ঠাকুরগাঁওয়ে সাগুনী শালবন রক্ষায় উদ্বেগ, নদীভাঙনে হারিয়েছে ৩০ একরের বেশি জমি

ঠাকুরগাঁওয়ের পীরগঞ্জ উপজেলায় টাঙ্গন নদের ভাঙনে সাগুনী শালবনের বিস্তীর্ণ এলাকা নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, নদীর ওপর রাবার ড্যাম নির্মাণের পর থেকে ভাঙনের তীব্রতা বেড়েছে। এতে এলাকার প্রাকৃতিক পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। তবে নদীভাঙনে ঠিক কত একর বনভূমি হারিয়েছে, সে বিষয়ে হালনাগাদ সরকারি পরিমাপ পাওয়া যায়নি।

সাগুনী শালবন স্থানীয় মানুষের কাছে এলাকার ‘ফুসফুস’ হিসেবে পরিচিত। বনটি শুধু প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্য নয়, পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা এবং স্থানীয় জীববৈচিত্র্যের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। বনটির আয়তন প্রায় ৯১ একর বলে স্থানীয়ভাবে উল্লেখ করা হলেও, বন বিভাগের আগের এক প্রতিবেদনে বাঁশগাড়া ও সাগুনী মৌজায় বনটির আয়তন ১৪৯ একর বলা হয়েছিল। ফলে বনটির বর্তমান আয়তন নিশ্চিত করতে হালনাগাদ জরিপ প্রয়োজন।

রাবার ড্যামের পানির স্রোতে ভাঙনের অভিযোগ

টাঙ্গন নদের ওপর সাগুনী এলাকায় নির্মিত রাবার ড্যামটি শুষ্ক মৌসুমে পানি ধরে রেখে কৃষিজমিতে সেচ দেওয়ার কাজে ব্যবহৃত হয়। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, নদীর পানি সংরক্ষণ এবং কৃষিকাজের সুবিধা বাড়াতে এ অবকাঠামো নির্মাণ করা হয়েছে। এর ফলে নদীর দুই পাড়ের কৃষকেরা সেচসুবিধা পাচ্ছেন।

তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, ড্যামের ওপর দিয়ে প্রবাহিত পানির স্রোতের ধাক্কায় নদীর পাড় ভাঙছে। বিশেষ করে ড্যামের ভাটির দিকে পর্যাপ্ত সুরক্ষাব্যবস্থা না থাকায় শালবনের জমি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলে তাঁদের ধারণা।

প্রথম আলোর এক প্রতিবেদনে স্থানীয় বাসিন্দাদের বক্তব্যের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট প্রকৌশল বিভাগের কর্মকর্তাদের তথ্য তুলে ধরা হয়েছিল। সেখানে বলা হয়, ড্যামের দুই পাশে সীমিত এলাকায় সিসি ব্লক বসানো হলেও বর্ষায় পানির প্রবল স্রোতে সুরক্ষাব্যবস্থার বাইরের অংশ ভেঙে যায়। স্থানীয় বাসিন্দারাও বন রক্ষায় স্থায়ী বাঁধ নির্মাণের দাবি জানান।

গাইড বাঁধ নির্মাণের প্রস্তাব, প্রয়োজন স্থায়ী সমাধান

নদীভাঙন ঠেকাতে রাবার ড্যামের উজান ও ভাটিতে গাইড বাঁধ নির্মাণের প্রস্তাব দেওয়ার তথ্যও আগের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। পীরগঞ্জের স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের এক উপসহকারী প্রকৌশলীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ড্যামের ভাটিতে ১০০ মিটার এবং উজানে ১৫০ মিটার গাইড বাঁধ নির্মাণের জন্য প্রকল্প প্রস্তাব পাঠানো হয়েছিল। তবে ওই প্রতিবেদনে প্রস্তাবটির পরবর্তী অগ্রগতি নিশ্চিত করা হয়নি।

