কর্মজীবী মায়েদের জন্য নিরাপদ ও সাশ্রয়ী শিশুযত্নের ব্যবস্থা ঢাকায় এখনো বড় সংকট হয়ে আছে। ছোট সন্তানকে কোথায় রেখে কাজে যাবেন, এই দুশ্চিন্তায় অনেক নারী চাকরিতে যোগ দেওয়া পিছিয়ে দিচ্ছেন, কর্মজীবনে বিরতি নিচ্ছেন কিংবা চাকরি ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্তও নিচ্ছেন। 

২০২৪ সালের শ্রমশক্তি জরিপ অনুযায়ী, দেশে প্রায় ২ কোটি ৩৬ লাখ নারী শ্রমশক্তিতে যুক্ত। অথচ সরকারি ডে-কেয়ার ব্যবস্থার পরিসর সেই তুলনায় খুবই সীমিত। দ্য ডেইলি স্টারের সাম্প্রতিক অনুসন্ধান অনুযায়ী, দেশে ৬৪টি সরকারি ডে-কেয়ার কেন্দ্রে মোটামুটি ৪ হাজার শিশুকে সেবা দেওয়ার সক্ষমতা রয়েছে। 

সরকারি ওয়েবসাইটের তথ্যেও সীমাবদ্ধতার চিত্র স্পষ্ট। মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের হালনাগাদ তথ্যে মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের রাজস্ব খাতে ৪৩টি এবং প্রকল্পের আওতায় আরও ২০টি ডে-কেয়ার পরিচালনার কথা উল্লেখ আছে। অর্থাৎ সরকারি শিশুযত্নের অবকাঠামো এখনো দেশের কর্মজীবী পরিবারের প্রয়োজনের তুলনায় অনেক ছোট। 

এসব কেন্দ্রে সাধারণত শিশুদের দিনের বেলায় নিরাপদ পরিবেশে রাখা, পুষ্টিকর খাবার, প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা, প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা, খেলাধুলা ও বিনোদনের ব্যবস্থা থাকে। মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, অনেক কেন্দ্র সকাল সাড়ে ৮টা থেকে বিকেল সাড়ে ৫টা পর্যন্ত সেবা দেয়। 

কিন্তু সমস্যা শুরু হয় আসন পাওয়ার ক্ষেত্রে। ঢাকার সরকারি কয়েকটি কেন্দ্রে আবেদনকারীর সংখ্যা ধারণক্ষমতার চেয়ে বেশি। সচিবালয়ের একটি ডে-কেয়ারে ৫০টি আসনের বিপরীতে কখনো ৭০ থেকে ৮০টি আবেদনও জমা পড়ে বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। ফলে অনেক পরিবারকে দীর্ঘ সময় অপেক্ষায় থাকতে হয়। 

অবস্থানও বড় বাধা। রাজধানীর অন্তত ১৪টি সরকারি ডে-কেয়ার বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানের ভেতরে অবস্থিত। পরিকল্পনা কমিশন, বাংলাদেশ জাতীয় গ্রন্থাগার, রাজারবাগ পুলিশ লাইনস, সমবায় ভবন ও ভূমি ভবনের মতো জায়গায় কেন্দ্র থাকলেও সাধারণ মানুষের একটি অংশ এসব সেন্টারের অবস্থান বা সেবা সম্পর্কে জানেন না। কোথাও আবার প্রবেশের বাস্তব সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। 

সরকারি সেবা তুলনামূলকভাবে সাশ্রয়ী। কিছু রাজস্বভিত্তিক কেন্দ্রে নিম্ন আয়ের পরিবারের জন্য মাসিক ফি ১০০ টাকা এবং মধ্যম আয়ের পরিবারের জন্য ৫০০ টাকা। প্রকল্পভিত্তিক কেন্দ্রগুলোতে শিশুর বয়স ও পরিবারের আয়ের ভিত্তিতে ফি ভিন্ন হতে পারে।

কিন্তু সরকারি কেন্দ্রে জায়গা না পেলে পরিবারকে বেসরকারি ডে-কেয়ারের দিকে যেতে হয়। ঢাকার কিছু বেসরকারি কেন্দ্রে পূর্ণদিবসের জন্য মাসে ৬ হাজার থেকে ৯ হাজার টাকারও বেশি খরচ হচ্ছে। নিম্ন ও মধ্যম আয়ের পরিবারের জন্য এই ব্যয় নিয়মিত বহন করা কঠিন হয়ে পড়ে। 

শুধু খরচ নয়, নিরাপত্তা ও সেবার মান নিয়েও অভিভাবকদের উদ্বেগ থাকে। ফলে বাড়ির কাছাকাছি, সাশ্রয়ী এবং মানসম্মত ডে-কেয়ার না থাকলে অনেক মায়ের সামনে সন্তান সামলানো ও চাকরি চালিয়ে যাওয়ার মধ্যে কঠিন সিদ্ধান্ত তৈরি হয়।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যৌথ পরিবারের সংখ্যা কমে একক পরিবার বাড়ায় এই সংকট আরও প্রকট হয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নারী ও জেন্ডার স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক তানিয়া হক বলেছেন, কর্মজীবী নারীর জন্য শিশুকে কে দেখবে—এই প্রশ্ন এখন কর্মসংস্থানের গুরুত্বপূর্ণ বাস্তব বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। 

সরকারও বর্তমান অবস্থা যথেষ্ট নয় বলে স্বীকার করেছে। সেপ্টেম্বরে সংসদে নারী ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রী এ জেড এম জাহিদ হোসেন জানান, ঢাকাসহ সাভার, টঙ্গী, গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জে অন্তত ১৫০টি নতুন ডে-কেয়ার কেন্দ্র স্থাপনের লক্ষ্য রয়েছে। বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠান ও করপোরেট অফিসের জায়গা ব্যবহার করে এসব কেন্দ্র চালুর পরিকল্পনা করা হচ্ছে। 

এদিকে মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের মহাপরিচালক শায়লা শারমিন জামান জানিয়েছেন, আরও ৬০টি ডে-কেয়ার কেন্দ্র স্থাপনের প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ রয়েছে। চলমান প্রকল্পের লক্ষ্য কর্মজীবী মায়েদের ছোট সন্তানদের নিরাপদ দিবাকালীন সেবা দিয়ে নারীদের আয়বর্ধক কাজে যুক্ত থাকা সহজ করা। 

চলতি অর্থবছরের পরিকল্পনাতেও শিশুযত্নের সুযোগ বাড়ানোর কথা রয়েছে। বাজেটসংক্রান্ত সরকারি পরিকল্পনায় প্রথম ধাপে ২০টি আধুনিক ডে-কেয়ার এবং পরবর্তী ধাপে আরও ৬০টি কেন্দ্র স্থাপনের উদ্যোগের কথা উঠে এসেছে। 

তবে নতুন কেন্দ্রগুলো বাস্তবে চালু হওয়া এবং সহজলভ্য হওয়া পর্যন্ত কর্মজীবী পরিবারের চাপ থেকেই যাচ্ছে। ঢাকার মতো ঘনবসতিপূর্ণ শহরে ডে-কেয়ার এখন শুধু শিশুযত্নের বিষয় নয়; এটি নারীর চাকরি ধরে রাখা, আয়, কর্মক্ষেত্রে অংশগ্রহণ এবং পরিবারের অর্থনৈতিক নিরাপত্তার সঙ্গেও সরাসরি যুক্ত।