আলাস্কায় ১৩ হাজার ৮০০ বছরের প্রাচীন বসতির সন্ধান

যুক্তরাষ্ট্রের আলাস্কায় প্রায় ১৩ হাজার ৮০০ বছর আগের মানুষের বসতির নিদর্শন আবিষ্কার করেছেন প্রত্নতত্ত্ববিদেরা। শেগ্‌ জ়ডালথি (Shégˊ Xdaltthˊíˊ) নামের প্রত্নস্থলটিতে পাথরের হাতিয়ার, হাড়ের তৈরি সূচ, আগুন জ্বালানোর স্থান, মাটির চুল্লি এবং প্রাচীন আশ্রয়কাঠামোর চিহ্ন পাওয়া গেছে। এসব নিদর্শন থেকে বরফযুগের শেষ দিকে উত্তর আমেরিকার আদি বাসিন্দারা কীভাবে বসবাস করতেন, তার নতুন ধারণা পাওয়া যাচ্ছে।

১৬ অক্টোবর ২০২৬-এ লাইভ সায়েন্স এ আবিষ্কারের খবর প্রকাশ করে। গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে বিজ্ঞান সাময়িকী সায়েন্স অ্যাডভান্সেস-এ। গবেষকদের মতে, এই প্রত্নস্থল থেকে পাওয়া তথ্য উত্তর আমেরিকায় মানুষের বসতি স্থাপন এবং প্রাচীন জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রা বোঝার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।

কোথায় পাওয়া গেছে প্রাচীন বসতির নিদর্শন

শেগ্‌ জ়ডালথি প্রত্নস্থলটি আলাস্কার অভ্যন্তরীণ অঞ্চলে, ফেয়ারব্যাংকস শহরের প্রায় ৫৫ কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্বে অবস্থিত। স্থানটির নামের অর্থ আলাস্কার স্থানীয় আথাবাস্কান ভাষায় ‘তাঁরা সেখানে ছিলেন’।

২০১৬ সাল থেকে প্রত্নতত্ত্ববিদেরা সেখানে বিভিন্ন পর্যায়ে খনন ও গবেষণা চালাচ্ছেন। স্থানটিতে প্রায় ১৩ হাজার ৮০০, ১৩ হাজার এবং ১২ হাজার ৭০০ বছর আগের তিনটি পৃথক বসতির স্তর শনাক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে পুরোনো স্তরটি থেকে পাওয়া নিদর্শনগুলো গবেষকদের বিশেষ আগ্রহের কারণ হয়ে উঠেছে।

পাথরের হাতিয়ার, হাড়ের সূচ ও প্রাচীন চুল্লি

খননকাজে বিপুলসংখ্যক পাথরের সরঞ্জাম ও প্রাণীর হাড় পাওয়া গেছে। এসবের মধ্যে রয়েছে বিশেষ ধরনের পাথরের হাতিয়ার, হাড় দিয়ে তৈরি সূচ এবং অলংকার হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে থাকতে পারে এমন একটি ছোট দুল।

প্রত্নস্থলটিতে আগুন জ্বালানোর চিহ্ন, মাটিতে খুঁটি বসানোর গর্ত এবং প্রাণীর হাড়ে ভরা একটি মাটির চুল্লিও পাওয়া গেছে। খুঁটির গর্তগুলো থেকে ধারণা করা হচ্ছে, সেখানে বাতাস ও ঠান্ডা থেকে বাঁচতে হেলান দেওয়া ছাউনি বা অস্থায়ী আশ্রয় তৈরি করা হয়েছিল।

মাটির চুল্লি এবং বিভিন্ন ধরনের সরঞ্জাম থেকে বোঝা যায়, সেখানে মানুষের কার্যক্রম শুধু অল্প সময়ের জন্য শিকার করে চলে যাওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। বরং তারা নির্দিষ্ট স্থানে ফিরে আসত এবং সেখানে বিভিন্ন কাজ করত।

কীভাবে নির্ধারণ করা হলো নিদর্শনের বয়স

প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনের বয়স নির্ধারণে গবেষকেরা রেডিওকার্বন ডেটিংসহ বিভিন্ন পদ্ধতি ব্যবহার করেছেন। এ পদ্ধতিতে প্রত্নস্থল থেকে পাওয়া কাঠকয়লা ও প্রাণীর হাড়ের মতো জৈব উপাদানের বয়স নির্ণয় করা হয়।

গবেষণাপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে, শেগ্‌ জ়ডালথির সবচেয়ে পুরোনো স্তরের বয়স প্রায় ১৩ হাজার ৮০০ বছর। সেখানে পাওয়া কাঠকয়লা ও হাড়ের নমুনার বয়স বিশ্লেষণ করে ওই সময়ের মানুষের উপস্থিতি সম্পর্কে ধারণা তৈরি করা হয়েছে। প্রত্নস্থলটির বিভিন্ন স্তরের বয়স আলাদা হওয়ায় সেখানে দীর্ঘ সময় ধরে মানুষের আসা-যাওয়ার ইতিহাসও বোঝা যাচ্ছে।

