রোহিঙ্গা সংকটের টেকসই সমাধানে চীন ও মিয়ানমারের সঙ্গে নতুন করে আলোচনা করবে বাংলাদেশ। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির বলেছেন, নয় বছর ধরে চলা এই সংকটের স্থায়ী অবসান শুধু মানবিক সহায়তার মাধ্যমে সম্ভব নয়; এর জন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক সমাধান।
বৃহস্পতিবার ঢাকার ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে ‘দীর্ঘস্থায়ী রোহিঙ্গা সংকট: একটি সামগ্রিক সমাধানের অনুসন্ধান’ শীর্ষক আন্তর্জাতিক সম্মেলনে এ কথা জানান তিনি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ফরেন সার্ভিস একাডেমি ও জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা ইউএনএইচসিআর যৌথভাবে সম্মেলনটির আয়োজন করে।
হুমায়ুন কবির বলেন, ২০১৭ সাল থেকে বাংলাদেশ ১০ লাখের বেশি জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত মিয়ানমারের নাগরিককে আশ্রয় ও সুরক্ষা দিয়ে আসছে। দীর্ঘদিন ধরে এই দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে দেশের অর্থনীতি, পরিবেশ, সরকারি সেবা, স্থানীয় জনগোষ্ঠী ও জাতীয় নিরাপত্তার ওপর উল্লেখযোগ্য চাপ তৈরি হয়েছে।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর ভাষ্য, বাস্তুচ্যুতির নয় বছর পূর্ণ হওয়া সংকটকে স্বাভাবিক করে দেখার কারণ হতে পারে না। বরং সময় যত গড়াচ্ছে, সমাধানের তাগিদ তত বাড়ছে। তিনি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে শুধু সংহতি প্রকাশের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা ও দায়িত্ব ভাগ করে নেওয়ার আহ্বান জানান।
ঢাকা একই সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় ও বহুপক্ষীয় পর্যায়ে কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়ানোর কথা জানিয়েছে। হুমায়ুন কবির বলেন, জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে বাংলাদেশের ভূমিকা কাজে লাগিয়ে রোহিঙ্গা সংকটকে আবারও আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে আসা হবে।
চীনের ভূমিকাও বাংলাদেশের কূটনৈতিক উদ্যোগে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। জুনে বেইজিংয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও চীনের প্রধানমন্ত্রী লি ছিয়াংয়ের বৈঠকে রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে আলোচনা হয়। পরে হুমায়ুন কবির জানিয়েছিলেন, চীন মিয়ানমারের সঙ্গে সম্পৃক্ততার মাধ্যমে সংকট সমাধানে বাংলাদেশের পাশে থাকার আশ্বাস দিয়েছে।
ঢাকার অবস্থান হলো, রোহিঙ্গাদের নিজ ভূমি রাখাইনে নিরাপদ, স্বেচ্ছায়, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবাসনের পরিবেশ তৈরি করতে হবে। পাশাপাশি মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে সংঘটিত অপরাধের জবাবদিহিও এগিয়ে নিতে হবে। হুমায়ুন কবির বলেছেন, প্রত্যাবাসন ও ন্যায়বিচারের প্রক্রিয়া একসঙ্গেই এগোতে হবে।
জাতীয় সংসদেও সম্প্রতি রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে সরকারের অবস্থান তুলে ধরেছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী। তিনি বলেছেন, সংকটটি মিয়ানমারে সৃষ্টি হয়েছে এবং এর টেকসই সমাধানও মিয়ানমারেই নিহিত। একই সঙ্গে বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, স্বেচ্ছায় ও টেকসই প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করতে সরকার কাজ করছে বলে জানান তিনি।
বাংলাদেশের সামনে এখন বড় চ্যালেঞ্জ হলো দীর্ঘদিনের এই কূটনৈতিক অচলাবস্থা ভাঙা। চীনকে মিয়ানমারের ওপর প্রভাব বিস্তারে কাজে লাগানো, মিয়ানমারের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে চাপ বাড়ানো—এই তিন দিকেই ঢাকার তৎপরতা বাড়ছে। তবে প্রত্যাবাসনের বাস্তব পরিবেশ তৈরি না হওয়া পর্যন্ত সংকটের স্থায়ী সমাধান কতটা সম্ভব হবে, সেটিই এখন মূল প্রশ্ন।
