ঢাকার দ্রুত নগরায়ণ ও ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার চাপ সামলাতে বিচ্ছিন্নভাবে নয়, সমন্বিতভাবে নগর উন্নয়নের পরিকল্পনা করার তাগিদ এসেছে। আবাসন, পরিবহন, ড্রেনেজ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও নির্মাণ নিরাপত্তাকে একই পরিকল্পনার আওতায় আনার ওপর জোর দিয়েছেন নীতিনির্ধারক, নগর পরিকল্পনাবিদ ও প্রকৌশলীরা।
বুধবার ঢাকার একটি হোটেলে বণিক বার্তা আয়োজিত Smart City Conclave 2026-এ এসব বিষয় উঠে আসে। অনুষ্ঠানে আবাসন, নির্মাণ, টেকসই নগরায়ণ, নগর অবকাঠামো ও অর্থায়ন নিয়ে আলোচনা করেন সরকারের প্রতিনিধি, রাজউক, প্রকৌশলী, নগর পরিকল্পনাবিদ ও বেসরকারি খাতের প্রতিনিধিরা।
গৃহায়ণ ও গণপূর্তমন্ত্রী জাকারিয়া তাহের জানান, সরকার শহর ও নগর এলাকায় পরিকল্পিত উন্নয়নের জন্য প্রায় ১০ বছর মেয়াদি একটি উদ্যোগ নিয়েছে। প্রথমে দেশের মহানগরগুলোতে মাস্টারপ্ল্যান ও জোনিংয়ের কাজ হবে; পরে তা বড় শহর এবং পর্যায়ক্রমে উপজেলা পর্যায়েও সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে।
মন্ত্রী বলেন, কোথায় কী ধরনের স্থাপনা বা উন্নয়ন হবে, তা জোনিংয়ের মাধ্যমে নির্ধারণ করা হবে। একই সঙ্গে অনুমোদিত নকশা ছাড়া নির্মিত ভবন কিংবা অনুমোদিত নকশার বাইরে নির্মাণ করা ভবনের বিষয়ে নতুন বিধিমালা তৈরির কাজ চলছে। এই বিধিমালার খসড়া শিগগিরই মন্ত্রিসভায় তোলা হতে পারে বলেও জানান তিনি।
রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মো. রিয়াজুল ইসলাম বলেন, ঢাকার নগর সমস্যাগুলো আলাদা আলাদাভাবে সমাধান করা সম্ভব নয়। জনসংখ্যা, আবাসন, পরিবহন, স্বাস্থ্য, পয়োনিষ্কাশন ও গণপরিবহন—এসব খাত বিভিন্ন কর্তৃপক্ষের অধীনে থাকায় সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
ঢাকার প্রকৃত জনসংখ্যা নিয়েও পরিকল্পনার ক্ষেত্রে অনিশ্চয়তার কথা তুলে ধরেন রাজউক চেয়ারম্যান। তাঁর মতে, রাজধানীতে প্রতিদিন মানুষ আসছে এবং নতুন নতুন বস্তি গড়ে উঠছে। ফলে শহরটি বাস্তবে কত মানুষকে ধারণ করতে পারবে, সেই হিসাব ছাড়া ভবিষ্যৎ নগর পরিকল্পনা করা কঠিন।
আবাসন খাতেও বড় চাপের বিষয়টি আলোচনায় এসেছে। ডিবিএইচ ফাইন্যান্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা নাসিমুল বাতেনের তথ্য অনুযায়ী, ঢাকার প্রায় ৭০ শতাংশ বাসিন্দা ভাড়ায় থাকেন। নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের জন্য সাশ্রয়ী আবাসনের সুযোগ বাড়াতে সরকারি জমি সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বে ব্যবহারের পাশাপাশি লক্ষ্যভিত্তিক সুদ ভর্তুকি ও পুনঃঅর্থায়ন ব্যবস্থার প্রস্তাব দেন তিনি।
