যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তি নতুন রপ্তানি ও বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি করতে পারে। তবে চুক্তির শর্ত, বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া এবং সম্ভাব্য সুবিধা নিয়ে আরও স্পষ্ট ব্যাখ্যা চান দেশের রপ্তানিকারকেরা। তাঁদের আশঙ্কা, চুক্তির সুযোগ কাজে লাগাতে গিয়ে উচ্চতর কমপ্লায়েন্স মান, সরবরাহব্যবস্থার তথ্য অনুসরণযোগ্য রাখা এবং শ্রম ও পরিবেশগত শর্ত পূরণে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর পরিচালন ব্যয় বেড়ে যেতে পারে। একই সঙ্গে চুক্তির সুবিধা কীভাবে পাওয়া যাবে, সে বিষয়ে সরকারি পর্যায়ে পর্যাপ্ত দিকনির্দেশনা না থাকায় ব্যবসায়ীদের মধ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

৭ নভেম্বর ঢাকার হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে ৩০তম ইউএস ট্রেড শোর শেষ দিনে ‘বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্যে নতুন সুযোগ ও চ্যালেঞ্জ’ শীর্ষক এক সেমিনারে এসব উদ্বেগ তুলে ধরেন ব্যবসায়ী নেতা ও অর্থনীতিবিদেরা। আমেরিকান চেম্বার অব কমার্স ইন বাংলাদেশ (অ্যামচেম) ও ঢাকায় যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাস যৌথভাবে তিন দিনব্যাপী এই আয়োজন করে।

সেমিনারে অ্যাপেক্স ফুটওয়্যারের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং ফুটওয়্যার, লেদার গুডস অ্যান্ড অ্যাকসেসরিজ এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি সৈয়দ নাসিম মঞ্জুর বলেন, চুক্তির সুযোগ ও ঝুঁকি সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা না থাকলে রপ্তানিকারকেরা এর সুফল নিতে পারবেন না। চুক্তির বিভিন্ন ধারা, সম্ভাব্য সুবিধা এবং বাংলাদেশের ওপর এর প্রভাব নিয়ে সরকার ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের মধ্যে খোলামেলা আলোচনা প্রয়োজন।

তিনি সতর্ক করেন, চুক্তিটি বাংলাদেশের অন্য বাণিজ্যিক অংশীদারদের কাছেও দৃষ্টান্ত হয়ে উঠতে পারে। ভবিষ্যতে তারাও একই ধরনের বাজারসুবিধা চাইতে পারে। তাই চুক্তির শর্ত সম্পর্কে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জরুরি। তাঁর মতে, উচ্চতর কমপ্লায়েন্স মান এবং সরবরাহব্যবস্থার প্রতিটি ধাপের তথ্য অনুসরণযোগ্য রাখার শর্ত পূরণ করতে গিয়ে প্রতিষ্ঠানগুলোর পরিচালন ব্যয় বাড়তে পারে।

শাশা ডেনিমসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) সাবেক সভাপতি শামস মাহমুদ বলেন, চুক্তি স্বাক্ষরের পর প্রায় নয় মাস পেরিয়ে গেলেও কীভাবে এর সুবিধা পাওয়া যাবে, সে বিষয়ে রপ্তানিকারকেরা পর্যাপ্ত দিকনির্দেশনা পাননি। চুক্তি বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া নিয়ে সংশ্লিষ্ট সরকারি মন্ত্রণালয়গুলোর সঙ্গে ব্যবসায়ী ও রপ্তানিকারক সংগঠনগুলোর আলোচনা আরও বাড়ানো প্রয়োজন।

তবে তাঁর মতে, চুক্তিটি যুক্তরাষ্ট্রের ক্রেতাদের মধ্যে বাংলাদেশের পণ্য নিয়ে নতুন আগ্রহ তৈরি করতে পারে। আগে যারা বাংলাদেশ থেকে পণ্য সংগ্রহ করত না, এমন কিছু প্রতিষ্ঠানও এখন এ দেশে ব্যবসার সুযোগ খুঁজছে। এই আগ্রহকে বাস্তব রপ্তানি আদেশে রূপ দিতে হলে পণ্যের মান, সরবরাহব্যবস্থা এবং শুল্কসুবিধা সম্পর্কে রপ্তানিকারকদের পরিষ্কার ধারণা দিতে হবে।

বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে Agreement on Reciprocal Trade বা পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষরিত হয় ৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬। চুক্তি অনুযায়ী, বাংলাদেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি হওয়া পণ্যের ওপর পারস্পরিক শুল্কহার ১৯ শতাংশ নির্ধারণের কথা বলা হয়েছে। তবে নির্দিষ্ট কিছু পণ্যের ক্ষেত্রে শূন্য শতাংশ পারস্পরিক শুল্কের সুযোগ রাখার কথাও রয়েছে।

বিশেষ করে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক ও বস্ত্রপণ্যের ক্ষেত্রে একটি পৃথক ব্যবস্থা তৈরির প্রতিশ্রুতি দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। এ ব্যবস্থায় যুক্তরাষ্ট্রে উৎপাদিত তুলা ও কৃত্রিম তন্তুর মতো উপকরণ বাংলাদেশে আমদানি করে তৈরি করা নির্দিষ্ট পরিমাণ পোশাক ও বস্ত্রপণ্য শূন্য পারস্পরিক শুল্কে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে প্রবেশের সুযোগ পেতে পারে। তবে এই সুবিধার আওতায় কত পরিমাণ পণ্য রপ্তানি করা যাবে, তা যুক্তরাষ্ট্র থেকে বাংলাদেশে আমদানি করা সংশ্লিষ্ট উপকরণের পরিমাণের সঙ্গে সম্পর্কিত হবে।

অর্থাৎ, বাংলাদেশের সব পোশাক রপ্তানির ক্ষেত্রে স্বয়ংক্রিয়ভাবে শুল্কমুক্ত সুবিধা কার্যকর হবে না। মার্কিন উপকরণ ব্যবহারের পরিমাণ, পণ্যের উৎপত্তি এবং নির্ধারিত সীমার মতো বিষয় বিবেচনায় নিতে হবে। এই সুবিধা কীভাবে হিসাব করা হবে, কীভাবে উপকরণের উৎস যাচাই হবে এবং কোন প্রক্রিয়ায় রপ্তানিকারকেরা শুল্কছাড় পাবেন, তা নিয়ে আরও বিস্তারিত নির্দেশনা প্রয়োজন বলে মনে করছেন ব্যবসায়ীরা।

বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতি (বিজিএমইএ) চুক্তি স্বাক্ষরের পর জানিয়েছিল, যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি করা তুলা ও কৃত্রিম তন্তু ব্যবহার করে তৈরি পোশাক শূন্য পারস্পরিক শুল্কের সুবিধা পেতে পারে। তবে এ সুযোগ কাজে লাগাতে উপকরণের সঠিক মূল্য নির্ধারণ এবং উৎপাদনে মার্কিন উপকরণের ব্যবহার শনাক্ত করার ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।

কটন ইউএসএর কান্ট্রি রিপ্রেজেন্টেটিভ আলী আরসালান সেমিনারে ‘গ্রেট আমেরিকান কটন প্ল্যান’ প্রসঙ্গ তুলে ধরেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের কৃষিমন্ত্রী ব্রুক রোলিন্স সম্প্রতি এ উদ্যোগের আওতায় বাংলাদেশের পোশাক খাতের সম্ভাবনার কথা উল্লেখ করেছেন। মার্কিন তুলা ব্যবহার করে তৈরি পোশাক রপ্তানিতে শুল্কছাড়ের সুযোগ তৈরির বিষয়টি আলোচনায় এসেছে। তবে এই সুবিধা কীভাবে কার্যকর হবে, তার প্রক্রিয়া এখনো পরিষ্কার নয়।

বাংলাদেশের স্পিনিং ও পোশাকশিল্পের জন্য বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, মার্কিন তুলার গুণগত মান ভালো হলেও এর দাম তুলনামূলক বেশি হতে পারে। ফলে শুধু শুল্কছাড়ের সুযোগ থাকলেই রপ্তানিকারকেরা লাভবান হবেন না। তুলা আমদানি, সুতা উৎপাদন, কাপড় তৈরি এবং পোশাক প্রস্তুতের মোট ব্যয় হিসাব করে দেখতে হবে, শেষ পর্যন্ত পণ্যটি আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতামূলক দামে সরবরাহ করা সম্ভব কি না।

