৪৫তম বিসিএসের গেজেটে বাদ ৫৬ প্রার্থী, ব্যাখ্যা ছাড়াই অনিশ্চয়তায়

ঢাকা, ১৭ অক্টোবর ২০২৬

৪৫তম বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস (বিসিএস) পরীক্ষায় চূড়ান্ত সুপারিশ পাওয়ার পরও নিয়োগের গেজেটে নাম না থাকায় অনিশ্চয়তায় পড়েছেন ৫৬ জন প্রার্থী। প্রায় ১১ মাস অপেক্ষার পর গত ১৪ অক্টোবর জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় ১ হাজার ৭০২ জনের নিয়োগ প্রজ্ঞাপন প্রকাশ করে। তবে সুপারিশপ্রাপ্তদের মধ্যে কারা কেন বাদ পড়েছেন, সে বিষয়ে গেজেটে নির্দিষ্ট ব্যাখ্যা না থাকায় প্রশ্ন তুলেছেন সংশ্লিষ্ট প্রার্থীরা।

বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশন (পিএসসি) ২০২৫ সালের ২৬ নভেম্বর ৪৫তম বিসিএসের চূড়ান্ত ফল প্রকাশ করে বিভিন্ন ক্যাডারে নিয়োগের জন্য ১ হাজার ৮০৭ জনকে সুপারিশ করেছিল। কিন্তু জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের প্রকাশিত গেজেটে তাঁদের মধ্যে ১ হাজার ৭০২ জনের নাম রয়েছে। অর্থাৎ, পিএসসির সুপারিশের তুলনায় ১০৫ জন কম প্রার্থীকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।

প্রার্থীদের নিজেদের মধ্যে যোগাযোগের ভিত্তিতে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, বাদ পড়া ১০৫ জনের মধ্যে একজনের সুপারিশ বাতিল করা হয়েছে এবং ৪৮ জন বাধ্যতামূলক স্বাস্থ্য পরীক্ষায় অংশ নেননি। বাকি ৫৬ জনের বাদ পড়ার কারণ নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে। তবে এই হিসাব সংশ্লিষ্ট প্রার্থীদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে এসেছে; প্রত্যেকের ক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা প্রকাশিত হয়নি।

ব্যাখ্যা ও পুনর্বিবেচনার দাবি

গেজেটে নাম না আসা প্রার্থীরা বলছেন, তাঁরা বিসিএস নিয়োগের প্রয়োজনীয় ধাপ পেরিয়ে পিএসসির চূড়ান্ত সুপারিশ পেয়েছিলেন। তাঁদের দাবি, কারও বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা না থাকা সত্ত্বেও নিয়োগের তালিকায় নাম না আসায় তাঁরা নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন। প্রার্থীদের কেউ কেউ আশঙ্কা করছেন, অতীতের রাজনৈতিক পরিচয় তাঁদের নিয়োগের ক্ষেত্রে প্রভাব ফেলতে পারে। তবে এই অভিযোগের পক্ষে কোনো চূড়ান্ত সরকারি প্রমাণ প্রকাশিত হয়নি।

১৬ অক্টোবর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজু স্মারক ভাস্কর্যের সামনে বিক্ষোভ করেন বাদ পড়া প্রার্থীদের একটি দল। একই দিন জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনেও মানববন্ধন করে তাঁরা সরকারের কাছে সংশোধিত নিয়োগ গেজেট প্রকাশের দাবি জানান। তাঁদের বক্তব্য, দীর্ঘদিনের প্রস্তুতি ও পরীক্ষার পর সুপারিশ পেয়েও নিয়োগ থেকে বাদ পড়ার কারণ না জানানো তাঁদের জন্য গভীর অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে।

আন্দোলনকারীরা ১৭ অক্টোবর সকাল ১০টার মধ্যে সিদ্ধান্ত জানানোর সময়সীমা বেঁধে দিয়েছিলেন। দাবি পূরণ না হলে শাহবাগে কঠোর কর্মসূচি পালনের হুঁশিয়ারিও দেন তাঁরা। সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে কয়েকজন প্রার্থীর আত্মহানির হুমকির কথাও উঠে এসেছে। এমন বক্তব্য তাঁদের হতাশার গভীরতা তুলে ধরলেও, সর্বশেষ পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে নির্ধারিত সময়সীমার পর সরকারের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত বা আন্দোলনের পরবর্তী পরিস্থিতি নিশ্চিত করা যায়নি।

