দেশের ১০টি রাজনৈতিক দলে পরিবারকেন্দ্রিক নেতৃত্বের চর্চা রয়েছে এবং অধিকাংশ দলের সিদ্ধান্ত গ্রহণ ব্যক্তিনির্ভর বলে জানিয়েছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। সংস্থাটির নতুন এক গবেষণায় রাজনৈতিক দলগুলোর অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র, নেতৃত্ব নির্বাচন, প্রার্থী মনোনয়ন, অর্থায়ন ও জবাবদিহিতে নানা ঘাটতির চিত্র উঠে এসেছে।
রোববার (১ নভেম্বর) রাজধানীর ধানমন্ডিতে টিআইবির কার্যালয়ে ‘বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলের প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসন’ শীর্ষক গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়। সংবাদ সম্মেলনে গবেষণার বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান। প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন টিআইবির গবেষক মো. জুলকারনাইন, কাওছার আহমেদ ও কাজী আমিনুল হাসান।
গবেষণায় পরিবারকেন্দ্রিক নেতৃত্বের চর্চা রয়েছে এমন ১০টি দলের মধ্যে রয়েছে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জাতীয় পার্টি, জাকের পার্টি, বাংলাদেশ মুসলিম লীগ, ন্যাশনাল পিপলস পার্টি (এনপিপি), বাংলাদেশ ন্যাপ, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টি (জাগপা) ও বাংলাদেশ জাস্টিস পার্টি।
টিআইবির তথ্য অনুযায়ী, ১২টি রাজনৈতিক দলের প্রধান ১০ বছর বা তার বেশি সময় ধরে একই পদে রয়েছেন বা ছিলেন। তাঁদের মধ্যে সাতজনের নেতৃত্বের মেয়াদ ২০ বছরের বেশি। গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি) ছাড়া অন্য কোনো দলের গঠনতন্ত্রে একজন ব্যক্তি কতবার বা কত মেয়াদে দলীয় প্রধান থাকতে পারবেন, তার নির্দিষ্ট সীমা উল্লেখ নেই।
নেতৃত্ব নির্বাচনের ক্ষেত্রেও গণতান্ত্রিক চর্চার ঘাটতি পেয়েছে সংস্থাটি। অধিকাংশ দল কাউন্সিলের মাধ্যমে দলীয় প্রধান নির্বাচন করার কথা বললেও গোপন ব্যালটের পরিবর্তে কণ্ঠভোটে নেতৃত্ব নির্বাচন করে। শীর্ষ পদে একাধিক প্রার্থীর প্রতিদ্বন্দ্বিতার নজিরও খুব সীমিত। গবেষণায় সিপিবি ও আমার বাংলাদেশ পার্টি (এবি পার্টি) ছাড়া অন্য দলগুলোতে শীর্ষ নেতৃত্ব নির্বাচনে একাধিক প্রতিদ্বন্দ্বী পাওয়ার তথ্য পাওয়া যায়নি।
কাউন্সিলের নিয়মিত আয়োজন নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে টিআইবি। গবেষণায় দেখা গেছে, ১৬টি দলের জাতীয় কাউন্সিল অনিয়মিত। এসব কাউন্সিলে অনেক সময় আগে থেকে নির্ধারিত সিদ্ধান্ত অনুমোদন করা হয়। দলের নীতি ও কৌশল নির্ধারণে তৃণমূলের নেতা-কর্মীদের মতামত দেওয়ার সুযোগও সীমিত। গঠনতন্ত্রে বিভিন্ন কমিটির মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নেওয়ার বিধান থাকলেও বাস্তবে অধিকাংশ দলের সিদ্ধান্ত দলীয় প্রধান বা কয়েকজন শীর্ষ নেতার ওপর নির্ভরশীল।
প্রার্থী মনোনয়নের ক্ষেত্রেও দলীয় প্রধানের মতামতকে বেশি গুরুত্ব দেওয়ার চিত্র পেয়েছে সংস্থাটি। গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও), ১৯৭২ অনুযায়ী, নির্বাচনী এলাকার স্থানীয় কমিটির প্রস্তাবিত প্যানেল বিবেচনা করে কেন্দ্রীয় সংসদীয় বোর্ডের প্রার্থী চূড়ান্ত করার কথা। তবে অধিকাংশ দল এ নিয়ম যথাযথভাবে অনুসরণ করে না বলে গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে। প্রার্থীর যোগ্যতা ও অযোগ্যতার সুস্পষ্ট শর্তও অনেক দলের গঠনতন্ত্রে নেই।
টিআইবির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রার্থী বাছাইয়ে জনপ্রিয়তা ও সাংগঠনিক অভিজ্ঞতার পাশাপাশি দলীয় প্রধানের প্রতি আনুগত্য, অর্থ এবং পেশিশক্তি প্রভাব বিস্তার করে। প্রভাবশালী তিনটি রাজনৈতিক দলে মনোনয়ন-বাণিজ্যের অভিযোগও পেয়েছে সংস্থাটি। তবে এসব অভিযোগকে সংশ্লিষ্ট দলগুলোর বিরুদ্ধে আদালতে প্রমাণিত অপরাধ হিসেবে দেখানো হয়নি।
রাজনৈতিক দলগুলোর অর্থায়ন ও আয়-ব্যয়ের হিসাবেও বড় ধরনের অসংগতি রয়েছে বলে গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে। টিআইবির প্রাক্কলন অনুযায়ী, একটি রাজনৈতিক দলের সাংগঠনিক কার্যক্রম ইউনিয়ন পর্যায় পর্যন্ত বিস্তৃত হলে বছরে ৩০২ থেকে ৩৯৩ কোটি টাকা ব্যয় হতে পারে। আর ওয়ার্ড পর্যায় পর্যন্ত পূর্ণাঙ্গ কার্যক্রম পরিচালনা করলে সম্ভাব্য বার্ষিক ব্যয় দাঁড়াতে পারে ১ হাজার ৫৩২ কোটি থেকে ২ হাজার ১৮৮ কোটি টাকা। এসব হিসাব নির্বাচনী ব্যয় বাদ দিয়ে সাংগঠনিক কার্যক্রমের সম্ভাব্য ব্যয়ের মডেল থেকে তৈরি করা হয়েছে; কোনো দলের প্রকৃত ব্যয়ের নিরীক্ষিত হিসাব নয়।