চুক্তিতে শুধু শুল্কসংক্রান্ত বিষয় নয়, শ্রম অধিকার, পরিবেশ সুরক্ষা, মেধাস্বত্ব, দুর্নীতি প্রতিরোধ এবং সরবরাহব্যবস্থার স্বচ্ছতা নিয়েও বাংলাদেশের বিভিন্ন অঙ্গীকার রয়েছে। চুক্তির শর্ত অনুযায়ী, জোরপূর্বক শ্রমে উৎপাদিত পণ্য আমদানি নিষিদ্ধ করার ব্যবস্থা, শ্রমিকদের সংগঠন ও যৌথ দর-কষাকষির অধিকার সুরক্ষা এবং শ্রম আইন কার্যকরের সক্ষমতা বাড়ানোর বিষয়গুলো গুরুত্ব পেয়েছে।

এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যে শুল্ক ও কাস্টমস প্রক্রিয়া সহজ করা, ডিজিটাল বাণিজ্য এবং তথ্য স্থানান্তরের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট নীতি অনুসরণ, পরিবেশগত মান বজায় রাখা এবং মেধাস্বত্বের সুরক্ষা জোরদার করার অঙ্গীকারও রয়েছে। এসব শর্ত বাস্তবায়নে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর পাশাপাশি রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানকেও নিজেদের কার্যক্রমে পরিবর্তন আনতে হতে পারে।

সৈয়দ নাসিম মঞ্জুরের মতে, সরবরাহব্যবস্থার প্রতিটি ধাপে উপকরণের উৎস ও ব্যবহার শনাক্ত করার ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। বিশেষ করে কোন তুলা বা কৃত্রিম তন্তু কোথা থেকে এসেছে, তা দিয়ে কতটুকু পণ্য তৈরি হয়েছে এবং সেই পণ্য কোন বাজারে রপ্তানি হচ্ছে, এসব তথ্য সংরক্ষণ ও যাচাইয়ের সক্ষমতা প্রয়োজন হবে। বড় প্রতিষ্ঠানের পক্ষে এ ধরনের ব্যবস্থা গড়ে তোলা তুলনামূলক সহজ হলেও ছোট ও মাঝারি রপ্তানিকারকদের জন্য তা বাড়তি ব্যয়ের কারণ হতে পারে।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি বাস্তবায়ন এবং স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে বাংলাদেশের উত্তরণকে পরস্পরের পরিপূরক হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন। এলডিসি থেকে উত্তরণের পর আন্তর্জাতিক বাজারে বিদ্যমান কিছু বাণিজ্যসুবিধা পরিবর্তিত হতে পারে। ফলে নতুন চুক্তির সুযোগ কাজে লাগাতে উৎপাদনশীলতা, শ্রমমান এবং কমপ্লায়েন্স সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি।

তাঁর মতে, শুধু চুক্তি স্বাক্ষর করলেই অর্থনৈতিক সুফল নিশ্চিত হবে না। এর বাস্তবায়নের মাধ্যমে রপ্তানি আদেশ বাড়াতে হবে, বিনিয়োগ আকর্ষণ করতে হবে এবং নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করতে হবে। এজন্য ব্যবসায়ীদের সঙ্গে নীতিনির্ধারকদের নিয়মিত আলোচনা এবং প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি গুরুত্বপূর্ণ।

সেমিনারে অ্যামচেমের ভাইস প্রেসিডেন্ট আলা উদ্দিন আহমদ বলেন, চুক্তির আওতায় কোন পণ্য ও উপকরণ সুবিধা পেতে পারে, তা ব্যবসায়ীদের খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। তাঁর মতে, চুক্তিটি ইতোমধ্যে ব্যবসায়িক সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলছে। তবে এর ফল নির্ভর করবে বাস্তবায়ন পদ্ধতি এবং ব্যবসায়ীরা কতটা প্রস্তুতি নিতে পারছেন, তার ওপর।

সব মিলিয়ে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি বাংলাদেশের রপ্তানি খাতে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করলেও এর সুফল পেতে শর্তগুলো পরিষ্কারভাবে জানা জরুরি। বিশেষ করে শুল্কছাড়ের আওতা, মার্কিন উপকরণ ব্যবহারের হিসাব, পণ্যের উৎপত্তি যাচাই এবং কমপ্লায়েন্স ব্যয় সম্পর্কে স্পষ্ট নির্দেশনা চান রপ্তানিকারকেরা। সরকারের সঙ্গে ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর কার্যকর আলোচনা ও প্রস্তুতি নিশ্চিত করা না গেলে চুক্তির সম্ভাব্য সুবিধা কাজে লাগানো কঠিন হতে পারে।