খাদ্যে ভেজাল, ক্ষতিকর রাসায়নিকের অবশিষ্টাংশ এবং নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে নজরদারির ঘাটতি জনস্বাস্থ্যের জন্য উদ্বেগের বিষয় হয়ে উঠেছে। এসব ঝুঁকি মোকাবিলায় শুধু খাদ্য উৎপাদন বাড়ানো নয়, উৎপাদিত খাদ্যের গুণগত মান নিশ্চিত করা, গবেষণার ফল কাজে লাগানো এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সমন্বয় বাড়ানো প্রয়োজন।
রোববার (২৫ অক্টোবর) রাজধানীর বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি, বাংলাদেশের (আইইউবি) অডিটোরিয়ামে বাংলাদেশ সোসাইটি ফর সেফ ফুডের (বিএসএসএফ) উদ্যোগে খাদ্য নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্যবিষয়ক ষষ্ঠ জাতীয় কারিগরি সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়। বিশ্ব ডিম দিবস ও বিশ্ব খাদ্য দিবস ২০২৬ উদ্যাপন উপলক্ষে আয়োজিত এ অনুষ্ঠানে সহযোগী আয়োজক হিসেবে ছিল ক্যাবি ইন্টারন্যাশনাল (CABI)।
সেমিনারে প্রধান অতিথি ছিলেন কৃষি এবং মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ। তিনি নিরাপদ ও মানসম্মত খাদ্য নিশ্চিত করতে কীটনাশকের আমদানি, বাজারজাতকরণ ও ব্যবহারে কঠোর নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন।
মন্ত্রী বলেন, দেশে এমন কিছু কীটনাশক আমদানি ও বাজারজাত করা হচ্ছে, যেগুলো বিশ্বের অনেক দেশে ব্যবহার করা হয় না। এ পরিস্থিতিতে কীটনাশক আমদানির বিদ্যমান নীতিমালা ও পরীক্ষাব্যবস্থা পর্যালোচনা করে কার্যকর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা প্রয়োজন। এ বিষয়ে সরকার একাধিক কমিটি গঠন করেছে বলেও জানান তিনি। সংশ্লিষ্ট বিজ্ঞানী, বিশেষজ্ঞ, আমদানিকারক ও অন্যান্য অংশীজনের সঙ্গে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
কৃষিমন্ত্রী আরও বলেন, শুধু উৎপাদন বাড়ালেই হবে না, উৎপাদিত খাদ্য নিরাপদ, পুষ্টিকর ও মানসম্মত কি না, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে। কীটনাশকের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার কৃষক ও ভোক্তা উভয়ের জন্য স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করতে পারে। অনেক কৃষক প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ ও কারিগরি জ্ঞানের অভাবে কীটনাশক এবং রাসায়নিক সার ব্যবহারে নির্ধারিত মাত্রা অনুসরণ করতে পারেন না। তাই কৃষকদের সচেতনতা বৃদ্ধি, প্রশিক্ষণ এবং উত্তম কৃষিচর্চার প্রসার জরুরি।
সেমিনারে কৃষি ও নিরাপদ খাদ্যবিষয়ক মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বাংলাদেশ অ্যাক্রেডিটেশন কাউন্সিলের পূর্ণকালীন সদস্য অধ্যাপক ড. মো. ওয়াকিলুর রহমান। তিনি নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন, জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা এবং টেকসই কৃষিব্যবস্থার মধ্যে সম্পর্ক তুলে ধরেন। খাদ্যে ভেজাল ও অনিরাপদ খাদ্য গ্রহণের স্বাস্থ্যগত প্রভাব মোকাবিলায় গবেষণা, কার্যকর আইন প্রয়োগ এবং সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সমন্বয়ের প্রয়োজনীয়তাও আলোচনায় উঠে আসে।
কৃষিতে কীটনাশকের অতিরিক্ত ব্যবহার এবং ফসল সংগ্রহের আগে নির্ধারিত সময় না মানার কারণে খাদ্যে রাসায়নিকের অবশিষ্টাংশ থেকে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। এ সমস্যা মোকাবিলায় উৎপাদনস্থল থেকে শুরু করে বাজার ও ভোক্তার কাছে পৌঁছানো পর্যন্ত পুরো সরবরাহব্যবস্থায় নজরদারি প্রয়োজন। কৃষকদের নিরাপদ কীটনাশক ব্যবহার, সঠিক মাত্রা অনুসরণ এবং উত্তম কৃষিচর্চা সম্পর্কে প্রশিক্ষণ দেওয়ার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়।
কীটনাশক ব্যবহারের নিরাপত্তা নিয়ে ক্যাবি ইন্টারন্যাশনালের বাংলাদেশ প্রতিনিধি সালেহ আহমেদ সচেতনতা বৃদ্ধি এবং আইন কার্যকরভাবে প্রয়োগের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন। কীটনাশক বিক্রেতাদের প্রশিক্ষণ এবং কৃষকদের সঠিক ব্যবহারবিধি সম্পর্কে জানানো হলে অনিরাপদ প্রয়োগের ঝুঁকি কমাতে সহায়তা মিলতে পারে।
