মাসের শুরুতে বেতন বা আয় হাতে আসার পরই শুরু হয় সংসারের হিসাব। বাজারসদাই, বাসাভাড়া, বিদ্যুৎ ও গ্যাস বিল, যাতায়াত, সন্তানের পড়াশোনা এবং চিকিৎসার খরচ মেটাতে গিয়ে অনেক পরিবারের বাজেট এলোমেলো হয়ে যায়। এর সঙ্গে হঠাৎ কোনো প্রয়োজন দেখা দিলে বাড়ে আর্থিক চাপ। তাই আয় অনুযায়ী ব্যয়ের পরিকল্পনা করা এবং প্রতিটি খরচের হিসাব রাখা পরিবারের অর্থ ব্যবস্থাপনায় গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) খানার আয় ও ব্যয় জরিপ ২০২২ অনুযায়ী, পরিবারের ভোগব্যয়ের বড় অংশজুড়ে রয়েছে খাদ্য এবং বাসস্থানসংক্রান্ত ব্যয়। তবে পরিবারের সদস্যসংখ্যা, বসবাসের স্থান, আয় ও জীবনযাপনের ধরন অনুযায়ী খরচের পরিমাণে পার্থক্য হয়।
১. নিত্যপণ্যের বাজার খরচ
পরিবারের নিয়মিত ব্যয়ের অন্যতম বড় অংশ খাবার ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য কেনা। চাল, ডাল, তেল, মাছ, মাংস, ডিম, সবজি এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় পণ্যের দাম ও কেনার পরিমাণের ওপর মাসিক বাজেট অনেকটাই নির্ভর করে।
খরচ সামলাতে সপ্তাহের খাবারের তালিকা তৈরি করা, কেনার আগে প্রয়োজনীয় পণ্যের তালিকা করা এবং বাজারদর তুলনা করার অভ্যাস কাজে আসতে পারে। প্রয়োজনের তুলনায় বেশি পণ্য কিনে নষ্ট করা থেকেও বিরত থাকা জরুরি।
২. বাসাভাড়া ও ইউটিলিটি বিল
বিশেষ করে শহরের পরিবারগুলোর জন্য বাসাভাড়া বড় একটি নিয়মিত ব্যয়। এর সঙ্গে বিদ্যুৎ, গ্যাস, পানি এবং ইন্টারনেটের বিল যুক্ত হয়। এসব খরচ সাধারণত এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ কম থাকায় মাসের শুরুতেই সম্ভাব্য বিলের টাকা আলাদা করে রাখা ভালো।
অপ্রয়োজনে বাতি ও বৈদ্যুতিক যন্ত্র চালু না রাখা, পানির অপচয় কমানো এবং ব্যবহার না করা সেবার বিল পর্যালোচনা করলে কিছু অর্থ সাশ্রয় হতে পারে।
৩. যাতায়াতের খরচ
কর্মস্থলে যাওয়া, সন্তানের স্কুলে যাতায়াত এবং দৈনন্দিন প্রয়োজন মেটাতে পরিবহন খরচ হয়। প্রতিদিনের ছোট ছোট ব্যয় মাস শেষে বড় অঙ্কে পরিণত হতে পারে।
সম্ভব হলে যাতায়াতের রুট আগে থেকে পরিকল্পনা করা, একই পথে একাধিক কাজ সেরে নেওয়া এবং সামর্থ্য ও সুবিধা অনুযায়ী গণপরিবহন ব্যবহার করা যেতে পারে। তবে সময়, নিরাপত্তা ও যাতায়াতের বাস্তব সুবিধাও বিবেচনায় রাখতে হবে।
৪. শিক্ষা ও চিকিৎসার ব্যয়
সন্তানের স্কুলের বেতন, বই, খাতা, পোশাক ও অন্যান্য শিক্ষা উপকরণের খরচ অনেক সময় নির্দিষ্ট মাসে বেড়ে যায়। একইভাবে চিকিৎসকের পরামর্শ, পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও ওষুধের জন্যও অতিরিক্ত অর্থ প্রয়োজন হতে পারে।
এসব খরচের সম্ভাব্য সময় ও পরিমাণ আগে থেকে হিসাব করে রাখা ভালো। নিয়মিত চিকিৎসা বা শিক্ষাসংক্রান্ত প্রয়োজনীয় ব্যয় কমিয়ে সঞ্চয় করার চেষ্টা না করে অপ্রয়োজনীয় খরচের জায়গাগুলো খুঁজে দেখা বেশি যুক্তিসংগত।
৫. ছোট ছোট অপ্রয়োজনীয় খরচ
