বাংলাদেশ ভ্রমণে এসে নাটোর রেলস্টেশনে ল্যাপটপ ও ক্যামেরাসহ ব্যাগ হারিয়ে বিপাকে পড়েছিলেন জার্মান তরুণ পর্যটক ক্রিল ল্যান্ডার। ঘটনার পর থানায় বসে তাঁর কান্নার ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। সেই ভিডিও দেখে তরুণটির পাশে দাঁড়িয়েছেন রাজধানীর জিগাতলার বাসিন্দা মুক্তি মাহমুদ। নিজের উদ্যোগে তাঁকে উপহার দিয়েছেন একটি ম্যাকবুক।

শনিবার (১০ অক্টোবর) সন্ধ্যায় রাজধানীর হাজারীবাগ থানায় পুলিশের উপস্থিতিতে ১৮ বছর বয়সী ক্রিলের হাতে ম্যাকবুকটি তুলে দেন তিনি। এ সময় নতুন ল্যাপটপ পেয়ে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন জার্মান পর্যটক।

মুক্তি মাহমুদ জানান, কয়েক দিন ধরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জার্মান পর্যটকের ব্যাগ হারানোর খবর দেখছিলেন তিনি। পরে নাটোর সদর থানায় বসে ক্রিলের কান্নার একটি ভিডিও তাঁর নজরে আসে। ভিডিওটি দেখে নিজের ছেলের কথা মনে পড়ে যায়।

মুক্তি মাহমুদের ছেলে বিদেশে পড়াশোনা করেন। নিজের সন্তানের বয়সী একজন বিদেশি তরুণ বাংলাদেশে এসে এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হওয়ায় বিষয়টি তাঁকে নাড়া দেয়।

এরপর ক্রিলের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা শুরু করেন তিনি। একপর্যায়ে শাওন নামের এক ব্যক্তির সহায়তায় পর্যটকের সঙ্গে যোগাযোগ করতে সক্ষম হন। পরে সাক্ষাৎ করে তাঁকে ম্যাকবুকটি উপহার দেন।

মুক্তি মাহমুদ বলেন, বাংলাদেশে এসে একজন বিদেশি পর্যটকের মূল্যবান জিনিসপত্র হারিয়ে যাওয়ার ঘটনা দুঃখজনক। দেশ ছাড়ার আগে তরুণটি যেন কিছু ভালো স্মৃতি নিয়ে ফিরতে পারেন, সেই ভাবনা থেকেই তাঁকে সহায়তা করেছেন তিনি।

বর্তমানে মুক্তি মাহমুদ রাজধানীর একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে মানবসম্পদ বিভাগের জ্যেষ্ঠ ব্যবস্থাপক হিসেবে কর্মরত। তিনি দীর্ঘদিন যুক্তরাজ্যের লন্ডনেও অবস্থান করেছেন।

উপহার পেয়ে নিজের অনুভূতি প্রকাশ করেছেন জার্মান পর্যটক ক্রিল ল্যান্ডারও। তিনি জানান, ব্যাগ হারানোর পর বাংলাদেশে অনেক মানুষ তাঁর প্রতি সহানুভূতি দেখিয়েছেন এবং বিভিন্নভাবে সাহায্য করেছেন।

নতুন ম্যাকবুক পাওয়ায় আবারও নিজের কাজ চালিয়ে যেতে পারবেন বলে জানান তিনি। তাঁর কাছে এই মানবিক সহযোগিতা বাংলাদেশ ভ্রমণের একটি স্মরণীয় অভিজ্ঞতা হয়ে থাকবে।

এর আগে বুধবার (৭ অক্টোবর) বিকেলে নাটোর রেলস্টেশনে ব্যাগ হারান ক্রিল। তিনি বগুড়ার বিভিন্ন দর্শনীয় স্থান ঘুরে ট্রেনে করে নাটোরে এসেছিলেন। সেখান থেকে পরবর্তী গন্তব্যে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন।

অভিযোগ অনুযায়ী, রেলওয়ের কর্মকর্তা পরিচয় দেওয়া এক ব্যক্তির কাছে ব্যাগ রেখে এটিএম বুথ থেকে টাকা তুলতে যান তিনি। ফিরে এসে ওই ব্যক্তিকে আর খুঁজে পাননি। ব্যাগটিও সেখানে ছিল না।

হারানো ব্যাগে তাঁর ম্যাকবুক, ডিএসএলআর ক্যামেরাসহ গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিগত সামগ্রী ছিল। পরে তিনি নাটোর সদর থানায় গিয়ে বিষয়টি জানান। সেখানে তাঁর কান্নার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।

ব্যাগ উদ্ধারের আশায় রাজশাহীতেও গিয়েছিলেন ক্রিল। তবে সেখানে গিয়ে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র ফিরে না পাওয়ায় ঢাকায় ফিরে আসেন।

পুলিশ জানিয়েছে, নাটোর রেলস্টেশনের সিসিটিভি ফুটেজে এক ব্যক্তিকে পর্যটকের ব্যাগ নিয়ে যেতে দেখা গেছে। ফুটেজ পর্যালোচনা করে সন্দেহভাজন ব্যক্তিকে শনাক্ত করা হয়েছে। তাঁকে আটকের পাশাপাশি হারানো মালামাল উদ্ধারে তদন্ত চলছে।

হাজারীবাগ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোশাররফ হোসেন জানিয়েছেন, ক্রিল পড়াশোনার পাশাপাশি খণ্ডকালীন চাকরি করে নিজের আগের ল্যাপটপটি কিনেছিলেন। সেটি হারানো তাঁর জন্য বড় ধরনের ক্ষতি। তবে একজন বাংলাদেশির ব্যক্তিগত উদ্যোগে তাঁকে নতুন ল্যাপটপ উপহার দেওয়ার ঘটনাকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন তিনি।

পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, উপহার পাওয়া ম্যাকবুকটি আগের হারানো ল্যাপটপের পরিবর্তে দেওয়া হয়েছে। মূল ব্যাগ, ক্যামেরা ও অন্যান্য জিনিসপত্র উদ্ধারের চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।

নাটোরের ঘটনাটি প্রথমে বিদেশি পর্যটকের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ সৃষ্টি করলেও পরবর্তী সময়ে একজন বাংলাদেশির সহযোগিতা মানবিকতার নতুন দৃষ্টান্ত তৈরি করেছে। হারানো মালামাল এখনো উদ্ধার না হলেও নতুন ল্যাপটপ পেয়ে নিজের কাজ আবার শুরু করার সুযোগ পেয়েছেন ক্রিল ল্যান্ডার।

বাংলাদেশ সফরের এই অনাকাঙ্ক্ষিত অভিজ্ঞতার মধ্যেও সাধারণ মানুষের সহমর্মিতা ও সহযোগিতার স্মৃতি সঙ্গে নিয়ে ফিরতে পারবেন বলে আশা প্রকাশ করেছেন এই তরুণ পর্যটক।