জার্মানির ফ্রাঙ্কফুর্ট শহরে শুরু হয়েছে ৭৮তম ফ্রাঙ্কফুর্ট আন্তর্জাতিক বইমেলা। মঙ্গলবার সন্ধ্যায় আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনের পর বুধবার, ৭ অক্টোবর থেকে শুরু হয়েছে মূল মেলা। আগামী ১১ অক্টোবর পর্যন্ত চলবে এই আয়োজন। আন্তর্জাতিক প্রকাশনা, অনুবাদ, কপিরাইট, সাহিত্য ও সৃজনশীল শিল্পের অন্যতম বড় এই মেলায় অংশ নিচ্ছে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের প্রকাশক, লেখক, এজেন্ট ও বই ব্যবসায়ীরা।
ফ্রাঙ্কফুর্ট বইমেলার অফিসিয়াল প্রদর্শক তালিকায় এবারের আসরে ৪ হাজার ১৩১টি প্রদর্শক নিবন্ধিত রয়েছে। একই প্ল্যাটফর্মে ৩ হাজার ৬০০টির বেশি অনুষ্ঠানও তালিকাভুক্ত আছে। প্রথম আলোর প্রতিবেদনে অংশগ্রহণকারী দেশের সংখ্যা প্রায় ১৩০ বলা হয়েছে।
এবারের সম্মানিত অতিথি দেশ চেকিয়া। তাদের আয়োজনের মূল থিম “Czechia: A Country on the Coast”। শেক্সপিয়ারের The Winter’s Tale থেকে অনুপ্রাণিত এই ধারণার মাধ্যমে চেক সাহিত্যের বৈচিত্র্য, কল্পনা ও সমকালীন সাংস্কৃতিক পরিচয় তুলে ধরা হচ্ছে।
চেকিয়ার অতিথি প্যাভিলিয়নের আয়তন প্রায় ২ হাজার ৩০০ বর্গমিটার। সেখানে ইন্টারেকটিভ ইনস্টলেশন, ‘poetic lighthouse’, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক সাহিত্য উপস্থাপন এবং রোবটের মাধ্যমে লাইভ কমিক আঁকার মতো আয়োজন রাখা হয়েছে। বইমেলায় অংশ নিতে চেকিয়া থেকে ৭৫ জন লেখক ফ্রাঙ্কফুর্টে যাচ্ছেন।
তবে উদ্বোধনী অনুষ্ঠান শুধু সাহিত্যিক আয়োজনেই সীমাবদ্ধ ছিল না। চেক সংস্কৃতিমন্ত্রী ওতো ক্লেমপিরের বক্তব্যের সময় দর্শকদের একাংশ প্রতিবাদ ও কটূক্তি করেন। পরে চেক লেখক রাদকা ডেনেমারকোভা বক্তব্য দিলে তাকে দাঁড়িয়ে অভিবাদন জানায় উপস্থিত দর্শকরা।
ডেনেমারকোভা বক্তব্যে সংস্কৃতি, রাজনীতি এবং স্বাধীন সাহিত্যচর্চার সম্পর্ক নিয়ে কথা বলেন। তিনি মনে করিয়ে দেন, রাজনৈতিক ক্ষমতা বদলালেও সাহিত্য ও স্বাধীন চিন্তার গুরুত্ব থেকে যায়। তার বক্তব্যে ইউরোপে উগ্র ডানপন্থার উত্থান এবং সংস্কৃতিতে রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ নিয়েও উদ্বেগ উঠে আসে।
এবারের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানটি আরও একটি কারণে তাৎপর্যপূর্ণ। ফ্রাঙ্কফুর্ট বইমেলার দীর্ঘদিনের পরিচালক ইউর্গেন বুস বিদায়ের আগে শেষবারের মতো প্রতীকীভাবে মেলার উদ্বোধন করেন। প্রায় দুই দশক ধরে তিনি এই আন্তর্জাতিক বইমেলার নেতৃত্ব দিয়েছেন।
ফ্রাঙ্কফুর্ট বইমেলা শুধু বই প্রদর্শনের আয়োজন নয়। এখানে প্রকাশনা স্বত্ব কেনাবেচা, অনুবাদ চুক্তি, আন্তর্জাতিক প্রকাশনা অংশীদারিত্ব, ডিজিটাল প্রকাশনা, অডিওবুক, চলচ্চিত্র, গেমস এবং প্রযুক্তি খাতের সঙ্গে প্রকাশনা শিল্পের নতুন সহযোগিতা তৈরি হয়। তাই প্রকাশনা ব্যবসার জন্য এটি বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক প্ল্যাটফর্মগুলোর একটি।
এবারও শিশুতোষ বই, কথাসাহিত্য, নন-ফিকশন, শিক্ষা, বিজ্ঞান, ডিজিটাল কনটেন্ট এবং সৃজনশীল শিল্পের বিভিন্ন খাত নিয়ে আলাদা আলাদা অনুষ্ঠান থাকছে। চীনের যৌথ স্ট্যান্ডেই শতাধিক প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান ২ হাজার ৭০০ ধরনের বই নিয়ে অংশ নিচ্ছে, যা মেলার আন্তর্জাতিক ব্যাপ্তির একটি উদাহরণ।
ফ্রাঙ্কফুর্টের বইকেন্দ্রিক ঐতিহ্য কয়েক শতাব্দী পুরোনো। আধুনিক বইমেলার যাত্রা শুরু হয় ১৯৪৯ সালে। সে সময় ফ্রাঙ্কফুর্টের পাউল গির্জায় ২০৫টি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান ৮৪৪টি বই নিয়ে প্রদর্শনীতে অংশ নিয়েছিল। সেই ছোট আয়োজনই পরে বিশ্বের সবচেয়ে বড় প্রকাশনা বাণিজ্য মেলায় রূপ নেয়।
আজ ফ্রাঙ্কফুর্ট বইমেলা আন্তর্জাতিক প্রকাশনা জগতের পাশাপাশি নতুন চিন্তা, অনুবাদ, প্রযুক্তি এবং সাংস্কৃতিক বিনিময়েরও বড় মঞ্চ। আগামী ১১ অক্টোবর পর্যন্ত এই মেলা চলবে। শেষ দিনে ২০২৬ সালের সম্মানিত অতিথি চেকিয়ার কাছ থেকে ২০২৭ সালের অতিথি দেশ চিলির কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব হস্তান্তরের কথা রয়েছে।
