বরিশাল শিক্ষা বোর্ডের অধীনে ২০২৬ সালের উচ্চমাধ্যমিক সার্টিফিকেট (এইচএসসি) পরীক্ষায় ১১টি কলেজ থেকে একজন শিক্ষার্থীও পাস করতে পারেননি। পাঁচ জেলার এসব প্রতিষ্ঠানে মোট ৫৭ জন পরীক্ষার্থী নিবন্ধিত ছিলেন। একই সঙ্গে বোর্ডের সামগ্রিক ফলাফলেও বড় অবনতি হয়েছে। তিন বছরের ব্যবধানে পাসের হার কমেছে ৩৫.৮১ শতাংশ পয়েন্ট।

৩১ অক্টোবর শনিবার সকালে বরিশাল শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক অধ্যাপক শরীফ মোর্শেদ রেজা আনুষ্ঠানিকভাবে ফলাফল ঘোষণা করেন। প্রকাশিত ফলাফলে দেখা যায়, এ বছর বোর্ডের পাসের হার ৪৪.৮৪ শতাংশ। মোট ৫৭ হাজার ৯১২ জন পরীক্ষায় অংশ নিয়ে উত্তীর্ণ হয়েছেন ২৫ হাজার ৯৭০ জন। জিপিএ-৫ পেয়েছেন ৯৫০ জন।

পাঁচ জেলার ১১ কলেজে কেউ পাস করেননি

শূন্য পাসের তালিকায় থাকা ১১টি কলেজ বরিশাল বিভাগের পাঁচ জেলায় অবস্থিত। এর মধ্যে পটুয়াখালীতে তিনটি, ভোলায় তিনটি, বরগুনায় দুটি, পিরোজপুরে দুটি এবং ঝালকাঠিতে একটি কলেজ রয়েছে। বরিশাল জেলার কোনো কলেজ এই তালিকায় নেই।

এসব প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার পরিবেশ, অবকাঠামো ও শিক্ষকসংকট নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। কয়েকটি কলেজের শ্রেণিকক্ষ জরাজীর্ণ, কোথাও শিক্ষকের সংখ্যা প্রয়োজনের তুলনায় কম। আবার কিছু প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীসংখ্যাও অত্যন্ত সীমিত।

পটুয়াখালীর মির্জাগঞ্জ উপজেলার মজিদবাড়িয়া কলেজ এর একটি উদাহরণ। ২০০২ সালে প্রতিষ্ঠিত এই কলেজের শ্রেণিকক্ষের বড় অংশ টিনশেডের। দীর্ঘদিনের অবহেলায় ভবনের বিভিন্ন অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটিতে শিক্ষক রয়েছেন মাত্র আটজন।

কলেজটির অধ্যক্ষ ফারুক মালিক জানান, প্রতিষ্ঠানটি এখনো মাসিক বেতন-ভাতার সরকারি অংশ বা এমপিও সুবিধাভুক্ত হয়নি। দুর্বল অবকাঠামোর কারণে শিক্ষার্থী ধরে রাখাও কঠিন হয়ে পড়েছে।

ভোলার চরফ্যাশনের জালাল আহমেদ কলেজ থেকেও এবার তিনজন পরীক্ষার্থী অংশ নিয়েছিলেন। তাঁদের কেউই উত্তীর্ণ হতে পারেননি।

তিন বছরে পাসের হার কমেছে ৩৫.৮১ শতাংশ পয়েন্ট

বরিশাল শিক্ষা বোর্ডের ফলাফলের ধারাবাহিক পরিসংখ্যানেও অবনতির চিত্র স্পষ্ট। ২০২৩ সালে এ বোর্ডে পাসের হার ছিল ৮০.৬৫ শতাংশ। ওই বছর দেশের সাধারণ শিক্ষা বোর্ডগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ পাসের হার ছিল বরিশালের।

পরের বছর, অর্থাৎ ২০২৪ সালে পাসের হার দাঁড়ায় ৮১.৮৫ শতাংশে। ২০২৫ সালে তা কমে হয় ৬২.৫৭ শতাংশ। আর ২০২৬ সালে আরও কমে দাঁড়িয়েছে ৪৪.৮৪ শতাংশে।

অর্থাৎ মাত্র তিন বছরের ব্যবধানে পাসের হার কমেছে ৩৫.৮১ শতাংশ পয়েন্ট। এবারের ফলাফলে দেশের নয়টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের মধ্যে সর্বনিম্ন অবস্থানে রয়েছে বরিশাল।

