নতুন রূপে শুরু হয়েছে বাংলাদেশের প্রধান প্রথম শ্রেণির প্রতিযোগিতা জাতীয় ক্রিকেট লিগ, এনসিএল। ২০২৬-২৭ মৌসুমের ২৮তম আসর মাঠে গড়িয়েছে ৩ অক্টোবর, আর এবারের টুর্নামেন্টে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড বেশ কিছু দৃশ্যমান পরিবর্তন এনেছে। উদ্দেশ্য একটাই, ঘরোয়া ক্রিকেটকে ‘পিকনিক’ সংস্কৃতি থেকে সরিয়ে আরও প্রতিযোগিতামূলক করা এবং টেস্ট ক্রিকেটের জন্য শক্ত ভিত্তি তৈরি করা।
এবার আটটি বিভাগীয় দল সাত রাউন্ডে মোট ২৮টি ম্যাচ খেলবে। এক স্তরের এই প্রতিযোগিতায় প্রতিটি দল অন্য সাত দলের বিপক্ষে একটি করে ম্যাচ খেলবে, আর পয়েন্ট তালিকার শীর্ষ দল হবে চ্যাম্পিয়ন। শেষ রাউন্ড শেষ হওয়ার কথা ১৭ নভেম্বর।
সবচেয়ে বড় পরিবর্তন এসেছে ক্রিকেটারদের আর্থিক সুবিধায়। চার দিনের প্রথম শ্রেণির ম্যাচে একজন ক্রিকেটার এখন পাবেন ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা, যা আগের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। ওয়ানডেতে ম্যাচ ফি ১ লাখ টাকা এবং টি-টোয়েন্টিতে ৮০ হাজার টাকা নির্ধারণ করেছে বিসিবি।
শুধু অর্থ নয়, প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটের মর্যাদা বাড়াতে প্রতীকী পরিবর্তনও আনা হয়েছে। প্রথমবারের মতো আট বিভাগীয় দলের জন্য আলাদা রঙের ব্যাগি ক্যাপ দেওয়া হয়েছে। টুর্নামেন্ট শুরুর আগে মিরপুরের শেরেবাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়ামে বিশেষ অনুষ্ঠানে আট দলের অধিনায়কের হাতে এসব ক্যাপ তুলে দেন সংশ্লিষ্ট বিভাগের সাবেক ক্রিকেটাররা।
খুলনার মোহাম্মদ মিঠুন, বরিশালের ইফতেখার হোসেন ইফতি, ময়মনসিংহের রাকিবুল হাসান, সিলেটের জাকির হাসান, রংপুরের আকবর আলী, ঢাকার মাহিদুল ইসলাম অঙ্কন, রাজশাহীর প্রীতম কুমার দাস এবং চট্টগ্রামের ইয়াসির আলী রাব্বি নিজ নিজ দলের ব্যাগি ক্যাপ পেয়েছেন।
এর পাশাপাশি বিভাগভিত্তিক রঙের হেলমেটও দেওয়া হয়েছে ক্রিকেটারদের। অধিনায়কদের জন্য আলাদা ডিজাইনের ব্লেজার তৈরি করেছে বিসিবি। টসের সময় অধিনায়কদের সেই ব্লেজার পরতে দেখা যাচ্ছে, যা বাংলাদেশের প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে নতুন সংযোজন।
প্রথম দিনের খেলাতেই আট দলের অধিনায়ককে বিশেষ ব্লেজার পরে টসে নামতে দেখা গেছে। বিসিবি এটিকে শুধু সাজসজ্জার পরিবর্তন হিসেবে নয়, বরং প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটের ঐতিহ্য ও মর্যাদা বাড়ানোর উদ্যোগ হিসেবে দেখছে।
এবার এনসিএলে ফিরেছে কুকাবুরা বল। সাম্প্রতিক কয়েকটি আসরে ডিউক বল ব্যবহৃত হলেও এবার কুকাবুরা টেস্ট বল দিয়ে ম্যাচ হচ্ছে। বিসিবির পরিকল্পনায় আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ব্যবহৃত বলের সঙ্গে ঘরোয়া ক্রিকেটের অভিজ্ঞতার সামঞ্জস্য তৈরির বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে।