এশিয়ার সঙ্গে প্রাচীন মানুষের যোগাযোগের ইঙ্গিত

আলাস্কা একসময় বেরিংয়া নামে পরিচিত বিস্তীর্ণ স্থলভাগের অংশ ছিল। বরফযুগে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা কমে যাওয়ায় বর্তমান সাইবেরিয়া ও আলাস্কার মধ্যবর্তী অঞ্চলে স্থলপথ তৈরি হয়েছিল। প্রাচীন মানুষের আমেরিকা মহাদেশে ছড়িয়ে পড়ার ইতিহাস ব্যাখ্যায় এই অঞ্চল গুরুত্বপূর্ণ।

শেগ্‌ জ়ডালথিতে পাওয়া পাথরের হাতিয়ারের ধরন উত্তর-পূর্ব এশিয়া এবং বেরিং প্রণালির পশ্চিম ও পূর্ব পাশের অন্যান্য প্রত্নস্থলে পাওয়া সরঞ্জামের সঙ্গে সাংস্কৃতিক সম্পর্কের ইঙ্গিত দেয়। বিশেষ ধরনের হাতিয়ারের সঙ্গে এশিয়ার কিছু প্রত্নস্থলের মিল গবেষকদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ সূত্র হয়ে উঠেছে।

তবে এসব মিলের অর্থ এই নয় যে একটি নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠী সরাসরি অন্য জনগোষ্ঠীর কাছে গিয়ে বসতি গড়েছিল। বরং হাতিয়ার তৈরির কৌশল, প্রযুক্তি ও সাংস্কৃতিক ধারণা কীভাবে বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছিল, তা বোঝার সুযোগ তৈরি হয়েছে।

প্রাচীন কুকুরের ইতিহাসেও নতুন সূত্র

প্রত্নস্থলটিতে পাওয়া কিছু ক্যানিড বা কুকুরজাতীয় প্রাণীর হাড়ও গবেষকদের আগ্রহের বিষয়। এগুলোর সঙ্গে সাইবেরিয়ার নেকড়েসদৃশ প্রাণীর সম্পর্ক থাকতে পারে বলে গবেষকেরা জানিয়েছেন। কিছু নমুনা আমেরিকায় প্রাচীন কুকুরের গৃহপালিত হওয়ার ইতিহাস বোঝার ক্ষেত্রেও সম্ভাব্য সূত্র দিতে পারে।

তবে এসব হাড় যে নিশ্চিতভাবেই গৃহপালিত কুকুরের, তা এখনো প্রতিষ্ঠিত নয়। প্রাণীর পরিচয়, মানুষের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক এবং গৃহপালিত হওয়ার সময়কাল নির্ধারণে আরও বিশ্লেষণ প্রয়োজন।

মানব ইতিহাস বোঝার ক্ষেত্রে কেন গুরুত্বপূর্ণ

শেগ্‌ জ়ডালথির আবিষ্কার উত্তর আমেরিকার প্রথম দিকের মানুষের জীবনযাত্রা নিয়ে গবেষণায় নতুন তথ্য যোগ করেছে। পাথরের সরঞ্জাম, হাড়ের তৈরি সূচ, আশ্রয়কাঠামো এবং রান্নার চিহ্ন একসঙ্গে বিশ্লেষণ করে গবেষকেরা বুঝতে পারছেন, কঠিন জলবায়ুর মধ্যেও মানুষ কীভাবে পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাইয়ে বসবাস করত।

গবেষকেরা মনে করছেন, বেরিংয়া অঞ্চলে আরও খননকাজ চালানো গেলে আমেরিকা মহাদেশে মানুষের আগমন, বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর চলাচল এবং তাদের সাংস্কৃতিক যোগাযোগ সম্পর্কে আরও স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যাবে। এ কাজে স্থানীয় আদিবাসী সম্প্রদায়ের জ্ঞান ও অভিজ্ঞতাকেও গুরুত্ব দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।

প্রত্নস্থলটি পশ্চিম গোলার্ধে মানুষের প্রাচীন বসতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন হিসেবে বিবেচিত হলেও, গবেষকেরা একে আমেরিকা মহাদেশের সর্বপ্রাচীন প্রত্নস্থল বলে দাবি করছেন না। বরং প্রায় ১৩ হাজার ৮০০ বছর আগের মানুষের বসবাসের চিহ্নগুলো দেখাচ্ছে, উত্তর আমেরিকার আদি বাসিন্দাদের জীবন ও চলাচলের ইতিহাস এখনো নতুন আবিষ্কারের মাধ্যমে আরও সমৃদ্ধ হচ্ছে।