দেশের ছোট ব্যবসা ও তুলনামূলক কম টার্নওভার করা কোম্পানির করের চাপ কমাতে ন্যূনতম টার্নওভার কর কাঠামোয় বড় পরিবর্তন এনেছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড, এনবিআর। নতুন ব্যবস্থায় কোনো ব্যবসা বা কোম্পানির বার্ষিক টার্নওভার ২ কোটি টাকা পর্যন্ত হলে ন্যূনতম টার্নওভার কর দিতে হবে না।
এনবিআর ৩১ আগস্ট এ সংক্রান্ত আদেশ জারি করে। এর ফলে চলতি অর্থবছরের বাজেটে অধিকাংশ ব্যবসা ও কোম্পানির জন্য যে ১ শতাংশ ন্যূনতম টার্নওভার করের বিধান রাখা হয়েছিল, ছোট ও কম টার্নওভার করা প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে সেই চাপ অনেকটাই কমল।
নতুন কাঠামো অনুযায়ী, বার্ষিক টার্নওভার ২ কোটি টাকা পর্যন্ত হলে ন্যূনতম টার্নওভার করের হার শূন্য। ২ কোটি টাকার বেশি কিন্তু ৪ কোটি টাকা পর্যন্ত টার্নওভার হলে দিতে হবে শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ। আর বার্ষিক টার্নওভার ৪ কোটি টাকার বেশি হলে আগের মতোই ১ শতাংশ হারে ন্যূনতম টার্নওভার কর প্রযোজ্য থাকবে।
এখানে টার্নওভার বলতে ব্যবসার মোট বিক্রি বা মোট প্রাপ্তিকে বোঝানো হচ্ছে। এটি ব্যবসার নিট মুনাফা নয়। ফলে কোনো প্রতিষ্ঠানের বিক্রি বেশি হলেও মুনাফা খুব কম হতে পারে, এমনকি লোকসানও হতে পারে।
ন্যূনতম টার্নওভার কর নিয়ে ব্যবসায়ীদের আপত্তির মূল জায়গাটিও ছিল এখানে। এই কর ব্যবসার মুনাফার ওপর নয়, মোট টার্নওভারের ওপর হিসাব করা হয়। ফলে কোনো ব্যবসা লোকসানে থাকলেও নির্ধারিত হারে কর দেওয়ার দায় তৈরি হতে পারে। দ্য ডেইলি স্টার জানিয়েছে, এই ব্যবস্থায় কম মুনাফায় পরিচালিত প্রতিষ্ঠানগুলো বিশেষভাবে চাপের মুখে পড়ছিল।
যেমন, আগের ১ শতাংশ হারে ১ কোটি টাকা বার্ষিক টার্নওভার হলে ন্যূনতম টার্নওভার কর দাঁড়াত ১ লাখ টাকা। ব্যবসার প্রকৃত মুনাফা খুব কম হলেও টার্নওভারের ভিত্তিতে এই করের দায় তৈরি হতে পারত। ব্যবসায়ী সংগঠনগুলো এ কারণেই দীর্ঘদিন ধরে ব্যবস্থাটি পুনর্বিবেচনার দাবি জানিয়ে আসছিল।
নতুন সিদ্ধান্তে ১ কোটি টাকা টার্নওভার করা কোনো ব্যবসা ন্যূনতম টার্নওভার করের আওতায় পড়বে না। একইভাবে ২ কোটি টাকা পর্যন্ত টার্নওভারেও এই ন্যূনতম কর দিতে হবে না। তবে এর অর্থ এই নয় যে প্রতিষ্ঠানের সব ধরনের আয়কর দায় বাতিল হয়ে যাচ্ছে। স্বাভাবিক নিয়মে প্রকৃত করযোগ্য আয় থেকে অন্য কোনো আয়কর দায় তৈরি হলে সংশ্লিষ্ট বিধান অনুযায়ী তা প্রযোজ্য হতে পারে।
অন্যদিকে কোনো প্রতিষ্ঠানের বার্ষিক টার্নওভার ৩ কোটি টাকা হলে নতুন ন্যূনতম টার্নওভার করহার হবে শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ। সেই হিসাবে টার্নওভারের ওপর করের পরিমাণ দাঁড়াবে ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা। ৪ কোটি টাকার সীমা অতিক্রম করলে ১ শতাংশ হারের বিধান বহাল থাকবে।
চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের আগে এনবিআর আরও একটি স্লাব নিয়ে আলোচনা করেছিল। আগস্টের শেষ সপ্তাহে প্রকাশিত প্রস্তাবে ২ কোটি টাকার বেশি থেকে ৩ কোটি টাকা পর্যন্ত টার্নওভারে শূন্য দশমিক ২৫ শতাংশ এবং ৩ কোটি টাকার বেশি থেকে ৪ কোটি পর্যন্ত শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ করার কথা ছিল। তবে পরে জারি হওয়া চূড়ান্ত কাঠামোয় ২ কোটি টাকার বেশি থেকে ৪ কোটি টাকা পর্যন্ত পুরো সীমার জন্য শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ হার নির্ধারণ করা হয়।
ব্যবসায়ী সংগঠনগুলো ন্যূনতম টার্নওভার কর কমানোর দাবি জানিয়ে আসছিল। ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বার্স অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি, এফবিসিসিআই ২৪ আগস্ট অর্থমন্ত্রীকে দেওয়া এক চিঠিতে ১ শতাংশ ন্যূনতম টার্নওভার কর ব্যবস্থা থেকে ধীরে ধীরে সরে আসার আহ্বান জানায়।
এফবিসিসিআই প্রশাসক মো. ফজলুল হক নতুন কাঠামোয় ছোট ব্যবসা ও কম টার্নওভারের প্রতিষ্ঠানের চাপ কমবে বলে মত দিয়েছেন। তবে তাঁর বক্তব্য, দীর্ঘ মেয়াদে ব্যবসার মোট বিক্রির বদলে প্রকৃত আয় বা মুনাফাকে কর নির্ধারণের ভিত্তি করা উচিত।
ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি তাসকিন আহমেদও ন্যূনতম টার্নওভার কর ব্যবস্থা থেকে সরে আসার পক্ষে অবস্থান জানিয়েছেন। কর বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, নতুন ছাড় ছোট ব্যবসার জন্য স্বস্তি আনলেও কম মুনাফা বা লোকসানে থাকা বড় প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে টার্নওভারভিত্তিক করের চাপ থেকে যাচ্ছে।
এর আগে ২০২৪ থেকে ২৫ অর্থবছর পর্যন্ত কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া অধিকাংশ কোম্পানির ক্ষেত্রে ন্যূনতম টার্নওভার করহার ছিল শূন্য দশমিক ৬ শতাংশ। কোম্পানি নয় এমন কিছু ব্যবসার ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট সীমার ওপরে হার ছিল শূন্য দশমিক ২৫ শতাংশ। পরে কর কাঠামোর পরিবর্তনে সাধারণ হার ১ শতাংশে নেওয়া হয়, যা ব্যবসায়ী মহলে উদ্বেগ তৈরি করে।
এনবিআরের সর্বশেষ সিদ্ধান্তে সবচেয়ে বেশি সুবিধা পাবেন তুলনামূলক ছোট পরিসরে পরিচালিত ব্যবসা ও কোম্পানিগুলো। বিশেষ করে যেসব প্রতিষ্ঠানের বিক্রি থাকলেও মুনাফার হার কম, তাদের নগদ অর্থের ওপর তাৎক্ষণিক করের চাপ কমার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
তবে ২ কোটি টাকা পর্যন্ত ন্যূনতম টার্নওভার করের অব্যাহতি মানেই ব্যবসা পুরোপুরি করমুক্ত, এমনটি নয়। এটি নির্দিষ্টভাবে ন্যূনতম টার্নওভার করের ছাড়। ব্যবসার প্রকৃত করযোগ্য আয়, উৎসে কর বা আয়কর আইনের অন্য কোনো প্রযোজ্য দায় থাকলে সেগুলো আলাদাভাবে হিসাব হবে। এই পার্থক্যটি ব্যবসায়ীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ, কারণ টার্নওভার কর এবং সাধারণ আয়কর একই বিষয় নয়।