একটি কুকাবুরা বলের মূল্য প্রায় ১৪০ অস্ট্রেলিয়ান ডলার বলে বিসিবি-সংশ্লিষ্ট তথ্যে জানা গেছে। চলতি মৌসুমে আন্তর্জাতিক ও ঘরোয়া ক্রিকেটের বিভিন্ন প্রতিযোগিতার জন্য বড় পরিমাণে কুকাবুরা বল আমদানির সিদ্ধান্তও নিয়েছে বোর্ড।
এনসিএলের জন্য নতুন ঢাল আকৃতির ট্রফিও আনা হচ্ছে। মাঠের প্রতিযোগিতা ও আর্থিক কাঠামোর পাশাপাশি টুর্নামেন্টের ব্র্যান্ডিং ও পরিচয়কে নতুনভাবে সাজানোর অংশ হিসেবেই এটি করা হচ্ছে।
দীর্ঘদিন ধরে জাতীয় ক্রিকেট লিগের মান, প্রতিদ্বন্দ্বিতা, উইকেটের ধরন এবং ক্রিকেটারদের আগ্রহ নিয়ে সমালোচনা ছিল। কখনো কখনো প্রতিযোগিতাটিকে ‘পিকনিক ক্রিকেট’ বলেও আখ্যা দেওয়া হয়েছে। নতুন মৌসুমে সেই ধারণা বদলাতেই দৃশ্যমান ও কাঠামোগত পরিবর্তন এনেছে বিসিবি।
চট্টগ্রাম বিভাগের অধিনায়ক ইয়াসির আলী নতুন ব্যাগি ক্যাপকে প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটের জন্য সম্মানের প্রতীক হিসেবে দেখছেন। তিনি বলেছেন, যারা টেস্ট ক্রিকেট ভালোবাসেন, তাদের কাছে এই ক্যাপের আলাদা মর্যাদা রয়েছে।
তবে এবারের আসরের শুরুতে একটি বাস্তব সীমাবদ্ধতাও আছে। জাতীয় দলের ব্যস্ত আন্তর্জাতিক সূচির কারণে দেশের অনেক শীর্ষ ক্রিকেটার প্রথম দুই রাউন্ডে খেলতে পারছেন না। ফলে তরুণ ও ঘরোয়া ক্রিকেটারদের জন্য সুযোগ বাড়লেও তারকা ক্রিকেটারদের অনুপস্থিতি টুর্নামেন্টের শুরুতে বাড়তি চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে।
প্রথম রাউন্ডে মিরপুরে বর্তমান চ্যাম্পিয়ন রংপুরের মুখোমুখি হয়েছে ঢাকা। খুলনায় খেলছে খুলনা ও বরিশাল, সিলেটে সিলেটের প্রতিপক্ষ ময়মনসিংহ এবং চট্টগ্রামে মুখোমুখি হয়েছে চট্টগ্রাম ও রাজশাহী।
প্রথম দিনের খেলায় ব্যাট-বলের লড়াইটাও ছিল প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ। খুলনার হয়ে কালাম সিদ্দিকী ৯২ ও অধিনায়ক মোহাম্মদ মিঠুন ৮৯ রান করেন। সিলেটে ময়মনসিংহের মাহফিজুল ইসলাম অপরাজিত ৭০ রান করেন, আর চট্টগ্রামে রাজশাহীর দুই ওপেনার সাব্বির হোসেন ও হাবিবুর রহমান সোহান হাফসেঞ্চুরি করেন।
মিরপুরে রংপুরের দুই ওপেনার মিম মোসাদ্দেক ও অনিক সরকার শতরানের ওপেনিং জুটি গড়লেও পরে ঢাকা নিয়মিত উইকেট তুলে ম্যাচে ফেরে। নতুন মৌসুমের প্রথম দিন থেকেই তাই প্রতিযোগিতামূলক ক্রিকেটের আভাস মিলেছে।
এনসিএলের এই পরিবর্তনগুলো শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের টেস্ট ক্রিকেটে কতটা প্রভাব ফেলবে, তা বোঝা যাবে সময়ের সঙ্গে। তবে ম্যাচ ফি বাড়ানো, প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটের আলাদা পরিচয় তৈরি, আন্তর্জাতিক মানের বল ব্যবহার এবং টুর্নামেন্টের মর্যাদা বাড়ানোর উদ্যোগ মিলিয়ে এবারের জাতীয় ক্রিকেট লিগকে আগের আসরগুলোর তুলনায় ভিন্নভাবে সাজানোর চেষ্টা স্পষ্ট।




