বাংলাদেশের নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রমের প্রশংসা করেছেন হলিউড অভিনেতা ম্যাট ডেমন। তাঁর মতে, ইউনূসের গ্রামীণ ব্যাংকের মাধ্যমে বিকশিত ক্ষুদ্রঋণের ধারণা থেকেই অনুপ্রেরণা পেয়েছে বিশুদ্ধ পানি ও স্যানিটেশন সুবিধা সম্প্রসারণে কাজ করা আন্তর্জাতিক সংস্থা Water.org-এর একটি উদ্ভাবনী অর্থায়ন পদ্ধতি।

ম্যাট ডেমন জানিয়েছেন, ইউনূসের ক্ষুদ্রঋণ মডেলের ধারণাকে পানি ও স্যানিটেশন খাতে প্রয়োগ করার বিষয়টি Water.org-এর কার্যক্রমে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে। বিশেষ করে স্বল্প আয়ের মানুষের জন্য নিরাপদ পানির সংযোগ ও স্যানিটেশন সুবিধা নিশ্চিত করতে ছোট অঙ্কের ঋণ দেওয়ার ধারণাটি এই মডেলের অন্যতম ভিত্তি।

ইউনূসের ধারণা কাজে লাগান গ্যারি হোয়াইট

টেডের পডকাস্টে মনোবিজ্ঞানী অ্যাডাম গ্রান্টের সঙ্গে এক আলোচনায় ম্যাট ডেমন বলেন, প্রকৌশলী ও সামাজিক উদ্যোক্তা গ্যারি হোয়াইট প্রথমে বুঝতে পেরেছিলেন, দরিদ্র মানুষ পানির জন্য আগে থেকেই অর্থ ব্যয় করছেন। অনেক ক্ষেত্রে নিরাপদ পানির সরাসরি সংযোগ না থাকায় তাঁদের প্রতিদিন পানি সংগ্রহ করতে সময় ও অর্থ দুটোই খরচ করতে হয়।

ডেমন বলেন, গ্যারি হোয়াইট মূলত অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের গ্রামীণ ব্যাংকের ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রমের ধারণাকে নতুন একটি খাতে প্রয়োগ করেন। প্রচলিত ক্ষুদ্রঋণের মতো আয় তৈরির উদ্দেশ্যে নয়, বরং মানুষের সময় ও অর্থ সাশ্রয়ের মাধ্যমে তাঁদের জীবনযাত্রার উন্নতি ঘটানোই ছিল এই উদ্যোগের লক্ষ্য।

ডেমনের ভাষায়, এটি শুধু আয় তৈরির ঋণ নয়, বরং মানুষের আয় ও কর্মক্ষমতা বাড়াতে সহায়ক ঋণ। নিরাপদ পানির সংযোগ পেলে মানুষকে আর প্রতিদিন পানি সংগ্রহের জন্য দীর্ঘ সময় ব্যয় করতে হয় না। ফলে সেই সময় কাজে, শিক্ষা বা পরিবারের জন্য ব্যবহার করা সম্ভব হয়।

কীভাবে কাজ করে WaterCredit মডেল

Water.org-এর অন্যতম উদ্যোগ WaterCredit। এই কর্মসূচির মাধ্যমে স্থানীয় আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও ক্ষুদ্রঋণ সংস্থাগুলোকে সহায়তা করা হয়, যাতে স্বল্প আয়ের পরিবারগুলো নিরাপদ পানির সংযোগ, পানির ট্যাংক, পাম্প ও টয়লেট নির্মাণের জন্য সহজ শর্তে ঋণ পেতে পারে।

এই ব্যবস্থায় Water.org সরাসরি প্রত্যেক পরিবারকে ঋণ দেয় না। বরং স্থানীয় আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা বাড়াতে অর্থায়ন ও প্রয়োজনীয় সহায়তা দেয়। ফলে পরিবারগুলো নিজেদের প্রয়োজন অনুযায়ী পানির ব্যবস্থা ও স্যানিটেশন সুবিধা গড়ে তুলতে পারে।

ম্যাট ডেমন জানান, এই ঋণ নেওয়া মানুষের বড় অংশ নারী। তাঁদের অনেকেই আগে প্রতিদিন পানি সংগ্রহ করতে গিয়ে কাজের সময় হারাতেন। নিরাপদ পানির ব্যবস্থা হওয়ার ফলে সেই সময় ফিরে পাওয়া সম্ভব হচ্ছে।

২০০৮ সালে গ্যারি হোয়াইটের সঙ্গে পরিচয়

ম্যাট ডেমন ২০০৬ সালে H2O Africa Foundation প্রতিষ্ঠা করেন। উন্নয়নশীল দেশগুলোতে নিরাপদ পানির অভাব এবং এর কারণে মানুষের জীবনযাত্রায় তৈরি হওয়া সংকট নিয়ে কাজ করছিলেন তিনি।

২০০৮ সালে নিউইয়র্কে ক্লিনটন গ্লোবাল ইনিশিয়েটিভের এক অনুষ্ঠানে প্রকৌশলী গ্যারি হোয়াইটের সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয়। পানি ও স্যানিটেশন খাতে গ্যারি হোয়াইটের দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা এবং ডেমনের সামাজিক উদ্যোগ একসঙ্গে কাজ করার সুযোগ তৈরি করে।

পরবর্তী সময়ে ২০০৯ সালে তাঁদের উদ্যোগ একীভূত হয়ে Water.org প্রতিষ্ঠিত হয়। সংস্থাটি বিশ্বের বিভিন্ন দেশে নিরাপদ পানি ও স্যানিটেশন সুবিধা সম্প্রসারণে কাজ করছে।

নিরাপদ পানির অভাবে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তি নারী ও শিশুদের

ম্যাট ডেমনের মতে, নিরাপদ পানির অভাব শুধু স্বাস্থ্যগত সমস্যা নয়, এটি শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের পথেও বাধা তৈরি করে।

অনেক দরিদ্র পরিবারের নারী ও মেয়েদের প্রতিদিন দীর্ঘ সময় পানি সংগ্রহে ব্যয় করতে হয়। এতে নারীদের কাজের সুযোগ কমে যায় এবং শিশুদের পড়াশোনাও ব্যাহত হয়।

ডেমন ও গ্যারি হোয়াইটের উদ্যোগের লক্ষ্য হলো, মানুষ যেন নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী অর্থায়নের সুযোগ পেয়ে বাড়িতেই নিরাপদ পানির ব্যবস্থা করতে পারে।

বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের ২০২১ সালের বিশ্ব পানি দিবস উপলক্ষে প্রকাশিত এক সাক্ষাৎকারেও ম্যাট ডেমন মুহাম্মদ ইউনূসের ক্ষুদ্রঋণ উদ্যোগের প্রসঙ্গ তুলে ধরেন। সেখানে তিনি বলেন, ইউনূসের পথ দেখানো ক্ষুদ্রঋণের ধারণাকে পানি খাতে প্রয়োগ করার মধ্যেই গ্যারি হোয়াইটের উদ্যোগের বিশেষত্ব রয়েছে।

বাংলাদেশের ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রমের এই আন্তর্জাতিক প্রভাবের উদাহরণ হিসেবে Water.org-এর WaterCredit কর্মসূচিকে দেখা হচ্ছে। অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের উদ্ভাবিত ক্ষুদ্রঋণের ধারণা কীভাবে ভিন্ন একটি সামাজিক সমস্যার সমাধানে কাজে লাগানো যায়, এই উদ্যোগ তার একটি উল্লেখযোগ্য দৃষ্টান্ত।