নগর পরিকল্পনাবিদ অধ্যাপক আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, স্বাধীনতার পর ঢাকাসহ চট্টগ্রাম, রাজশাহী ও খুলনার জন্য একাধিক মাস্টারপ্ল্যান, স্ট্রাকচার প্ল্যান ও ডিটেইলড এরিয়া প্ল্যান তৈরি হলেও অনেক ক্ষেত্রে সেগুলো কার্যকর হয়নি। পরিকল্পনা বাস্তবায়নের দুর্বলতা এবং বিভিন্ন চাপের কারণে অনুমোদিত পরিকল্পনা থেকে বিচ্যুতি ঘটেছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
নির্মাণ নিরাপত্তার বিষয়টিও আলোচনায় গুরুত্ব পেয়েছে। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. ইশতিয়াক আহমেদ বলেন, ভালো নির্মাণ বিধিমালা থাকলেও নির্মাণকাজের সময় কার্যকর তদারকি না থাকলে ভবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায় না। দেশে নির্মাণকাজের মান তদারকিতে আরও কার্যকর ব্যবস্থা প্রয়োজন বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
সরকার ভবন অনুমোদনের প্রক্রিয়াতেও পরিবর্তন আনতে চায়। মন্ত্রী জানিয়েছেন, শুধু স্থাপত্য নকশার পরিবর্তে ভবনের কাঠামোগত ও বৈদ্যুতিক নকশাসহ প্রয়োজনীয় নকশা একসঙ্গে অনুমোদনের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। নির্মাণ শেষে ভবন যথাযথভাবে নির্মিত হয়েছে কি না, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট নকশা প্রণয়নকারীদের প্রত্যয়ন নেওয়ার পরিকল্পনাও রয়েছে।
দেশের অন্যান্য শহরেও পরিকল্পিত নগরায়ণ নিশ্চিত করতে নতুন উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ গঠনের কথা জানিয়েছে সরকার। গত সাত মাসে ময়মনসিংহ, সিলেট, কুমিল্লা, নারায়ণগঞ্জ, রংপুর ও বরিশালের জন্য ছয়টি নতুন উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ গঠন করা হয়েছে। বগুড়াতেও এমন কর্তৃপক্ষ গঠনের কাজ চলছে।
আলোচনায় টেকসই ও সবুজ আবাসনের বিষয়টিও উঠে আসে। সংশ্লিষ্টরা বলেন, পরিবেশবান্ধব আবাসনকে শুধু ব্যয়বহুল বা বিলাসী ব্যবস্থা হিসেবে না দেখে সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে আনার বিষয়টি বিবেচনায় রাখতে হবে। স্থানীয় বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ সবুজ নির্মাণ মানদণ্ড তৈরির প্রয়োজনীয়তার কথাও বলা হয়।
নগর উন্নয়নের সঙ্গে জ্বালানি পরিকল্পনাকেও যুক্ত করার প্রস্তাব এসেছে সম্মেলনে। নতুন আবাসিক ও নগর এলাকায় উন্নয়নকাজ শুরুর আগেই জ্বালানি অবকাঠামোর পরিকল্পনা করার ওপর জোর দেন ইস্ট কোস্ট গ্রুপের চেয়ারম্যান আজম জে চৌধুরী।
সব মিলিয়ে ঢাকার ভবিষ্যৎ নগর ব্যবস্থাপনায় শুধু নতুন অবকাঠামো নির্মাণ নয়, বিদ্যমান পরিকল্পনার বাস্তবায়ন, ভূমির সঠিক ব্যবহার, সাশ্রয়ী আবাসন, নাগরিক সেবার সমন্বয় এবং নির্মাণ নিরাপত্তাকে একই কাঠামোর মধ্যে আনার প্রয়োজনীয়তা সামনে এসেছে। সরকারের প্রস্তাবিত দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবে কতটা কার্যকর হয়, এখন সেটিই মূল বিষয়।
