অতিথি পাখির মিলনমেলায় মুখর চলনবিল, সৌন্দর্যের আড়ালে শিকারিদের ফাঁদ
চলনবিল, ২৯ অক্টোবর ২০২৬: শীতের আগমনী বার্তায় অতিথি পাখির কলকাকলিতে মুখর হয়ে উঠেছে দেশের উত্তরাঞ্চলের বিস্তীর্ণ জলাভূমি চলনবিল। ভোরের আলো ফুটতেই জলাশয়ের ওপর দিয়ে ঝাঁকে ঝাঁকে উড়ে বেড়াচ্ছে নানা প্রজাতির পাখি। কোথাও অগভীর পানিতে মাছ শিকারে ব্যস্ত সাদা বক ও পানকৌড়ি, কোথাও আবার দল বেঁধে বিচরণ করছে বালিহাঁস ও শামুকখোল। তবে পাখিদের এই অবাধ বিচরণের পাশাপাশি অবৈধ শিকার নিয়ে উদ্বেগও বাড়ছে।
ভোরের আলোয় পাখির কোলাহল
নাটোর, পাবনা ও সিরাজগঞ্জ জেলার বিস্তীর্ণ এলাকা নিয়ে গড়ে ওঠা চলনবিল বর্ষা-পরবর্তী সময়ে নতুন রূপ ধারণ করে। পানি কমতে শুরু করলে বিভিন্ন খাল, বিল ও জলাশয়ে মাছের দেখা মেলে। খাবারের সন্ধানে তখন এসব জলাভূমিতে ভিড় করে বিভিন্ন প্রজাতির দেশি ও পরিযায়ী পাখি।
চলতি বছরের অক্টোবরের শেষ সপ্তাহেও চলনবিলের বিভিন্ন অংশে পাখির উপস্থিতি চোখে পড়ছে। নাটোর-বগুড়া মহাসড়কের দুই পাশ এবং সিংড়া-বারুহাস-তাড়াশ সড়কের আশপাশের জলাভূমিতে সাদা বক, পানকৌড়ি, শামুকখোল, বালিহাঁস ও ডাহুক দেখা যাচ্ছে। পাখির উড়াউড়ি, মাছ ধরার দৃশ্য আর জলরাশির ওপর তাদের বিচরণ উপভোগ করছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও প্রকৃতিপ্রেমীরা।
সকালে খাবারের সন্ধানে বের হওয়া পাখিদের ব্যস্ততা চলে দিনের বিভিন্ন সময়। অগভীর পানিতে ডুব দিয়ে ছোট মাছ ধরা, জলাশয়ের ওপর দিয়ে উড়ে যাওয়া কিংবা বিলের আশপাশের গাছে দল বেঁধে বসার দৃশ্য নজর কাড়ছে। সন্ধ্যা নামলে অনেক পাখি আবার গাছের ডালে আশ্রয় নেয়।
কৃষকের উপকারেও আসে পাখি
চলনবিলের পাখিরা শুধু প্রাকৃতিক সৌন্দর্য বাড়ায় না, কৃষিকাজেও ভূমিকা রাখে। স্থানীয় কৃষকদের ভাষ্য, সাদা বকসহ কিছু পাখি জমিতে থাকা ক্ষতিকর পোকামাকড় খেয়ে ফসলের উপকার করে। জমিতে হালচাষের সময় কৃষকের পেছনে পেছনে বকের দলকে ঘুরতেও দেখা যায়।
স্থানীয় কৃষক সহিদুল ইসলাম ও বাবুল হোসেন এনটিভিকে জানিয়েছেন, চলনবিলে পাখির উপস্থিতি এ বছরও চোখে পড়ার মতো। তাঁদের মতে, পাখির বিচরণে বিলের সৌন্দর্য বাড়ার পাশাপাশি কৃষকেরও উপকার হয়। পাখি শিকার ঠেকাতে স্থানীয় বাসিন্দারাও সতর্ক থাকার চেষ্টা করছেন।
পাখির নিরাপত্তায় উদ্বেগ
চলনবিলের প্রাকৃতিক পরিবেশের এই চিত্রের পাশাপাশি রয়েছে উদ্বেগজনক বাস্তবতাও। স্থানীয় পরিবেশকর্মীদের অভিযোগ, একশ্রেণির শিকারি বিভিন্ন ধরনের ফাঁদ পেতে পাখি ধরছে। বাঁশের খুঁটি, কলাপাতা ও খেজুরের ডাল দিয়ে তৈরি বিশেষ স্থাপনা, জাল এবং বিষটোপ ব্যবহার করে পাখি শিকারের খবরও প্রকাশিত হয়েছে।
