বিশ্বের চাকরির বাজারে দ্রুত পরিবর্তন ঘটছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তি, তথ্যপ্রযুক্তি ও সবুজ অর্থনীতির বিস্তারের সঙ্গে কিছু নতুন পেশার চাহিদা দ্রুত বাড়ছে, আবার কিছু প্রচলিত কাজের সুযোগ কমছে। ফলে ভবিষ্যৎ ক্যারিয়ারের জন্য কোন দক্ষতা অর্জন করা হবে, সেটি শিক্ষার্থী ও চাকরিপ্রত্যাশীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের Future of Jobs Report 2025 অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে বিশ্বজুড়ে প্রায় ১৭ কোটি নতুন চাকরি তৈরি হতে পারে। একই সময়ে প্রায় ৯ কোটি ২০ লাখ চাকরি বিলুপ্ত বা পরিবর্তিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। সব মিলিয়ে নতুন ও বিলুপ্ত চাকরির পার্থক্যে প্রায় ৭ কোটি ৮০ লাখ অতিরিক্ত চাকরির সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক পেশায় বাড়ছে সুযোগ
ভবিষ্যতের দ্রুত বর্ধনশীল পেশার তালিকায় প্রযুক্তিনির্ভর কাজগুলোর অবস্থান শক্তিশালী। বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের প্রতিবেদনে বড় তথ্যভান্ডার বিশেষজ্ঞ, আর্থিক প্রযুক্তি প্রকৌশলী এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও যন্ত্রশিক্ষা বিশেষজ্ঞদের দ্রুততম বর্ধনশীল পেশার মধ্যে রাখা হয়েছে।
এ তালিকায় সফটওয়্যার ও অ্যাপ্লিকেশন উন্নয়ন সংশ্লিষ্ট পেশাও রয়েছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও তথ্যপ্রক্রিয়াকরণ প্রযুক্তির বিস্তার এসব কাজের চাহিদা বাড়ানোর অন্যতম প্রধান কারণ।
এর অর্থ এই নয় যে ভবিষ্যতের সব চাকরিই প্রযুক্তিনির্ভর হবে। বরং প্রযুক্তির সঙ্গে কাজ করতে পারে এমন বিভিন্ন পেশাজীবীর প্রয়োজন বাড়বে। একজন হিসাবরক্ষক, বিপণনকর্মী, শিক্ষক বা ব্যবস্থাপককেও নিজের কাজের সঙ্গে নতুন প্রযুক্তির ব্যবহার শেখার প্রয়োজন হতে পারে।
সাইবার নিরাপত্তার গুরুত্ব বাড়ছে
ডিজিটাল সেবা যত বিস্তৃত হচ্ছে, তথ্যের নিরাপত্তার প্রয়োজনও তত বাড়ছে। ফলে সাইবার নিরাপত্তা, তথ্য সুরক্ষা ও ডিজিটাল ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার সঙ্গে যুক্ত পেশার চাহিদা বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের হিসাবে নেটওয়ার্ক ও সাইবার নিরাপত্তা ভবিষ্যতে সবচেয়ে দ্রুত বাড়তে থাকা দক্ষতাগুলোর মধ্যে রয়েছে। নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ এবং তথ্য নিরাপত্তা বিশ্লেষকের মতো পেশাও দ্রুত বর্ধনশীল চাকরির তালিকায় রয়েছে।
বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের জন্যও এটি একটি সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র হতে পারে। কম্পিউটার বিজ্ঞান, তথ্যপ্রযুক্তি, নেটওয়ার্ক ব্যবস্থাপনা ও সাইবার নিরাপত্তার মৌলিক জ্ঞান ভবিষ্যৎ কর্মক্ষেত্রে বাড়তি সুবিধা দিতে পারে।
বড় তথ্যভান্ডার ও তথ্য বিশ্লেষণের চাহিদা
প্রতিষ্ঠানগুলো এখন আগের তুলনায় অনেক বেশি তথ্য ব্যবহার করে সিদ্ধান্ত নিচ্ছে। গ্রাহকের আচরণ, বাজার পরিস্থিতি, আর্থিক তথ্য ও প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম বিশ্লেষণের জন্য বড় তথ্যভান্ডার ব্যবস্থাপনা ও তথ্য বিশ্লেষণের দক্ষতা প্রয়োজন হচ্ছে।
এ কারণেই বড় তথ্যভান্ডার বিশেষজ্ঞকে বিশ্বের দ্রুততম বর্ধনশীল পেশাগুলোর শীর্ষে রাখা হয়েছে।
