কর্মজীবী মায়েদের শিশুদের জন্য সারা দেশে সরকারি ব্যবস্থায় বর্তমানে ৬৪টি শিশু দিবাযত্ন কেন্দ্র পরিচালিত হচ্ছে। এসব কেন্দ্রে ১৫ দিন থেকে ছয় বছর বয়সী প্রায় ৪ হাজার ৫০টি শিশুর দিনের বেলায় পরিচর্যার ব্যবস্থা রয়েছে বলে গত সেপ্টেম্বরে জাতীয় সংসদে জানিয়েছেন সমাজকল্যাণমন্ত্রী ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন।

মন্ত্রী জানান, ৬৪টি কেন্দ্রের মধ্যে ৪৪টি মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের অধীনে এবং আরও ২০টি দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পরিচালিত হচ্ছে। শিশুদের জন্য এসব কেন্দ্রে মায়েদের কর্মঘণ্টার সঙ্গে মিল রেখে সকাল সাড়ে ৮টা থেকে বিকেল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত দিনের বেলায় সেবা দেওয়া হয়।

সরকারি ব্যবস্থার এই কেন্দ্রগুলোতে শুধু শিশুদের দেখাশোনা নয়, খাবার, প্রাথমিক স্বাস্থ্য পরিচর্যা, খেলাধুলা, বিনোদন ও বয়স অনুযায়ী প্রাথমিক শিক্ষার ব্যবস্থাও রয়েছে। মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, তাদের রাজস্ব বাজেটের আওতায় পরিচালিত কেন্দ্রগুলোতে সাধারণত ছয় মাস থেকে ছয় বছর বয়সী শিশুদের সকাল সাড়ে ৮টা থেকে বিকেল সাড়ে ৫টা পর্যন্ত সেবা দেওয়া হয়।

তবে কেন্দ্রের সংখ্যা নিয়ে সরকারি বিভিন্ন তথ্যসূত্রে কিছু পার্থক্য রয়েছে। মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের হালনাগাদ তথ্যে রাজস্ব খাতের কেন্দ্রের সংখ্যা ৪৩টি এবং এসব কেন্দ্রে মোট আসন ২ হাজার ৮৩০টি বলা হয়েছে। অন্যদিকে সংসদে দেওয়া সর্বশেষ হিসাবে মোট ৬৪টি কেন্দ্রের কথা বলা হয়েছে।

কেন্দ্রগুলোর অবস্থানও সেবার সুযোগ পাওয়ার ক্ষেত্রে বড় বিষয়। মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ঢাকাতেই ২৫টি রাজস্ব খাতের শিশু দিবাযত্ন কেন্দ্র রয়েছে। কল্যাণপুর, মোহাম্মদপুর, আজিমপুর, মগবাজার, যাত্রাবাড়ী, খিলগাঁও, সচিবালয়, রামপুরা, মিরপুর, উত্তরা, সাভার, আদাবর ও জিগাতলাসহ বিভিন্ন এলাকায় এসব কেন্দ্র পরিচালিত হচ্ছে।

সরকারি কেন্দ্রের পাশাপাশি নতুন কেন্দ্র স্থাপনের কাজও চলছে। পরিকল্পনা কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের ৬০টি ডে-কেয়ার সেন্টার স্থাপন প্রকল্পের মেয়াদ জুলাই ২০২৪ থেকে জুন ২০২৭ পর্যন্ত। প্রকল্পটির জন্য মোট ২১১ কোটি ৭১ লাখ ৮ হাজার টাকা ব্যয়ের অনুমোদন রয়েছে।

এর আগে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটেও কর্মজীবী নারীদের সহায়তায় প্রথম ধাপে ২০টি এবং পরবর্তী ধাপে আরও ৬০টি আধুনিক দিবাযত্ন কেন্দ্র স্থাপনের পরিকল্পনার কথা জানানো হয়। সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, নতুন কেন্দ্রগুলো কর্মজীবী মায়েদের ছোট শিশুদের নিরাপদ দিবাকালীন সেবা দেওয়ার পাশাপাশি তাঁদের কর্মক্ষেত্রে নিশ্চিন্তে থাকার সুযোগ তৈরিতে ভূমিকা রাখবে।

শিশু পরিচর্যার প্রয়োজন শুধু রাজধানী বা বড় শহরেই সীমাবদ্ধ নয়। কর্মজীবী নারীর সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কর্মস্থলের কাছাকাছি নিরাপদ ও সাশ্রয়ী শিশু পরিচর্যার সুযোগের প্রয়োজনও বাড়ছে। ২০২৪ সালের আইএলও-সমর্থিত এক গবেষণায় কর্মজীবী মা-বাবার ৫৪ শতাংশ সহজলভ্য, সাশ্রয়ী ও মানসম্মত শিশু পরিচর্যার অভাবকে নারীর কর্মজীবনে প্রবেশ ও টিকে থাকার বড় বাধা হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন।

শিশু পরিচর্যার মান নিয়েও কাজ চলছে। মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয় ২০২৬ সালে শিশুদের স্বাস্থ্য, পুষ্টি, মানসিক বিকাশ, ভর্তি, নিরাপত্তা এবং দিবাযত্ন কেন্দ্রের নকশা ও কারিগরি বিষয় নিয়ে একাধিক নির্দেশিকা প্রকাশ করেছে। এর আগে ২০২৪ সালে আইএলওর কারিগরি সহায়তায় বাংলাদেশে শিশু পরিচর্যা ব্যবস্থার জন্য একটি রোডম্যাপও চালু করা হয়।

তবে সরকারি কেন্দ্রের বর্তমান সংখ্যা ও আসন বিবেচনায় সেবা পাওয়ার সুযোগ এখনও সীমিত। একই সঙ্গে কেন্দ্রের অবস্থান, আসন খালি থাকা, কর্মীদের প্রশিক্ষণ এবং সেবার মান—এসব বিষয়ও একজন কর্মজীবী মা তাঁর সন্তানকে সেখানে রাখার সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলে। ২০২১ সালের বিশ্বব্যাংকের একটি সমীক্ষায় তখনকার বিভিন্ন সরকারি, বেসরকারি ও এনজিও পরিচালিত কেন্দ্রে পরিচর্যাকারীদের প্রশিক্ষণ ও সেবার মানে পার্থক্য পাওয়া গিয়েছিল; তবে সেটি ২০২১ সালের তথ্য এবং বর্তমান প্রতিটি কেন্দ্রের অবস্থা বোঝাতে সরাসরি ব্যবহার করা যায় না।

সরকার বলছে, বিদ্যমান কেন্দ্রের পাশাপাশি আরও ৬০টি নতুন কেন্দ্র স্থাপনের কাজ এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। এসব কেন্দ্র বাস্তবে চালু হলে সরকারি শিশু পরিচর্যার সুযোগ বাড়বে; তবে কর্মজীবী পরিবারের চাহিদার তুলনায় সেই পরিসর কতটা যথেষ্ট হবে, তা নির্ভর করবে নতুন কেন্দ্রগুলোর অবস্থান, আসনসংখ্যা, খরচ ও সেবার মানের ওপর।