গঠনের পরও প্রথম তিন দিনে কোনো সভা হয়নি। পরিস্থিতি জটিল হওয়ার পর বুধবার প্রথম সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। তাঁর মতে, সরকারের অবহেলা ও বলপ্রয়োগের কারণেই আন্দোলন আরও বিস্তৃত হয়েছে।

তিনি আরও অভিযোগ করেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আন্দোলনটিকে শ্রমিক আন্দোলন হিসেবে স্বীকৃতি না দিয়ে এর পেছনে ষড়যন্ত্রের বিষয়টি সামনে আনছেন। এতে শ্রমিকদের প্রকৃত দাবিগুলো আড়ালে চলে যাচ্ছে। শ্রমিকদের সঙ্গে আলোচনা না করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ব্যবহার করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করা হচ্ছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

আন্দোলনে সহিংসতার জন্য বিএনপির নেতা-কর্মীদেরও দায়ী করেন নাহিদ ইসলাম। তাঁর অভিযোগ, গত মঙ্গলবার হকিস্টিক ও ক্রিকেট স্টাম্প নিয়ে একটি দল শ্রমিকদের ওপর হামলা চালিয়েছে। তিনি প্রশ্ন তোলেন, কার নির্দেশে এসব ব্যক্তি শ্রমিকদের পেটাতে রাস্তায় নেমেছেন। তবে তাঁর এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্যও গুরুত্বপূর্ণ।

নাহিদ ইসলাম আরও বলেন, কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ বিভিন্ন পরিস্থিতির সুযোগ নেওয়ার চেষ্টা করতে পারে। তবে তাঁর অভিযোগ, গাজীপুর ও সাভারসহ বিভিন্ন এলাকায় বিএনপি তাদের সুযোগ করে দিচ্ছে। আওয়ামী লীগের বিচার এবং ফ্যাসিবাদবিরোধী জাতীয় ঐকমত্যের প্রশ্নে বিএনপি প্রতিশ্রুতি রক্ষা করেনি বলেও দাবি করেন তিনি। তাঁর মতে, বর্তমান পরিস্থিতির রাজনৈতিক দায় সরকার ও বিএনপিকে নিতে হবে।

সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, শ্রমিকদের ন্যায্য দাবি মেনে নিয়ে তাঁদের সঙ্গে আন্তরিক আলোচনায় বসতে হবে। আন্দোলনরত শ্রমিকদের সঙ্গে মালিকপক্ষ এবং রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিনিধিদের নিয়ে একটি গ্রহণযোগ্য সমাধান বের করার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি। একই সঙ্গে নিহত তৌফিক শেখের পরিবারের জন্য আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) কনভেনশন অনুযায়ী ক্ষতিপূরণ, মৃত্যুর সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার এবং শ্রমিক নেতাদের বিরুদ্ধে করা অন্যায় মামলা প্রত্যাহারের দাবি জানান। গ্রেপ্তার শ্রমিক নেতা-কর্মীদের নিঃশর্ত মুক্তিরও আহ্বান জানান তিনি।

এদিকে গাজীপুরে শ্রমিক আন্দোলনের মধ্যে আহত হয়ে মারা যাওয়া পোশাকশ্রমিক তৌফিক শেখের মৃত্যুকে কেন্দ্র করে শিল্পাঞ্চলে উত্তেজনা অব্যাহত রয়েছে। পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, গত ২ নভেম্বর গাজীপুরে শ্রমিকদের আন্দোলনের সময় মোবাইল ফোনে সংঘর্ষ ও ভাঙচুরের ঘটনা ধারণ করতে গিয়ে হামলার শিকার হন তিনি। গুরুতর আহত অবস্থায় তাঁকে ঢাকার উত্তরার শিন শিন জাপান হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল। মঙ্গলবার চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়।

শ্রমিকদের প্রধান দাবি, বর্তমান মাসিক ন্যূনতম মজুরি ১২ হাজার ৫০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৩০ হাজার টাকা করা। বাড়িভাড়া, খাবার, চিকিৎসা ও যাতায়াত ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় বর্তমান মজুরিতে জীবনযাপন কঠিন হয়ে পড়েছে বলে দাবি করছেন তাঁরা। এ দাবিতে গাজীপুর, সাভার, আশুলিয়া, নারায়ণগঞ্জ ও ঢাকার বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে কয়েক দিন ধরে বিক্ষোভ, সড়ক অবরোধ এবং শ্রমিক-পুলিশ সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে।

অন্যদিকে, শ্রমিকদের মজুরি নির্ধারণের জন্য সরকার ছয় সদস্যের একটি নতুন ন্যূনতম মজুরি বোর্ড গঠন করেছে। গত ৪ নভেম্বর বোর্ডের প্রথম সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভা শেষে বোর্ডের চেয়ারম্যান জানিয়েছেন, নতুন মজুরি কাঠামো ডিসেম্বর থেকে কার্যকর করার পরিকল্পনা রয়েছে এবং নতুন কাঠামো অনুযায়ী প্রথম বেতন জানুয়ারিতে দেওয়া হতে পারে। তবে মজুরি কত টাকা নির্ধারণ করা হবে, সে বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।

শ্রমিকের মৃত্যুর ঘটনায় দোষীদের দ্রুত বিচারের আওতায় আনার আশ্বাস দিয়েছেন শ্রম ও কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী। ৪ নভেম্বর সচিবালয়ে এক বৈঠক শেষে তিনি জানান, নিহত শ্রমিকের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে এবং ঘটনার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের আইনের আওতায় আনার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি গাজীপুরের টঙ্গীতে শ্রমিকদের জন্য ১০০ শয্যার হাসপাতাল নির্মাণের পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি।

অন্যদিকে, গাজীপুরের শিল্পাঞ্চলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে বিজিবি, স্পেশাল রিজার্ভ ব্যাটালিয়ন, আনসার ও পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। সরকারি বার্তা সংস্থা বাসসের ৪ নভেম্বরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, অধিকাংশ কারখানায় উৎপাদন শুরু হয়েছিল এবং প্রধান সড়কগুলোতে যান চলাচল স্বাভাবিক ছিল। তবে একই দিনে বিভিন্ন এলাকায় শ্রমিকদের বিক্ষোভ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষের খবরও পাওয়া যায়।

শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির দাবি, আন্দোলনে প্রাণহানি, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা এবং রাজনৈতিক দলগুলোর পাল্টাপাল্টি অভিযোগে পরিস্থিতি জটিল হয়ে উঠেছে। নতুন মজুরি বোর্ডের সিদ্ধান্ত, শ্রমিকদের সঙ্গে মালিকপক্ষের আলোচনা এবং নিহত তৌফিক শেখের মৃত্যুর সুষ্ঠু তদন্তের ওপর এখন পরিস্থিতির পরবর্তী অগ্রগতি নির্ভর করছে।