অন্যদিকে, সদস্যদের চাঁদা থেকে সম্ভাব্য আয় এই ব্যয়ের তুলনায় অনেক কম। টিআইবির হিসাবে, ওয়ার্ড পর্যায় পর্যন্ত কার্যক্রম বিস্তৃত থাকলে সদস্যদের চাঁদা থেকে বছরে সম্ভাব্য আয় প্রায় ১১৬ কোটি টাকা। সংস্থাটির পর্যবেক্ষণ, রাজনৈতিক দলগুলোর অনেকেরই সুস্পষ্ট আর্থিক নীতিমালা, বার্ষিক বাজেট এবং অর্থ লেনদেন ও নিরীক্ষার কার্যকর নিয়ম নেই। স্থানীয় পর্যায়ে ব্যক্তিগতভাবে সংগৃহীত অর্থের অনেক তথ্য কেন্দ্রীয় হিসাবেও অন্তর্ভুক্ত হয় না।
নির্বাচনী প্রার্থীদের পেশাগত পরিচয় নিয়েও গবেষণায় তথ্য দেওয়া হয়েছে। টিআইবির হিসাবে, ২০২৬ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রার্থীদের ৪৮ দশমিক ৫ শতাংশ ছিলেন ব্যবসায়ী এবং নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের ৫৯ দশমিক ৯ শতাংশ ব্যবসায়ী। ২০২৪ সালের নির্বাচনে এই হার ছিল যথাক্রমে ৫৭ দশমিক ৬ ও ৬৫ দশমিক ৩ শতাংশ। গবেষণায় রাজনৈতিক অর্থায়নে ব্যবসায়ী ও বিত্তশালীদের প্রভাব এবং দলগুলোর ওপর তাঁদের নির্ভরশীলতার বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে।
নারীর রাজনৈতিক অংশগ্রহণেও ঘাটতি পেয়েছে টিআইবি। সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, ৩২টি দলের মধ্যে মাত্র দুটি দলের কেন্দ্রীয় কমিটিতে নারী সদস্যের হার ৩৩ শতাংশ বা তার বেশি। জামায়াতে ইসলামী ও বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের কেন্দ্রীয় কমিটিতে কোনো নারী সদস্য নেই। ২০২৬ সালের নির্বাচনে নারী প্রার্থীর অংশগ্রহণও ছিল সীমিত। মোট ২ হাজার ২৮ জন প্রার্থীর মধ্যে নারী ছিলেন ৮৩ জন, যা প্রায় ৪ দশমিক ০৯ শতাংশ।
দলগুলোর জবাবদিহি ও শৃঙ্খলা ব্যবস্থার ঘাটতিও প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়েছে। টিআইবির পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মীদের জন্য স্বতন্ত্র আচরণবিধি নেই। তাঁদের বিরুদ্ধে সাধারণ নাগরিকদের অভিযোগ জানানোর কার্যকর ব্যবস্থাও অধিকাংশ দলে অনুপস্থিত। শৃঙ্খলাভঙ্গের ঘটনায় তদন্ত, শাস্তি ও আপিলের প্রক্রিয়াও অনেক ক্ষেত্রে স্পষ্ট নয়।
গবেষণার আওতায় ৪২টি রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিল টিআইবি। এর মধ্যে ৩৭টি নিবন্ধিত ও পাঁচটি অনিবন্ধিত দল। তবে তথ্য দিয়েছে ৩২টি দল। গবেষণায় ২০০৮ সালে রাজনৈতিক দলের নিবন্ধন কার্যক্রম শুরুর পর থেকে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত তথ্য পর্যালোচনা করা হয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে ২০২৬ সালের আগস্ট পর্যন্ত হালনাগাদ তথ্যও ব্যবহার করা হয়েছে।
রাজনৈতিক দলগুলোর প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসন নিশ্চিত করতে ১২টি সুপারিশ করেছে টিআইবি। এর মধ্যে রয়েছে দলীয় নেতৃত্ব নির্বাচনে নিয়মিত কাউন্সিল আয়োজন ও গোপন ব্যালট চালু, দলীয় প্রধানসহ গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালনের মেয়াদ নির্ধারণ, আর্থিক হিসাব প্রকাশ ও স্বাধীন নিরীক্ষা নিশ্চিত করা এবং নির্বাচন কমিশনের তদারকি বাড়ানো।
এ ছাড়া রাজনৈতিক দলগুলোকে তথ্য অধিকার আইনের আওতায় আনা, তৃণমূলের অংশগ্রহণ বাড়ানো, নেতৃত্ব ও প্রার্থী মনোনয়নে নারী এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা এবং অনিয়মে জড়িত নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করেছে সংস্থাটি।
টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামানের মতে, রাজনৈতিক দলগুলো গণতন্ত্রের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান হলেও স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও অভ্যন্তরীণ গণতান্ত্রিক চর্চার ঘাটতি তাদের কার্যক্রমকে প্রভাবিত করছে। এসব সমস্যা কাটাতে রাজনৈতিক দলগুলোকেই নিজেদের ভেতরে সংস্কারের উদ্যোগ নিতে হবে বলে মনে করে সংস্থাটি।
