বুলগেরিয়ার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের দ্বিতীয় দফায় জয়ী হওয়ার পথে দেশটির ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট ইলিয়ানা ইয়োতোভা। প্রাথমিক ভোট গণনায় তিনি প্রায় ৫৮ শতাংশ ভোট পেয়েছেন। তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী সাবেক অন্তর্বর্তী প্রধানমন্ত্রী আন্দ্রেই গিউরভ পেয়েছেন প্রায় ৩৯ শতাংশ। গিউরভ ইতিমধ্যে পরাজয় স্বীকার করেছেন। চূড়ান্ত ফল একই থাকলে বুলগেরিয়ার ইতিহাসে প্রথম নির্বাচিত নারী প্রেসিডেন্ট হবেন ৬১ বছর বয়সী ইয়োতোভা।
রোববার (১ নভেম্বর) দেশটিতে দ্বিতীয় দফার ভোট অনুষ্ঠিত হয়। একাধিক বুথফেরত জরিপে ইয়োতোভার বড় ব্যবধানে এগিয়ে থাকার আভাস পাওয়া যায়। ভোট গণনার প্রাথমিক তথ্যেও সেই চিত্র দেখা গেছে। সোমবার বুলগেরিয়ার কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিশনের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ৫২ দশমিক ৪২ শতাংশ ভোটকেন্দ্রের গণনাপত্র প্রক্রিয়াকরণের পর ইয়োতোভা ও তাঁর রানিং মেট ইলিয়ান ভালচেভের পক্ষে ভোট পড়েছে ৫৭ দশমিক ৯৫ শতাংশ। অন্যদিকে আন্দ্রেই গিউরভ ও জর্জি কানদেভের পক্ষে পড়েছে ৩৯ দশমিক ১ শতাংশ ভোট। তবে তখনো পূর্ণাঙ্গ সরকারি ফল প্রকাশিত হয়নি।
পরাজয় স্বীকার করে গিউরভ বলেন, ভোটাররা যে রায় দিয়েছেন, তা মেনে নিতে হবে। তাঁর ভাষায়, বুলগেরিয়ার নাগরিকেরা এভাবেই তাঁদের সিদ্ধান্ত জানিয়েছেন।
প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রথম দফা অনুষ্ঠিত হয়েছিল ২৫ অক্টোবর। সেদিন ২৭ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। প্রথম দফায় ইয়োতোভা প্রায় ৩৫ শতাংশ ভোট পেয়ে এগিয়ে ছিলেন। গিউরভ পেয়েছিলেন প্রায় ৩২ শতাংশ। কোনো প্রার্থী প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পাওয়ায় দ্বিতীয় দফার ভোট অনুষ্ঠিত হয়।
দ্বিতীয় দফায় ভোটার উপস্থিতি ছিল আনুমানিক ২৭ থেকে ২৯ শতাংশ। প্রথম দফায় ভোট পড়েছিল মাত্র ২৩ শতাংশ, যা দেশটির নির্বাচনী ইতিহাসে রেকর্ড সর্বনিম্ন উপস্থিতির মধ্যে ছিল। দ্বিতীয় দফায় উপস্থিতি কিছুটা বাড়লেও তা তুলনামূলকভাবে কম ছিল।
ইয়োতোভা রাশিয়ার সঙ্গে সংলাপের পক্ষে এবং ইউক্রেনকে সামরিক সহায়তা দেওয়ার বিরোধী অবস্থানের জন্য পরিচিত। তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী গিউরভ পশ্চিমাপন্থী ও সংস্কারপন্থী রাজনৈতিক দলগুলোর সমর্থন পেয়েছিলেন। তিনি ইউক্রেনের প্রতি সমর্থন এবং রাশিয়ার আগ্রাসন বন্ধের পর আলোচনার মাধ্যমে যুদ্ধের সমাধানের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন।
নির্বাচনী প্রচারে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ এবং কৃষ্ণসাগরে নিরাপত্তা পরিস্থিতি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে ওঠে। গত মাসে বুলগেরিয়ার কৃষ্ণসাগর উপকূলের কাছে বাণিজ্যিক জাহাজে একাধিক ড্রোন হামলার ঘটনা ঘটে। এসব ঘটনায় নাবিকদের প্রাণহানি ও নিখোঁজ হওয়ার খবর পাওয়া যায়। হামলাগুলো ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবের সঙ্গে সম্পর্কিত বলে ধারণা করা হলেও রাশিয়ার সরাসরি সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছে বুলগেরিয়ার সরকার।
দুই প্রার্থীই জাহাজে হামলার নিন্দা জানিয়েছেন এবং ইউক্রেন যুদ্ধের কূটনৈতিক সমাধানের আহ্বান জানিয়েছেন। তবে সংকট মোকাবিলায় তাঁদের অবস্থানে পার্থক্য ছিল। ইয়োতোভা আলোচনার মাধ্যমে শান্তি প্রতিষ্ঠার ওপর জোর দিয়েছেন। অন্যদিকে গিউরভের বক্তব্য ছিল, রাশিয়াকে আগ্রাসন বন্ধ করতে হবে এবং ইউক্রেনের প্রতি সমর্থন অব্যাহত রাখতে হবে।
ইয়োতোভা ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব নেন। তাঁর দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক মিত্র রুমেন রাদেভ প্রেসিডেন্ট পদ থেকে পদত্যাগ করে পার্লামেন্ট নির্বাচনে অংশ নিলে তিনি রাষ্ট্রপ্রধানের দায়িত্ব পান। এর আগে ২০১৬ সালে রাদেভের সঙ্গে ভাইস প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন ইয়োতোভা। ২০২১ সালেও তাঁরা পুনর্নির্বাচিত হয়েছিলেন।
ইয়োতোভার রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা দীর্ঘদিনের। তিনি বুলগেরিয়ান সোশ্যালিস্ট পার্টির রাজনীতিতে যুক্ত ছিলেন এবং ২০১৪ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত ইউরোপীয় পার্লামেন্টের সদস্য ছিলেন। ইউরোপীয় পার্লামেন্টে নাগরিক স্বাধীনতা, ন্যায়বিচার ও স্বরাষ্ট্রবিষয়ক কমিটিতেও দায়িত্ব পালন করেছেন।
বুলগেরিয়ায় প্রেসিডেন্টের পদ মূলত আনুষ্ঠানিক হলেও রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে তাঁর কিছু গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক ক্ষমতা রয়েছে। তিনি সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়ক, আইনসভায় পাস হওয়া বিলে ভেটো দিতে পারেন, চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন এবং রাষ্ট্রদূত নিয়োগের মতো দায়িত্ব পালন করেন। ফলে নতুন প্রেসিডেন্টের পররাষ্ট্রনীতি ও জাতীয় নিরাপত্তা বিষয়ে অবস্থান দেশটির রাজনৈতিক অঙ্গনে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে।
চূড়ান্ত ফল প্রকাশের পর ইয়োতোভার জয় নিশ্চিত হলে ইউরোপের দেশগুলোর মধ্যে বুলগেরিয়া নতুন এক রাজনৈতিক ইতিহাসের সাক্ষী হবে। একই সঙ্গে রাশিয়া ও ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে তাঁর অবস্থান দেশটির ভবিষ্যৎ কূটনৈতিক সম্পর্কেও আলোচনার কেন্দ্রে থাকবে।
