ইতালির বিভিন্ন শহরে সাধারণ ধর্মঘটকে কেন্দ্র করে রাজপথে নেমেছেন হাজারো শ্রমিক, শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষ। শুক্রবার (৩০ অক্টোবর) দেশজুড়ে আয়োজিত এসব কর্মসূচিতে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, কম মজুরি, সরকারি সেবার দুরবস্থা এবং সামরিক খাতে ব্যয় বৃদ্ধির প্রতিবাদ জানানো হয়। কয়েকটি শহরে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ হলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে জলকামান ও অন্যান্য ব্যবস্থা নেয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।

তুরিনের কেন্দ্রীয় পিয়াচা কাস্তেল্লো এলাকায় সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। সেখানে একদল শিক্ষার্থী ও বামপন্থী আন্দোলনকর্মী শহরের প্রিফেকচার ভবন ঘিরে রাখা পুলিশের নিরাপত্তাবেষ্টনীর দিকে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। এ সময় পুলিশ জলকামান ব্যবহার করে এবং বিক্ষোভকারীদের পিছু হটাতে অভিযান চালায়।

রোমেও উত্তেজনা, ভিসেনজায় আহত পুলিশ সদস্য

রাজধানী রোমেও বিক্ষোভের একপর্যায়ে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। মূল মিছিল থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে একদল বিক্ষোভকারী কলোসিয়ামের দিকে এগিয়ে যান। এ সময় পুলিশের সঙ্গে তাদের সংঘর্ষ হয়। বিক্ষোভকারীদের কেউ কেউ পুলিশের দিকে বিভিন্ন বস্তু ছুড়ে মারেন। কয়েকটি ময়লার পাত্র উল্টে সড়কে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করা হয় এবং তাতে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়।

পরে রোমে পার্লামেন্টের দিকে যাওয়ার চেষ্টা করা আরেকটি দলের সঙ্গে পুলিশের উত্তেজনা তৈরি হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ তাদের সরিয়ে দেয়। এ ঘটনায় আটজনকে আটক করা হয়েছে বলে বার্তা সংস্থা এএনএসএ জানিয়েছে।

ভিসেনজায় সংঘর্ষে চার পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন তিন বিক্ষোভকারীও। সেখানে বিক্ষোভকারীদের একটি দল শহরের পশ্চিম পাশের বাইপাস সড়কের একটি সংযোগস্থল দখলের চেষ্টা করলে পুলিশ জলকামান ব্যবহার করে। জবাবে বিক্ষোভকারীরা ধোঁয়ার বোমা ও আতশবাজি ছোড়েন। পরে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ব্যবহার করে।

আন্দোলনের পেছনে যেসব দাবি

ইতালির তৃণমূলভিত্তিক শ্রমিক সংগঠন ইউনিওনে সিনদাকালে দি বাসে (ইউএসবি) ৩০ অক্টোবর ২৪ ঘণ্টার সাধারণ ধর্মঘটের ডাক দেয়। তাদের আহ্বানে ৪০টির বেশি শহরে বিক্ষোভ কর্মসূচি পালিত হয়।

আন্দোলনকারীদের প্রধান দাবির মধ্যে রয়েছে মজুরি বৃদ্ধি, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে সরকারি সেবা জোরদার এবং আবাসন ব্যয় কমানো। পাশাপাশি সামরিক খাতে ব্যয় বৃদ্ধি ও যুদ্ধসংশ্লিষ্ট অস্ত্র পরিবহনে বন্দর ব্যবহারের বিরোধিতাও করেন বিক্ষোভকারীরা।

ইউএসবি সংগঠনের দাবি, দেশজুড়ে ৬০টির বেশি স্থানে কর্মসূচিতে প্রায় ১৫ লাখ মানুষ অংশ নিয়েছেন। তবে এই সংখ্যা সংগঠনটির নিজস্ব হিসাব। বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, বিভিন্ন শহরে কয়েক হাজার থেকে কয়েক দশ হাজার মানুষ বিক্ষোভে অংশ নেন।

মিলান ও জেনোয়ার কর্মসূচি

মিলানে বিক্ষোভকারীরা শহরের রিং রোডে মিছিল করেন। পরে তারা পলিতেকনিকো দি মিলানো বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে কর্মসূচি শেষ করেন। এ সময় মিছিলে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ অংশ নেন।

অন্যদিকে জেনোয়া বন্দরে প্রায় ১৫ হাজার বন্দরশ্রমিক, শিক্ষার্থী ও অন্যান্য আন্দোলনকারী অংশ নেন। আন্তর্জাতিক অস্ত্র পরিবহনে বন্দর ব্যবহারের প্রতিবাদ এবং বিভিন্ন সংঘাতে নিহত নাবিকদের বিষয়টি তুলে ধরেন তারা।

বিক্ষোভ ঘিরে আগেই সতর্ক ছিল সরকার

ইতালিতে অক্টোবরের মাঝামাঝি সময় থেকেই বিভিন্ন শহরে জীবনযাত্রার ব্যয় ও সরকারি সেবার মান নিয়ে বিক্ষোভ চলছে। ১৭ ও ১৮ অক্টোবর মিলানে বিক্ষোভ চলাকালে ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা ঘটে। পরে তুরিন, রোম ও বোলোনিয়াতেও সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ে।

পরিস্থিতি বিবেচনায় ২৯ অক্টোবর দেশটির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মাত্তেও পিয়ানতেদোসি প্রিফেক্ট, পুলিশপ্রধান ও আঞ্চলিক নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেন। ইতালির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে বলা হয়, সম্ভাব্য বিক্ষোভের স্থানগুলোতে নিরাপত্তা জোরদার এবং শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের অধিকার রক্ষার পাশাপাশি সহিংসতা সৃষ্টিকারীদের বিচ্ছিন্ন করার বিষয়ে আলোচনা হয়েছে।

এর আগে পিয়ানতেদোসি জানিয়েছিলেন, বিক্ষোভ ঘিরে উদ্বেগ থাকলেও পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার সক্ষমতা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর রয়েছে। ৩০ অক্টোবরের কর্মসূচিতে বড় ধরনের সহিংসতা না ছড়ালেও রোম, তুরিন ও ভিসেনজায় বিচ্ছিন্ন সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।

সর্বশেষ পরিস্থিতিতে ইতালির বিভিন্ন শহরে বিক্ষোভের মূল কর্মসূচি শেষ হলেও জীবনযাত্রার ব্যয়, মজুরি ও সরকারি নীতি নিয়ে আন্দোলনকারীদের অসন্তোষ রয়ে গেছে।