বাংলাদেশের ক্ষুদ্র কৃষকদের উৎপাদিত পণ্যের বাজারজাতকরণ, আর্থিক সেবায় প্রবেশাধিকার এবং ফসল ব্যবস্থাপনা সহজ করতে প্রযুক্তিনির্ভর সমাধান নিয়ে কাজ করছে দেশীয় দুই স্টার্টআপ Agronochain ও Krishi Shwapno। আন্তর্জাতিক কৃষি উন্নয়ন তহবিল (আইএফএডি), ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং উন্নয়ন সহযোগীদের সহায়তায় মাঠপর্যায়ে এসব উদ্যোগের কার্যকারিতা পরীক্ষা করা হয়েছে। সম্প্রতি ঢাকায় আয়োজিত Innovatech Bangladesh Demo Day-তে স্টার্টআপ দুটি তাদের কাজের অভিজ্ঞতা, অর্জন ও ভবিষ্যৎ সম্প্রসারণ পরিকল্পনা তুলে ধরে।

অনুষ্ঠানটি Innovatech কর্মসূচির এশিয়ায় প্রথম পর্যায়ের সমাপ্তি উপলক্ষে আয়োজন করা হয়। এতে সরকারি প্রতিষ্ঠান, কৃষি খাতের ব্যবসায়ী, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, উন্নয়ন সহযোগী ও প্রযুক্তি উদ্যোক্তারা অংশ নেন। আলোচনায় পরীক্ষামূলক প্রকল্পে পাওয়া অভিজ্ঞতাকে কীভাবে দীর্ঘমেয়াদি ও কার্যকর সেবায় রূপ দেওয়া যায়, সে বিষয়টি গুরুত্ব পায়।

কৃষকের সঙ্গে বাজারের সংযোগ বাড়াতে Agronochain

Agronochain কৃষক, কৃষিপণ্য সংগ্রহকারী, ক্রেতা ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে প্রযুক্তির মাধ্যমে যুক্ত করার উদ্যোগ নিয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির লক্ষ্য হলো কৃষিপণ্যের সরবরাহব্যবস্থায় সমন্বয় বাড়ানো, লেনদেনের তথ্য আরও স্বচ্ছ করা এবং কৃষকের উৎপাদিত পণ্য বাজারে পৌঁছানোর প্রক্রিয়া সহজ করা।

কৃষকেরা অনেক সময় উৎপাদনের পর উপযুক্ত ক্রেতা খুঁজে পেতে সমস্যায় পড়েন। পণ্যের মান যাচাই, সংরক্ষণ, পরিবহন এবং ন্যায্য দাম পাওয়ার ক্ষেত্রেও নানা বাধা রয়েছে। কৃষক ও ক্রেতার মধ্যে সরাসরি যোগাযোগ এবং সরবরাহব্যবস্থার তথ্য সংরক্ষণের মাধ্যমে এসব সমস্যা কমানোর সম্ভাবনা তৈরি করতে চায় প্রতিষ্ঠানটি।

প্রতিষ্ঠানটির উদ্যোগে ব্লকচেইনভিত্তিক লেনদেনের নথি ব্যবস্থাপনার কথাও তুলে ধরা হয়েছে। এর মাধ্যমে কৃষিপণ্য কোথা থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে, কীভাবে সরবরাহ হয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট লেনদেনের তথ্য কীভাবে সংরক্ষিত হচ্ছে, তা অনুসরণ করা সহজ হতে পারে।

Agronochain-এর ব্যবস্থাপনা ও উন্নয়ন পরিকল্পনায় কৃষিপণ্য সংগ্রহ, সংরক্ষণ এবং কৃষকের জন্য আর্থিক সেবার সুযোগ তৈরির বিষয়ও রয়েছে। তবে এসব সেবা কতটা কার্যকরভাবে বৃহত্তর কৃষকগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছাবে, তা নির্ভর করবে বাস্তব প্রয়োগ, বাজারের চাহিদা এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের ওপর।

কৃষিপণ্যের অপচয় কমাতে Krishi Shwapno

Krishi Shwapno কাজ করছে কৃষক থেকে ব্যবসায়ী ও ভোক্তা পর্যন্ত কৃষিপণ্যের সরবরাহব্যবস্থা উন্নত করার লক্ষ্যে। প্রতিষ্ঠানটি মাঠপর্যায়ে কৃষিপণ্য সংগ্রহ, পণ্যের পরিচিতি ও মানের তথ্য সংরক্ষণ এবং ক্রেতার কাছে সময়মতো সরবরাহ নিশ্চিত করার প্রক্রিয়া নিয়ে কাজ করেছে।