গত বছরের তুলনায় এবার পরীক্ষায় অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমেছে ১ হাজার ৩২৭ জন। অথচ অকৃতকার্য শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেড়েছে ৯ হাজার ৭৬৯ জন।

মানবিক বিভাগে সবচেয়ে বেশি বিপর্যয়

বিভাগভিত্তিক ফলাফলে সবচেয়ে বেশি অবনতি দেখা গেছে মানবিক বিভাগে। এ বছর এ বিভাগ থেকে ৪০ হাজার ৪৮৮ জন পরীক্ষায় অংশ নেন। তাঁদের মধ্যে অকৃতকার্য হয়েছেন ২৩ হাজার ৫০৫ জন।

গত বছর মানবিক বিভাগে অকৃতকার্য শিক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল ১৬ হাজার ৬৭৪। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে এই বিভাগে অকৃতকার্য শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেড়েছে ৬ হাজার ৮৩১ জন।

এ ছাড়া ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগে পাসের হার ৪০.২৮ শতাংশ এবং বিজ্ঞান বিভাগে ৫৬.৭৮ শতাংশ। ইংরেজি বিষয়েও ফলাফলের অবনতি হয়েছে। এ বিষয়ে পাসের হার নেমে এসেছে ৫৪.০৮ শতাংশে।

ছাত্র ও ছাত্রীদের ফলাফলেও পার্থক্য রয়েছে। ছাত্রীদের পাসের হার ৫২.৯৭ শতাংশ, যেখানে ছাত্রদের পাসের হার ৩৫.৩৮ শতাংশ।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠায় প্রয়োজন বিবেচনার তাগিদ

বরিশাল শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক অধ্যাপক শরীফ মোর্শেদ রেজা বলেন, কিছু এলাকায় রাজনৈতিক প্রভাব কিংবা স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তিদের চাপে প্রয়োজন না থাকলেও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা হয়। কিন্তু এসব প্রতিষ্ঠানে পর্যাপ্ত শিক্ষার্থী ও প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা না থাকায় একপর্যায়ে শিক্ষার পরিবেশ ব্যাহত হয়।

তাঁর মতে, প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি ও বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনা না করে প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার কারণে অনেক কলেজ কার্যকরভাবে পরিচালিত হচ্ছে না। এসব প্রতিষ্ঠানের বিষয়ে বোর্ড প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে বলেও তিনি জানান।

ভোলার অতিরিক্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা এ কে এম সালেহ উদ্দিনও বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখার কথা জানিয়েছেন। তিনি বলেন, জেলার তিনটি কলেজ থেকে একজন শিক্ষার্থীও পাস করেননি। এসব প্রতিষ্ঠানের কর্তৃপক্ষের কাছে ব্যাখ্যা চাওয়া হবে এবং শিক্ষা বোর্ডকে বিষয়টি জানানো হবে।

সামনে কী করবে শিক্ষা বোর্ড

এবারের ফলাফলে শুধু ১১টি কলেজের শূন্য পাসের ঘটনাই নয়, বরং পুরো বোর্ডের পাসের হার কমে যাওয়ার বিষয়টিও উদ্বেগ তৈরি করেছে। শিক্ষার্থীদের ফলাফলের পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানের পাঠদান, শিক্ষকসংখ্যা, অবকাঠামো এবং নিয়মিত শিক্ষা কার্যক্রম কতটা কার্যকর রয়েছে, সেসব বিষয় পর্যালোচনার প্রয়োজন দেখা দিয়েছে।

বিশেষ করে যেসব কলেজ থেকে কোনো শিক্ষার্থী পাস করেননি, সেগুলোর শিক্ষার পরিবেশ ও প্রশাসনিক কার্যক্রম খতিয়ে দেখা জরুরি। শিক্ষা বোর্ডও এসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার কথা জানিয়েছে।

একসময় এইচএসসি পরীক্ষার ফলাফলে দেশের শীর্ষে থাকা বরিশাল বোর্ডের এমন ধারাবাহিক অবনতি শিক্ষা খাতের জন্য বড় প্রশ্ন তৈরি করেছে। এখন নজর থাকবে, বোর্ডের পর্যালোচনা ও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপের মাধ্যমে কলেজগুলোর শিক্ষার মান এবং সামগ্রিক ফলাফলে কতটা পরিবর্তন আসে।