প্রতিদিনের বাইরে খাওয়া, প্রয়োজন না থাকা সত্ত্বেও অনলাইনে কেনাকাটা, ঘন ঘন খাবার অর্ডার এবং বিভিন্ন সাবস্ক্রিপশনের খরচ অনেক সময় নজর এড়িয়ে যায়।
এ ধরনের খরচের জন্য আলাদা সীমা নির্ধারণ করা যেতে পারে। কোনো কিছু কেনার আগে সেটি এখনই প্রয়োজন কি না, ঘরে একই ধরনের পণ্য আছে কি না এবং কেনার পর মাসের বাকি খরচ মেটানো সম্ভব হবে কি না, তা ভেবে দেখা উচিত।
৬. ঋণের কিস্তি ও সুদের খরচ
ব্যাংকঋণ, ব্যক্তিগত ঋণ কিংবা অন্যান্য কিস্তির দায় থাকলে মাসিক বাজেটে সেগুলোকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। নির্ধারিত সময়ে কিস্তি পরিশোধের জন্য অর্থ আলাদা না রাখলে অতিরিক্ত চার্জ বা সুদের চাপ বাড়তে পারে।
একাধিক ঋণ থাকলে প্রতিটির বকেয়া, সুদের হার ও পরিশোধের তারিখ লিখে রাখা দরকার। নতুন ঋণ নেওয়ার আগে নিয়মিত আয় থেকে কিস্তি পরিশোধের সক্ষমতা যাচাই করাও জরুরি।
৭. জরুরি প্রয়োজন ও সঞ্চয়
হঠাৎ অসুস্থতা, চাকরি বা আয়ের পরিবর্তন, বাসার মেরামত কিংবা পারিবারিক প্রয়োজনে অতিরিক্ত অর্থ লাগতে পারে। এসব পরিস্থিতির জন্য আলাদা জরুরি তহবিল না থাকলে দৈনন্দিন খরচের বাজেট ভেঙে যেতে পারে।
আয় থেকে সম্ভব হলে প্রতি মাসে নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা সঞ্চয়ের জন্য আলাদা রাখুন। আয় কম হলে অল্প টাকা দিয়ে শুরু করলেও নিয়মিত সঞ্চয়ের অভ্যাস তৈরি করা যায়। তবে জরুরি প্রয়োজনের অর্থ এমন জায়গায় রাখা উচিত, যেখান থেকে প্রয়োজনের সময় তা পাওয়া সম্ভব।
কীভাবে তৈরি করবেন মাসিক বাজেট?
পরিবারের বাজেট তৈরির জন্য কয়েকটি সহজ পদক্ষেপ অনুসরণ করা যেতে পারে।
প্রথমত, মোট আয় হিসাব করুন। বেতন, ব্যবসা বা অন্য নির্ভরযোগ্য উৎস থেকে মাসে কত টাকা আসে, তা লিখে রাখুন।
দ্বিতীয়ত, প্রয়োজনীয় খরচ আলাদা করুন। বাসাভাড়া, খাবার, বিল, যাতায়াত, শিক্ষা, চিকিৎসা ও ঋণের কিস্তির হিসাব করুন।
তৃতীয়ত, ব্যয়ের সীমা নির্ধারণ করুন। কোন খাতে কত টাকা ব্যয় করা যাবে, তা আয় ও পরিবারের বাস্তব প্রয়োজন অনুযায়ী ঠিক করুন।
চতুর্থত, প্রতিদিনের খরচ লিখুন। মোবাইলের নোট, খাতা বা স্প্রেডশিটে খরচের হিসাব রাখুন। এতে কোথায় বেশি টাকা ব্যয় হচ্ছে, তা বোঝা সহজ হবে।
পঞ্চমত, মাস শেষে হিসাব মিলিয়ে দেখুন। পরিকল্পিত ব্যয়ের সঙ্গে প্রকৃত ব্যয় তুলনা করে পরের মাসের বাজেট প্রয়োজন অনুযায়ী পরিবর্তন করুন।
শেষ কথা
পরিবারের মাসিক বাজেট সামলানোর অর্থ শুধু খরচ কমানো নয়, বরং প্রয়োজন অনুযায়ী টাকার ব্যবহার নিশ্চিত করা। সবার আয় ও পারিবারিক দায়িত্ব এক নয়, তাই একটি নির্দিষ্ট বাজেট পদ্ধতি সব পরিবারের জন্য সমানভাবে কার্যকর হবে না।
আয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে প্রয়োজনীয় খরচকে অগ্রাধিকার দেওয়া, অপ্রয়োজনীয় কেনাকাটা নিয়ন্ত্রণ করা এবং সামর্থ্য অনুযায়ী সঞ্চয় করাই হতে পারে আর্থিক চাপ সামলানোর বাস্তবসম্মত উপায়। নিয়মিত হিসাব রাখার অভ্যাস গড়ে তুললে মাসের শেষে টাকার ঘাটতি কোথায় হচ্ছে, তা শনাক্ত করা এবং পরবর্তী মাসের পরিকল্পনা করা সহজ হয়।

