শিক্ষকতা থেকে অবসর নিয়েছেন পাঁচ বছর আগে। তবে শিশুদের নিয়ে কাজ করার আগ্রহ এখনো কমেনি তাঁর। নিজের পেনশনের টাকা, ধান ও আম বিক্রির অর্থ মিলিয়ে প্রায় ৫০ লাখ টাকা ব্যয়ে শিশুদের জন্য গড়ে তুলেছেন বিনা মূল্যের বিনোদনকেন্দ্র ‘প্রকৃতির পাঠশালা’। নওগাঁর সাপাহার উপজেলার তিলনা গ্রামে অবসরপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক শামসুর রহমানের এই উদ্যোগে প্রতিদিন আনন্দে মেতে উঠছে এলাকার শিশুরা।
স্থানীয় চাঁচাহার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ছিলেন শামসুর রহমান। ২০২১ সালে চাকরি থেকে অবসরে যাওয়ার পর শিশুদের জন্য কিছু করার চিন্তা থেকেই তিনি এই উদ্যোগ নেন। নিজের পৈতৃক ৯০ শতাংশ জমিতে ২০২৪ সালে চালু করেন ‘প্রকৃতির পাঠশালা’। জমিটির বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় এক কোটি টাকা বলে জানা গেছে। সব মিলিয়ে বিনোদনকেন্দ্রটি গড়ে তুলতে তাঁর ব্যয় হয়েছে প্রায় ৫০ লাখ টাকা।
পার্কটিতে রয়েছে বিভিন্ন জাতের ফুল ও ফলের গাছ, শিশুদের জন্য দোলনা, স্লিপারসহ নানা ধরনের খেলাধুলার উপকরণ। পাশাপাশি সাজানো হয়েছে কুমির, সিংহসহ বিভিন্ন পশুপাখির প্রতিকৃতি। রয়েছে পুরোনো দিনের কৃষিকাজে ব্যবহৃত নানা উপকরণও। ফলে এখানে এসে শিশুরা শুধু খেলাধুলা করছে না, প্রকৃতি ও প্রাণিজগৎ সম্পর্কেও জানার সুযোগ পাচ্ছে।
প্রতিদিন বিকেল হলেই শিশুদের পদচারণায় মুখর হয়ে ওঠে পার্কটি। তাদের সঙ্গে আসেন মা-বাবা ও অভিভাবকেরাও। ঈদ ও পূজার মতো উৎসবের সময় দর্শনার্থীর সংখ্যা আরও বেড়ে যায়। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, এখানে প্রবেশের জন্য কোনো টিকিট বা অর্থ দিতে হয় না। সবার জন্যই বিনা মূল্যে উন্মুক্ত রাখা হয়েছে পুরো বিনোদনকেন্দ্র।
শামসুর রহমানের কাছে শিশুদের সঙ্গে সময় কাটানো নতুন কিছু নয়। শিক্ষকতা জীবনে বিদ্যালয়ের ফুলের বাগান তৈরি, গাছের পরিচর্যা ও বিদ্যালয় পরিষ্কার রাখার কাজে তিনি নিজেই অংশ নিতেন। শিক্ষার্থীদেরও এসব কাজে উৎসাহিত করতেন। ভালো কাজের জন্য পুরস্কার দেওয়ার ব্যবস্থাও রেখেছিলেন।
অবসরের পরও সেই অভ্যাস ধরে রেখেছেন তিনি। প্রতিদিন সকালে নিজের হাতে পার্ক পরিষ্কার করেন, গাছে পানি দেন এবং সবকিছুর দেখভাল করেন। শিশুদের সঙ্গে সময় কাটানোর পাশাপাশি ফুলের নাম, গাছের পরিচয় ও বিভিন্ন পশুপাখি সম্পর্কে তাদের ধারণা দেন।
শামসুর রহমানের ভাষ্য, সাপাহার উপজেলায় শিশুদের মানসিক বিকাশ ও বিনোদনের জন্য পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেই। গ্রামের খালি জায়গাগুলোও সাধারণত বাণিজ্যিক কাজে ব্যবহার করা হয়। তাই শিশুদের জন্য একটি উন্মুক্ত জায়গা তৈরি করার সিদ্ধান্ত নেন তিনি। সারা জীবন শিশুদের নিয়ে কাজ করেছেন, বাকি জীবনও তাদের কল্যাণে কাটাতে চান বলে জানিয়েছেন এই শিক্ষক।
স্থানীয় বাসিন্দারাও তাঁর উদ্যোগে সন্তুষ্ট। তিলনা ইউনিয়ন পরিষদের ১ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য দেলোয়ার হোসেন চৌধুরী বলেন, শামসুর রহমানের উদ্যোগটি ব্যতিক্রমী। এটি শুধু শিশুদের নয়, বড়দেরও উপকারে আসছে। সম্প্রতি ইউনিয়ন পরিষদের পক্ষ থেকে সেখানে একটি পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে।
পার্কে শিশুদের জন্য সময় দেওয়ার পাশাপাশি বিভিন্ন বিদ্যালয়েও নিয়মিত যাতায়াত করেন শামসুর রহমান। শিক্ষার্থীদের হাতে তুলে দেন কলম, খাতা, টিফিন ক্যারিয়ারসহ নানা উপহার। সপ্তাহের বিভিন্ন সময়ে কোনো না কোনো বিদ্যালয়ে গিয়ে শিশুদের সঙ্গে সময় কাটান তিনি।
তাঁর পরিবারের সদস্যদের কাছেও শিশুদের জন্য এই কাজ করে যাওয়ার বিষয়টি নতুন নয়। শামসুর রহমানের জামাতা খোরশেদ আলমের ভাষ্য, সারা জীবনই মানুষের জন্য কিছু করার চেষ্টা করেছেন তাঁর শ্বশুর। অবসর নেওয়ার পরও সেই প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছেন।
সাপাহার উপজেলা সদর থেকে প্রায় সাড়ে ৯ কিলোমিটার দক্ষিণে তিলনা গ্রামের ধন্টিপাড়ায় অবস্থিত এই বিনোদনকেন্দ্র। স্থানীয়দের কাছে এটি এখন শিশুদের খেলাধুলা ও অবসর কাটানোর পরিচিত জায়গা। শুধু শিশুদের আনন্দ দেওয়াই নয়, প্রকৃতির সঙ্গে তাদের পরিচয় করিয়ে দেওয়ারও চেষ্টা চলছে এখানে।
চাকরিজীবনের দায়িত্ব শেষ হলেও শিশুদের প্রতি দায়িত্ববোধ থেকে সরে আসেননি শামসুর রহমান। নিজের সঞ্চিত অর্থ ব্যয় করে তৈরি করেছেন এমন একটি জায়গা, যেখানে অর্থের অভাবে কোনো শিশুকে বিনোদন থেকে বঞ্চিত হতে হয় না। তাঁর ‘প্রকৃতির পাঠশালা’ এখন তিলনা গ্রামের শিশুদের আনন্দের পাশাপাশি শেখারও একটি উন্মুক্ত ঠিকানা।