প্রাণিসম্পদ ও মৎস্য খাতের নিরাপত্তা নিয়েও সেমিনারে আলোচনা হয়। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের মাইক্রোবায়োলজি অ্যান্ড হাইজিন বিভাগের অধ্যাপক ড. কেএইচএম নাজমুল হুসাইন নাজির এ বিষয়ে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন। পোলট্রি খাতে অ্যান্টিবায়োটিকের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার, প্রাণিজ খাদ্যের নিরাপত্তা এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় নজরদারির প্রয়োজনীয়তা আলোচনায় গুরুত্ব পায়।
মৎস্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. মো. খালেদ কনক মৎস্য খাতের উন্নয়নে গবেষক, উৎপাদক ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সহযোগিতা বাড়ানোর আহ্বান জানান। নিরাপদ ও মানসম্মত মাছ উৎপাদন এবং প্রক্রিয়াজাতকরণের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের অবস্থান আরও শক্তিশালী করার সুযোগ রয়েছে বলেও আলোচনায় উঠে আসে।
সেমিনারে বিশ্ব ডিম দিবস ২০২৬-এর প্রতিপাদ্য ছিল ‘প্রোটিন দ্যাট পাওয়ারস অ্যান্ড প্রটেক্টস’। এতে ডিমের পুষ্টিগুণ এবং জনস্বাস্থ্যে এর ভূমিকা তুলে ধরা হয়। অন্যদিকে, বিশ্ব খাদ্য দিবস ২০২৬-এর প্রতিপাদ্য ‘ইনোভেট টুডে, নারিশ টুমরো’, যার মূল বার্তা হলো খাদ্য উৎপাদন, পুষ্টি নিশ্চিতকরণ এবং টেকসই খাদ্যব্যবস্থার উন্নয়নে উদ্ভাবনকে গুরুত্ব দেওয়া।
অনুষ্ঠানে প্রধান পৃষ্ঠপোষক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন আইইউবির উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. ড্যানিয়েল ডব্লিউ. লুন্ড। বিশেষ অতিথিদের মধ্যে ছিলেন জামালপুর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. আমির হোসেন, বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান মো. শফিকুল ইসলাম, মৎস্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. মো. খালেদ কনক এবং কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের পরিচালক ড. মোহাম্মদ এনায়েত-ই-রাব্বী। সম্মানিত অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন বাংলাদেশ পোলট্রি ইন্ডাস্ট্রিজ সেন্ট্রাল কাউন্সিলের সভাপতি মশিউর রহমান।
সেমিনারে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় এবং ক্যাবি ইন্টারন্যাশনালের বিশেষজ্ঞরাও বিভিন্ন প্রবন্ধের ওপর আলোচনা করেন। অনুষ্ঠানে নিরাপদ খাদ্যবিষয়ক কুইজ প্রতিযোগিতা আয়োজন করা হয়। অংশগ্রহণকারীদের প্রশ্ন, মতামত ও পরামর্শ সংগ্রহের ব্যবস্থাও রাখা হয়, যাতে সেগুলো পর্যালোচনা করে পরবর্তী সময়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া যায়।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বিএসএসএফের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ও আয়োজক কমিটির আহ্বায়ক ড. মোহাম্মদ রফিকুল ইসলাম। স্বাগত বক্তব্য দেন বিএসএসএফের সাংগঠনিক সম্পাদক ও আইইউবির লাইফ সায়েন্সেস বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. জীবুন্নাহার খন্দকার। অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক ডা. মোহাম্মদ সরোয়ার জাহান।
সেমিনারে আলোচনার মূল বার্তা হলো, নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করা কোনো একক প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব নয়। কৃষক, উৎপাদক, ব্যবসায়ী, গবেষক, নীতিনির্ধারক ও ভোক্তাদের সম্মিলিত ভূমিকা প্রয়োজন। কীটনাশকের মান নিয়ন্ত্রণ, কৃষকদের প্রশিক্ষণ, নিয়মিত খাদ্য পরীক্ষা, গবেষণার ফলের ব্যবহার এবং উৎপাদন থেকে ভোক্তা পর্যন্ত নজরদারি জোরদার করা গেলে নিরাপদ খাদ্যব্যবস্থা গড়ে তোলার পথে অগ্রগতি সম্ভব।