২১ অক্টোবর প্রকাশিত যায়যায়দিনের এক প্রতিবেদনে চলনবিল এলাকায় পাখি শিকারের চিত্র তুলে ধরা হয়। ওই প্রতিবেদনে শিকারিদের জালে আটকে পড়া প্রায় ২০০টি কোয়েল পাখি বিক্রির জন্য হাটে নেওয়ার তথ্য উঠে আসে। পরিবেশকর্মীদের অভিযোগ, এ ধরনের শিকার পাখির নিরাপদ বিচরণ ও জলাভূমির জীববৈচিত্র্যের জন্য ঝুঁকি তৈরি করছে।
চলনবিল জীববৈচিত্র্য রক্ষা কমিটির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল ইসলাম জানিয়েছেন, পাখি শিকার বন্ধে সংগঠনটি ২০১২ সাল থেকে কাজ করছে। শিকারের খবর পেলে প্রশাসনকে জানানো, পাখি উদ্ধার এবং জনসচেতনতা তৈরির মতো উদ্যোগও নেওয়া হচ্ছে। তবে শিকার পুরোপুরি বন্ধ করতে নিয়মিত নজরদারি ও কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন বলে মনে করছেন পরিবেশসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
অভিযানে জরিমানা, ধ্বংস করা হয়েছে ফাঁদ
পাখি শিকার ঠেকাতে প্রশাসনিক পদক্ষেপের কথাও জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। এনটিভির ২৬ অক্টোবরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, চাটমোহর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মুসা নাসের চৌধুরী জানিয়েছেন, জীববৈচিত্র্য রক্ষা কমিটির সহযোগিতায় সম্প্রতি অভিযান চালিয়ে আটজন পাখি শিকারিকে জরিমানা করা হয়েছে। এ সময় পাখি শিকারের জন্য তৈরি ফাঁদ ও বিশেষ স্থাপনাও ধ্বংস করা হয়।
ওই কর্মকর্তা আরও জানান, চলনবিলের পাখি ও পরিবেশ রক্ষায় প্রশাসনের নজরদারি অব্যাহত রয়েছে। পাখি শিকার বন্ধে স্থানীয় বাসিন্দাদের সচেতন হওয়ার পাশাপাশি সবাইকে এগিয়ে আসার আহ্বানও জানিয়েছেন তিনি।
চলনবিলের জীববৈচিত্র্য রক্ষায় প্রয়োজন সম্মিলিত উদ্যোগ
চলনবিলের জলাভূমি মাছ, ফসল ও নানা প্রজাতির পাখির জন্য গুরুত্বপূর্ণ আবাসস্থল। শীতের মৌসুমে পাখির আগমন এ অঞ্চলের প্রকৃতিকে নতুন রূপ দেয়। তবে পাখির নিরাপদ বিচরণ নিশ্চিত করতে হলে শুধু অভিযান চালানোই যথেষ্ট নয়, শিকার বন্ধে নিয়মিত নজরদারি এবং স্থানীয় মানুষের সচেতনতাও জরুরি।
প্রকৃতিপ্রেমীদের কাছে চলনবিলের আকর্ষণ এর বিস্তীর্ণ জলরাশি, সবুজ প্রকৃতি ও পাখির অবাধ বিচরণ। এই সৌন্দর্য ধরে রাখতে হলে অতিথি পাখিকে শিকারির ফাঁদ থেকে নিরাপদ রাখতে হবে। পাখিরা যেন প্রতিবছর নির্বিঘ্নে ফিরে আসতে পারে, সে জন্য জলাভূমি ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে প্রশাসন, পরিবেশকর্মী ও স্থানীয় বাসিন্দাদের সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন।




