একসময় সংসারের নয় সদস্যের জন্য প্রতিদিনের খাবার জোগাড় করাই ছিল কক্সবাজারের উত্তর নুনিয়াছড়ার মরিয়ম বেগমের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। স্বামী নুরুল আলম ভ্যান চালিয়ে যা আয় করতেন, তা দিয়ে পরিবারের খরচ সামলানো কঠিন হয়ে পড়ত। সন্তানদের পড়াশোনা, পোশাক ও নিয়মিত খাবারের ব্যবস্থা করতে গিয়ে নানা সংকটে পড়তে হতো পরিবারটিকে। সেই পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসার পথ খুঁজতে গিয়ে সামুদ্রিক শৈবাল চাষের সঙ্গে যুক্ত হন মরিয়ম। এখন তিনি নিজে সফল চাষি হওয়ার পাশাপাশি আশপাশের প্রায় ৫০০ মানুষকে এ পেশার প্রশিক্ষণ দিয়েছেন।

কক্সবাজারের উত্তর নুনিয়াছড়ার পানিরকুপ্পাড়ায় প্রায় চার দশক ধরে বসবাস করছেন মরিয়ম। শৈবাল চাষ শুরুর আগে তিনি সমুদ্রসৈকত থেকে ঝিনুক ও শামুকের খোলস সংগ্রহ করতেন। সেগুলো দিয়ে মালা, চুড়ি ও বিভিন্ন সাজসজ্জার সামগ্রী তৈরি করে বিক্রি করতেন। তবে সেই আয় দিয়ে পরিবারের প্রয়োজন মেটানো কঠিন ছিল।

২০১৬ সালে সৈকতে খোলস সংগ্রহের সময় বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বারি) কয়েকজন গবেষককে সামুদ্রিক শৈবাল চাষের পরীক্ষামূলক কাজ করতে দেখেন মরিয়ম। তাঁদের কাজ পর্যবেক্ষণ করতে করতে চাষের পদ্ধতি সম্পর্কে জানতে শুরু করেন তিনি। পরে গবেষকদের উৎসাহে নিজেই শৈবাল চাষের উদ্যোগ নেন। প্রথম দিকে স্বামীর অনাগ্রহ থাকলেও মরিয়ম হাল ছাড়েননি। মাত্র ১০টি দড়িতে চাষ শুরু করেন তিনি। পরের বছর দড়ির সংখ্যা বাড়িয়ে করেন ২০টি। ধীরে ধীরে অভিজ্ঞতা ও আয় বাড়তে থাকলে তাঁর স্বামীও কাজে সহযোগিতা শুরু করেন।

প্রায় এক দশকের ব্যবধানে মরিয়মের খামারে দড়ির সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩৫০টিতে। প্রতিটি দড়িতে প্রায় ৮ থেকে ১০ কেজি কাঁচা শৈবাল উৎপাদিত হয়। শুকানোর পর প্রতি দড়ির শৈবাল থেকে আনুমানিক এক কেজি পাওয়া যায়। তিনি বছরে প্রায় ২০০ থেকে ৩০০ কেজি শুকনো শৈবাল বিক্রি করেন। পাশাপাশি কাঁচা শৈবালও বিক্রি করেন। বর্তমানে তিনি উলভা ও গ্র্যাসিলারিয়া প্রজাতির শৈবাল চাষ করছেন।

শুরুর দিকে উৎপাদিত শৈবাল বিক্রি করাও ছিল বড় সমস্যা। ক্রেতা খুঁজতে মরিয়মের স্বামী বান্দরবান, আলীকদম, খাগড়াছড়ি ও মীরসরাইসহ বিভিন্ন এলাকায় যেতেন। পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মাধ্যমে তাঁদের পণ্যের পরিচিতি বাড়ে। ফেসবুকের বিভিন্ন গ্রুপে মরিয়মের চাষের খবর ছড়িয়ে পড়ায় দেশের বিভিন্ন এলাকার ক্রেতারা সরাসরি যোগাযোগ করতে শুরু করেন। বর্তমানে ঢাকা, রাজশাহী, সিলেট, ময়মনসিংহ, চট্টগ্রাম ও খুলনার ক্রেতাদের কাছেও তাঁর শৈবাল পৌঁছায়। কক্সবাজারের কয়েকটি হোটেল, রিসোর্ট ও গবেষণাকেন্দ্রও তাঁর ক্রেতাদের মধ্যে রয়েছে।