শিক্ষার্থীরা পরিসংখ্যান, গণিত, কম্পিউটার বিজ্ঞান বা সংশ্লিষ্ট বিষয়ে পড়াশোনার পাশাপাশি তথ্য বিশ্লেষণ ও তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের দক্ষতা অর্জন করলে ভবিষ্যৎ কর্মক্ষেত্রে এর ব্যবহার করতে পারবেন।
সবুজ অর্থনীতিতে নতুন চাকরি
শুধু প্রযুক্তিই ভবিষ্যতের চাকরির বাজার পরিবর্তন করছে না। জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা ও নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ বাড়ার কারণে পরিবেশ ও জ্বালানিসংক্রান্ত পেশার চাহিদাও বাড়ছে।
বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের প্রতিবেদনে নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকৌশলী, পরিবেশ প্রকৌশলী এবং বৈদ্যুতিক ও স্বয়ংক্রিয় যানবাহন বিশেষজ্ঞদের দ্রুত বর্ধনশীল পেশার মধ্যে রাখা হয়েছে।
ফলে পরিবেশ বিজ্ঞান, প্রকৌশল, জ্বালানি প্রযুক্তি ও টেকসই উন্নয়নের সঙ্গে যুক্ত শিক্ষার্থীদের জন্য ভবিষ্যতে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
প্রযুক্তির পাশাপাশি মানবিক দক্ষতাও জরুরি
ভবিষ্যতের চাকরি মানেই শুধু কম্পিউটার বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার জ্ঞান নয়। বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের প্রতিবেদনে সৃজনশীল চিন্তা, স্থিতিস্থাপকতা, নমনীয়তা, নেতৃত্ব, বিশ্লেষণী চিন্তা এবং শেখার আগ্রহকেও ভবিষ্যতের গুরুত্বপূর্ণ দক্ষতা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
অর্থাৎ প্রযুক্তিগত দক্ষতার সঙ্গে মানবিক দক্ষতার সমন্বয়ই ভবিষ্যৎ কর্মক্ষেত্রে বেশি কার্যকর হতে পারে। যেসব কাজে সিদ্ধান্ত গ্রহণ, মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ, সমস্যা সমাধান ও নতুন ধারণা তৈরির প্রয়োজন রয়েছে, সেসব ক্ষেত্রেও মানুষের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ থাকবে।
২০৩০ সালের মধ্যে দক্ষতার বড় পরিবর্তন
বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০৩০ সালের মধ্যে চাকরির জন্য প্রয়োজনীয় মূল দক্ষতার প্রায় ৩৯ শতাংশ পরিবর্তিত হতে পারে। একই প্রতিবেদনে ৬৩ শতাংশ নিয়োগদাতা দক্ষতার ঘাটতিকে ব্যবসা পরিবর্তনের ক্ষেত্রে বড় বাধা হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
এ কারণে শুধু শিক্ষাজীবনে একটি ডিগ্রি অর্জন করাই যথেষ্ট নাও হতে পারে। কর্মজীবনেও নতুন দক্ষতা শেখা এবং আগের দক্ষতা উন্নত করার প্রয়োজন বাড়বে।
কোন দক্ষতাগুলো এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ
ভবিষ্যতের চাকরির বাজারের জন্য বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের প্রতিবেদনে যেসব দক্ষতার গুরুত্ব বাড়ার কথা বলা হয়েছে, তার মধ্যে রয়েছে:
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও বড় তথ্যভান্ডার: তথ্যভিত্তিক কাজ ও প্রযুক্তিনির্ভর সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য।
নেটওয়ার্ক ও সাইবার নিরাপত্তা: ডিজিটাল অবকাঠামো ও তথ্য সুরক্ষার জন্য।
প্রযুক্তিগত জ্ঞান: নতুন প্রযুক্তি বুঝে কর্মক্ষেত্রে ব্যবহার করার সক্ষমতা।
সৃজনশীল চিন্তা: নতুন ধারণা তৈরি ও জটিল সমস্যার সমাধানের জন্য।
বিশ্লেষণী চিন্তা: তথ্য যাচাই করে কার্যকর সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য।