প্রতিষ্ঠানটির উদ্যোগে কৃষিপণ্য সংগ্রহের বিভিন্ন ধাপে তথ্য নথিভুক্ত করা হয়, যাতে পণ্যের উৎস ও সরবরাহের পথ অনুসরণ করা যায়। কৃষকের কাছাকাছি সংগ্রহকেন্দ্রভিত্তিক কার্যক্রমের মাধ্যমে পণ্য একত্র করা এবং ব্যবসায়িক ক্রেতার কাছে পৌঁছানোর ব্যবস্থাও রয়েছে। কৃষিপণ্যের সরবরাহব্যবস্থায় মধ্যবর্তী ধাপের সমন্বয় দুর্বল হলে পণ্য নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে এবং কৃষক প্রত্যাশিত দাম থেকে বঞ্চিত হতে পারেন। উৎপাদক ও ক্রেতার মধ্যে যোগাযোগ উন্নত করা এবং সরবরাহের তথ্য সংরক্ষণ করা গেলে এসব সমস্যা চিহ্নিত করা সহজ হতে পারে।

অর্থায়ন ও বাজারের সুযোগই বড় চ্যালেঞ্জ

Innovatech Bangladesh Demo Day-তে অংশগ্রহণকারীরা বলেন, শুধু প্রযুক্তি তৈরি করলেই গ্রামীণ এলাকায় তার বিস্তার নিশ্চিত হয় না। কৃষকের প্রকৃত চাহিদা অনুযায়ী সেবা তৈরি, কার্যকর ব্যবসায়িক মডেল, বাজারে প্রবেশের সুযোগ এবং প্রকল্পের সহায়তা শেষ হওয়ার পরও অর্থায়ন ও পরিচালনা অব্যাহত রাখার ব্যবস্থা প্রয়োজন।

আইএফএডির বাংলাদেশ কান্ট্রি ডিরেক্টর ভ্যালেন্টাইন আচানচো বলেন, গ্রামীণ বাংলাদেশের বড় পরিসরে রূপান্তরের জন্য সরকার, উদ্ভাবক ও বেসরকারি খাতের মধ্যে শক্তিশালী অংশীদারত্ব প্রয়োজন। তাঁর মতে, মাঠপর্যায়ে প্রযুক্তিগত সমাধান পরীক্ষা এবং বিনিয়োগের ঝুঁকি কমানোর মাধ্যমে সম্ভাবনাময় উদ্যোগগুলোকে কৃষক ও গ্রামীণ উদ্যোক্তাদের দীর্ঘমেয়াদি সুবিধা দিতে সক্ষম করা যায়।

Innovatech কর্মসূচির দ্বিতীয় পর্যায় ২০২৪ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশসহ ছয়টি দেশে পরিচালিত হয়েছে। আইএফএডি ও জার্মান স্পার্কাসেনস্টিফটং ফর ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশনের তথ্য অনুযায়ী, এ সময়ে ১৫টি প্রযুক্তি স্টার্টআপের তৈরি ডিজিটাল সমাধানের আওতায় ৩২ হাজারের বেশি গ্রামীণ পরিবার এসেছে। কর্মসূচিটি ৮১১টি গ্রামীণ সংগঠনের সঙ্গে এসব উদ্যোগের সংযোগ তৈরি করেছে। এই পরিসংখ্যান ছয়টি দেশের সম্মিলিত হিসাব, শুধু বাংলাদেশের নয়।

পরীক্ষামূলক উদ্যোগ থেকে বৃহত্তর পরিসরে যাওয়ার লক্ষ্য

ঢাকার অনুষ্ঠানে কৃষি খাতের প্রতিনিধিরা প্রযুক্তিভিত্তিক উদ্যোগের কার্যকারিতা ধরে রাখতে সরকারি প্রতিষ্ঠান, আর্থিক সেবাদাতা, কৃষিপণ্য ক্রেতা ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সমন্বয়ের ওপর গুরুত্ব দেন। পরীক্ষামূলক প্রকল্পে পাওয়া অভিজ্ঞতাকে নিয়মিত সেবায় রূপ দিতে হলে কৃষকের অংশগ্রহণ এবং স্থানীয় বাজারের বাস্তবতা বিবেচনায় নেওয়ার প্রয়োজনীয়তাও আলোচনায় উঠে আসে। Agronochain ও Krishi Shwapno-এর উদ্যোগ কৃষিপণ্যের বাজারসংযোগ, সরবরাহব্যবস্থার তথ্য সংরক্ষণ এবং কৃষকের জন্য আর্থিক সেবার সুযোগ তৈরিতে ভূমিকা রাখতে পারে। তবে কতসংখ্যক কৃষক নিয়মিত এসব সেবা ব্যবহার করবেন এবং প্রকল্পের সহায়তা শেষ হওয়ার পর উদ্যোগগুলো কতটা টেকসই থাকবে, তা নির্ভর করবে মাঠপর্যায়ের ফলাফল, অর্থায়ন ও বাজারের সঙ্গে কার্যকর সংযোগের ওপর।

বাংলাদেশের কৃষিতে ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর ক্ষেত্রে তাই শুধু নতুন সেবা তৈরি নয়, কৃষকের দৈনন্দিন কাজে সেগুলোর বাস্তব উপযোগিতা নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ। পরীক্ষামূলক পর্যায়ের অভিজ্ঞতাকে দীর্ঘমেয়াদি সাফল্যে রূপ দেওয়াই এখন এই দুই স্টার্টআপ ও তাদের সহযোগীদের সামনে বড় লক্ষ্য।