তবে মরিয়মের কাছে নিজের ব্যবসার সাফল্যের চেয়েও বড় বিষয় হলো অন্যদের আয়ের সুযোগ তৈরি করা। নিজের জীবনে আর্থিক সংকটের অভিজ্ঞতা থাকায় তিনি জানেন, উপকূলের অনেক নারীর জন্য স্বনির্ভর হওয়ার সুযোগ পাওয়া কতটা কঠিন। তাই নিজের শেখা কৌশল অন্যদের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে শুরু করেন। বিনামূল্যে প্রশিক্ষণ দিয়ে তাঁদের শৈবাল চাষে আগ্রহী করে তোলেন।

বর্তমানে মরিয়মের সঙ্গে ৭৭ জন কাজ করেন, তাঁদের মধ্যে ৬০ জনের বেশি নারী। এ ছাড়া আশপাশের এলাকার প্রায় ৫০০ মানুষকে তিনি সামুদ্রিক শৈবাল চাষের প্রশিক্ষণ দিয়েছেন। তাঁদের অনেকেই এ পেশার মাধ্যমে বিকল্প জীবিকার সুযোগ খুঁজছেন। নারীদের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ বাড়ানো ও স্থানীয় পর্যায়ে আয়ের পথ তৈরিতে তাঁর এই উদ্যোগ ভূমিকা রাখছে।

সামুদ্রিক শৈবাল চাষে নিয়মিত পরিচর্যা ও পরিবেশ সম্পর্কে ধারণা থাকা জরুরি। সাধারণত দড়িতে শৈবালের ছোট চারা নির্দিষ্ট দূরত্বে বেঁধে সমুদ্রের পানিতে স্থাপন করা হয়। প্রথমবার ফসল সংগ্রহ করতে প্রায় ২২ দিন লাগে। পরবর্তী সময়ে ১৪ থেকে ১৫ দিনের ব্যবধানে শৈবাল সংগ্রহ করা যায়। বাংলাদেশে সাধারণত অক্টোবর থেকে মার্চ পর্যন্ত চাষের উপযোগী সময়। বর্ষাকালে বৃষ্টির পানি ও নদীর প্রবাহে সমুদ্রের পানির লবণাক্ততা কমে যাওয়ায় চাষ ব্যাহত হতে পারে।

চাষের দড়ি নিয়মিত পরীক্ষা করাও প্রয়োজন। মাছ ধরার জাল, পানির প্রবল স্রোত ও ভাসমান আবর্জনায় দড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এ কারণে প্রতিদিন দীর্ঘ সময় পানিতে থেকে খামারের পরিচর্যা করতে হয় মরিয়মকে।

সামুদ্রিক শৈবাল চাষে অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে ২০২৬ সালের ১৫ মে আবুল খায়ের গ্রুপের দেওয়া ‘এম-রাইজ হিরো’ স্বীকৃতি পান মরিয়ম। সামাজিক পরিবর্তনে ভূমিকা রাখার জন্য নির্বাচিত ছয়জনের মধ্যে তিনি ছিলেন একজন।

একসময় যিনি শিক্ষার সুযোগ না পাওয়ায় মানুষের সামনে কথা বলতে সংকোচ বোধ করতেন, এখন বিভিন্ন অনুষ্ঠানে নিজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন। তাঁর সন্তানদের জীবনেও এসেছে পরিবর্তন। চার মেয়ের বিয়ে দিয়েছেন, আর ছোট সন্তানদের পড়াশোনা চলছে। পরিবারের বসবাসের পরিবেশও আগের তুলনায় ভালো হয়েছে।

মরিয়মের যাত্রা দেখায়, সঠিক প্রশিক্ষণ, নিজের চেষ্টা ও নতুন জীবিকার সুযোগ পেলে উপকূলের নারীরাও পরিবারকে আর্থিকভাবে সহায়তা করার পাশাপাশি অন্যদের জন্য কাজের সুযোগ তৈরি করতে পারেন। তাঁর কাছে সামুদ্রিক শৈবাল এখন শুধু আয়ের উৎস নয়, বরং নিজের অভিজ্ঞতা ভাগ করে নিয়ে অন্যদের এগিয়ে যাওয়ার পথ তৈরির একটি মাধ্যম।