দিনাজপুর বন বিভাগের তৎকালীন বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মো. আলী কবীরও শালবনের বিস্তীর্ণ এলাকা ভাঙনের ঝুঁকিতে থাকার কথা জানিয়েছিলেন। প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন করার কথাও তিনি বলেছিলেন।

নদীভাঙন প্রতিরোধে প্রস্তাবিত কাজের বর্তমান অবস্থা, নতুন করে কোনো প্রকল্প অনুমোদন হয়েছে কি না এবং বনের ক্ষতিগ্রস্ত অংশ রক্ষায় কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, তা হালনাগাদ তথ্যের মাধ্যমে নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

৮৪ একর বনভূমি উদ্ধার, রোপণ করা হয়েছে ৮৪ হাজার চারা

সাগুনী শালবন রক্ষার ক্ষেত্রে সাম্প্রতিক সময়ে বন বিভাগের একটি উদ্যোগের তথ্য পাওয়া গেছে। ২০২৬ সালের ২ জুলাই প্রকাশিত আজকের পত্রিকার প্রতিবেদন অনুযায়ী, পীরগঞ্জ উপজেলার বাঁশগাড়া মৌজায় সাগুনী শালবনের প্রায় ৮৪ একর গেজেটভুক্ত সংরক্ষিত বনভূমি উদ্ধার করে বন বিভাগ ও উপজেলা প্রশাসন। যৌথ অভিযানে জমিটি দখলমুক্ত করে পুনরায় বন বিভাগের নিয়ন্ত্রণে নেওয়া হয়।

পরে ১৪ জুলাই প্রকাশিত দৈনিক গণমুক্তির প্রতিবেদনে জানানো হয়, উদ্ধার করা বনভূমিতে ৮৪ হাজার বনজ ও ঔষধি গাছের চারা রোপণ করা হয়েছে। কর্মসূচিতে প্রায় ৫০০ শ্রমিক অংশ নেন। থুমনিয়া বনবিট কর্মকর্তা মহসিন আলী জানান, উদ্ধার করা জমি নিয়মিত নজরদারিতে রাখার উদ্যোগ নেওয়া হবে।

তবে অবৈধ দখল থেকে বনভূমি উদ্ধার এবং নদীভাঙনে জমি হারানোর বিষয় দুটি আলাদা। উদ্ধার করা ৮৪ একর জমির সঙ্গে নদীগর্ভে বিলীন হওয়া জমির হিসাব এক করে দেখার সুযোগ নেই। একইভাবে, নতুন চারা রোপণ বন পুনরুদ্ধারে সহায়ক হলেও নদীভাঙন ঠেকাতে আলাদা কারিগরি ব্যবস্থা প্রয়োজন।

সাগুনী শালবন রক্ষায় সমন্বিত উদ্যোগ জরুরি

সাগুনী শালবনকে টিকিয়ে রাখতে নদীভাঙনের প্রকৃত কারণ নির্ণয়, ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার পরিমাপ এবং প্রয়োজনীয় সুরক্ষাব্যবস্থা নির্ধারণ জরুরি। এ ক্ষেত্রে বন বিভাগ, স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর এবং পানি উন্নয়ন বোর্ডের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন হতে পারে।

পাশাপাশি উদ্ধার করা সংরক্ষিত বনভূমিতে রোপণ করা চারার পরিচর্যা, অবৈধ দখল প্রতিরোধ এবং বনাঞ্চলের নিয়মিত তদারকি অব্যাহত রাখা দরকার। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগের ভিত্তিতে নদীভাঙনের বর্তমান পরিস্থিতি সরেজমিনে যাচাই করাও গুরুত্বপূর্ণ।

টাঙ্গন নদের ভাঙন অব্যাহত থাকলে সাগুনী শালবনের আরও জমি হারানোর আশঙ্কা রয়েছে। তাই বনভূমি পুনরুদ্ধারের পাশাপাশি নদীভাঙন প্রতিরোধে কার্যকর ও দীর্ঘমেয়াদি ব্যবস্থা নেওয়া গেলে এই প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষার সুযোগ বাড়বে।