নমনীয়তা ও অভিযোজন ক্ষমতা: দ্রুত পরিবর্তনশীল কর্মপরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার জন্য।
নেতৃত্ব ও সামাজিক প্রভাব: দল পরিচালনা ও মানুষের সঙ্গে কার্যকরভাবে কাজ করার জন্য।
পরিবেশ সচেতনতা: সবুজ অর্থনীতি ও টেকসই উন্নয়নের সঙ্গে সম্পর্কিত কাজের জন্য।
শিক্ষার্থীদের প্রস্তুতি শুরু হবে কীভাবে
ভবিষ্যতের ক্যারিয়ারের জন্য প্রস্তুতি নিতে হলে প্রথমে নিজের আগ্রহ ও বর্তমান দক্ষতা মূল্যায়ন করা দরকার। এরপর যে পেশায় যেতে চান, সেই পেশায় আগামী কয়েক বছরে কী ধরনের দক্ষতার চাহিদা তৈরি হতে পারে, তা সম্পর্কে ধারণা নিতে হবে।
শিক্ষার্থীরা একাডেমিক পড়াশোনার পাশাপাশি তথ্য বিশ্লেষণ, প্রযুক্তির ব্যবহার, যোগাযোগ, উপস্থাপন, সমস্যা সমাধান ও সৃজনশীল চিন্তার মতো দক্ষতা বাড়াতে পারেন।
একই সঙ্গে নিয়মিত নতুন বিষয় শেখার অভ্যাস তৈরি করাও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ কর্মক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় দক্ষতা স্থির থাকবে না। বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের তথ্য অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে উল্লেখযোগ্য অংশের কর্মদক্ষতার পরিবর্তন প্রত্যাশিত।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা চাকরি কমাবে, নাকি নতুন কাজ তৈরি করবে
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিস্তার নিয়ে চাকরি হারানোর আশঙ্কা থাকলেও এর প্রভাব একমুখী নয়। কিছু কাজ স্বয়ংক্রিয় হওয়ার কারণে কমে যেতে পারে, আবার নতুন প্রযুক্তি ব্যবস্থাপনা, তথ্য বিশ্লেষণ, সফটওয়্যার উন্নয়ন ও নিরাপত্তার মতো ক্ষেত্রে নতুন কাজ তৈরি করতে পারে।
বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের হিসাবে, ২০৩০ সালের মধ্যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও তথ্যপ্রক্রিয়াকরণ প্রযুক্তির কারণে প্রায় ১ কোটি ১০ লাখ নতুন ভূমিকা তৈরি হতে পারে, একই সঙ্গে প্রায় ৯০ লাখ ভূমিকা বিলুপ্ত হতে পারে।
এ কারণে ভবিষ্যৎ চাকরির বাজারে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হতে পারে প্রযুক্তির সঙ্গে প্রতিযোগিতা না করে প্রযুক্তিকে কাজে লাগানোর সক্ষমতা।
ভবিষ্যৎ ক্যারিয়ারে সবচেয়ে বড় শক্তি হতে পারে শেখার ক্ষমতা
কর্মক্ষেত্রে পরিবর্তন দ্রুত হচ্ছে। ফলে একটি নির্দিষ্ট দক্ষতা শিখে দীর্ঘদিন একইভাবে কাজ করার পরিবর্তে সময়ের সঙ্গে নতুন দক্ষতা অর্জনের সক্ষমতা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরাম সৃজনশীল চিন্তা, কৌতূহল, আজীবন শেখার আগ্রহ, স্থিতিস্থাপকতা ও নমনীয়তাকে ক্রমবর্ধমান গুরুত্বপূর্ণ দক্ষতা হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
বাংলাদেশি শিক্ষার্থী ও চাকরিপ্রার্থীদের জন্য এর অর্থ হলো, শুধু ভালো ফলাফল বা একটি সনদ অর্জনের মধ্যে ক্যারিয়ার প্রস্তুতি সীমাবদ্ধ না রেখে প্রযুক্তি ও মানবিক দক্ষতার সমন্বিত উন্নয়ন করতে হবে।
ভবিষ্যতের চাকরির বাজারে সবচেয়ে বেশি সুযোগ তৈরি হতে পারে তাঁদের জন্য, যারা নতুন প্রযুক্তি বুঝতে পারেন, তথ্য বিশ্লেষণ করতে পারেন, সৃজনশীলভাবে সমস্যা সমাধান করতে পারেন এবং পরিবর্তনের সঙ্গে দ্রুত মানিয়ে নিতে পারেন।