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের অবস্থান কী

৪৫তম বিসিএসের গেজেট প্রকাশের বিষয়ে দ্য ডেইলি স্টারকে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, প্রচলিত প্রক্রিয়া অনুসরণ করেই নিয়োগ প্রজ্ঞাপন প্রকাশ করা হয়েছে। তবে বাদ পড়া ৫৬ জনের প্রত্যেকের বিষয়ে নির্দিষ্ট কারণ জানতে চাইলে পত্রিকাটি মন্ত্রণালয়ের কাছ থেকে স্পষ্ট ব্যাখ্যা পায়নি। ফলে তাঁদের নিয়োগের বিষয়ে পরবর্তী সিদ্ধান্ত কী হবে, তা এখনো অনিশ্চিত।

অন্যদিকে, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ আগে আশ্বাস দিয়েছিলেন, বিসিএসে নিয়োগের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে কাউকে বৈষম্যের শিকার হতে হবে না। তবে ৪৫তম বিসিএসে বাদ পড়া প্রার্থীদের অভিযোগের বিষয়ে তাঁর এই বক্তব্যের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কোনো নির্দিষ্ট সিদ্ধান্ত বা আনুষ্ঠানিক তদন্তের ফল এখনো পাওয়া যায়নি।

গেজেটে নিয়োগপ্রাপ্তদের যোগদানের সময়সীমা

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের ১৪ অক্টোবরের প্রজ্ঞাপনে ১ হাজার ৭০২ জনকে বিভিন্ন ক্যাডারে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তাঁদের মধ্যে প্রশাসন ক্যাডারে ২৬৬ জন, পুলিশ ক্যাডারে ৭১ জন এবং পররাষ্ট্র ক্যাডারে নয়জন রয়েছেন। নিয়োগপ্রাপ্তদের আগামী ১ নভেম্বর সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় বা বিভাগের নির্ধারিত কার্যালয়ে যোগ দিতে বলা হয়েছে।

প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, নির্ধারিত সময়ে যোগদান না করলে এবং এ বিষয়ে কর্তৃপক্ষের ভিন্ন নির্দেশনা না থাকলে সংশ্লিষ্ট প্রার্থীকে চাকরিতে যোগদানে অনিচ্ছুক হিসেবে বিবেচনা করা হবে। ফলে গেজেটে নাম পাওয়া প্রার্থীদের জন্য যোগদানের প্রস্তুতি শুরু হলেও বাদ পড়া ৫৬ জনের সামনে এখনো নিয়োগের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে।

স্বচ্ছ যাচাই ও দ্রুত সিদ্ধান্তের প্রশ্ন

বিসিএসের চূড়ান্ত সুপারিশের পর নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও পুলিশি যাচাইসহ প্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করতে হয়। তবে যাচাইয়ের কোনো ধাপে সমস্যা দেখা দিলে সংশ্লিষ্ট প্রার্থীকে কী কারণে নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে না, সে বিষয়ে স্পষ্ট তথ্য পাওয়া জরুরি। এতে প্রার্থীরা নিজেদের অবস্থান বুঝতে পারেন এবং প্রয়োজন হলে যথাযথভাবে বিষয়টি পুনর্বিবেচনার আবেদন করতে পারেন।

৪৫তম বিসিএসের ক্ষেত্রে মূল প্রশ্ন এখন শুধু বাদ পড়া প্রার্থীদের সংখ্যা নয়, বরং তাঁদের প্রত্যেকের বিষয়ে কী সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে এবং তার ভিত্তি কী। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় যদি প্রার্থীদের অবস্থান ও বাদ পড়ার কারণ স্পষ্ট করে, তাহলে অনিশ্চয়তা কমতে পারে। আপাতত সংশ্লিষ্ট ৫৬ প্রার্থী নিয়োগের বিষয়ে সরকারের পরবর্তী পদক্ষেপের অপেক্ষায় রয়েছেন।