পাকিস্তানি টেলিভিশন নাটক ‘দার-এ-নিজাত’-এর একটি চরিত্র নিয়ে বাংলাদেশের দর্শকদের মধ্যে বেশ আগ্রহ তৈরি হয়েছে। নাটকটিতে আবু বকর চরিত্রে অভিনয় করেছেন পাকিস্তানি অভিনেতা শেহেরিয়ার মুনওয়ার। শান্ত স্বভাব, ধৈর্য, সহমর্মিতা এবং ভালোবাসার মানুষের প্রতি যত্নশীল আচরণের কারণে চরিত্রটি দর্শকদের কাছে বিশেষভাবে পছন্দের হয়ে উঠেছে। শুধু পাকিস্তান নয়, বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশের দর্শকেরাও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আবু বকরকে নিয়ে নিজেদের ভালো লাগার কথা জানাচ্ছেন।

গত ১ আগস্ট ২০২৬ থেকে পাকিস্তানের টেলিভিশন চ্যানেল এআরওয়াই ডিজিটালে প্রচার শুরু হয় ‘দার-এ-নিজাত’। উমেরা আহমেদের লেখা নাটকটি পরিচালনা করেছেন সাকিব খান। এতে শেহেরিয়ার মুনওয়ারের বিপরীতে জারিয়াব চরিত্রে অভিনয় করেছেন দুরে ফিশান সেলিম। এ ছাড়া নামির নেওয়াজ খানসহ আরও কয়েকজন অভিনয়শিল্পী রয়েছেন।

আবু বকরের কোন গুণে মুগ্ধ দর্শকেরা?

নাটকে আবু বকরকে দেখানো হয়েছে একজন শান্ত, দায়িত্বশীল ও সংবেদনশীল মানুষ হিসেবে। অন্যের কথা মনোযোগ দিয়ে শোনা, ছোট ছোট বিষয় মনে রাখা, মতের অমিল হলেও ধৈর্য ধরে কথা বলা এবং সম্পর্কের ক্ষেত্রে সম্মান বজায় রাখার মতো বৈশিষ্ট্য তার চরিত্রকে আলাদা করেছে।

প্রিয় মানুষের পছন্দ মনে রাখা কিংবা ক্লান্তির দিনে খোঁজ নেওয়ার মতো সাধারণ আচরণও আবু বকরের চরিত্রে বিশেষভাবে ফুটে উঠেছে। দর্শকদের অনেকের কাছে এসব বিষয়ই তাকে প্রচলিত রোমান্টিক নায়কের চেয়ে আলাদা করে তুলেছে।

বাংলাদেশের ইংরেজি দৈনিক দ্য ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেসের ৪ নভেম্বর প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে কয়েকজন দর্শকের অভিজ্ঞতা ও মতামত তুলে ধরা হয়েছে। সেখানে রাহেলা আহমেদ নামে এক দর্শক আবু বকরের ধৈর্যকে তার সবচেয়ে আকর্ষণীয় গুণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

অন্যদিকে বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া সাদিয়া জাহানের মতে, বাস্তব জীবনে এমন মানুষ খুব বেশি দেখা যায় না। তাই চরিত্রটির প্রতি দর্শকদের ভালো লাগার পেছনে কিছুটা কল্পনারও ভূমিকা রয়েছে।

বাংলাদেশেও ছড়িয়েছে আবু বকরকে নিয়ে আলোচনা

বাংলাদেশের দর্শকদের মধ্যে চরিত্রটির জনপ্রিয়তার বিষয়টি নিয়ে জাগো নিউজ ২৪-এর ইংরেজি সংস্করণেও প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেক বাংলাদেশি দর্শক আবু বকরকে নিয়ে নিজেদের প্রতিক্রিয়া জানাচ্ছেন।

নাটকের বিভিন্ন দৃশ্য, ছবি ও ভক্তদের তৈরি ভিডিও সম্পাদনা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ছে। বিশেষ করে আবু বকর ও জারিয়াবের সম্পর্কের মুহূর্তগুলো দর্শকদের আলোচনায় বেশি জায়গা পাচ্ছে।

দ্য ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেসের প্রতিবেদনে নুসরাত জাহান নামে এক দর্শক মজা করে বলেছেন, এত দিন তিনি শাহরুখ খানের ভক্ত ছিলেন, এখন আবু বকরও তাঁর পছন্দের তালিকায় জায়গা করে নিয়েছেন।

আবু বকরকে নিখুঁত মানুষ মনে করেন না অভিনেতা নিজেও

দর্শকদের কাছে আবু বকর আদর্শ জীবনসঙ্গীর প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠলেও চরিত্রটিকে পুরোপুরি নিখুঁত মনে করেন না অভিনেতা শেহেরিয়ার মুনওয়ার। বিবিসি এশিয়ান নেটওয়ার্কের উপস্থাপক হারুন রশিদের সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে তিনি আবু বকরের কিছু দুর্বলতার কথা তুলে ধরেছেন।

অভিনেতার মতে, আবু বকর একজন ‘পিপল প্লিজার’। অর্থাৎ অন্যকে খুশি রাখতে গিয়ে অনেক সময় নিজের প্রয়োজন ও ইচ্ছাকে গুরুত্ব দিতে পারেন না। পাশাপাশি তার মধ্যে ‘সেভিয়ার কমপ্লেক্স’ বা অন্যের সমস্যা সমাধানের অতিরিক্ত দায়িত্ব নিজের কাঁধে নেওয়ার প্রবণতাও রয়েছে।

শেহেরিয়ার জানান, মায়ের কাছ থেকে পাওয়া শিক্ষা ও পারিবারিক পরিবেশ আবু বকরের ব্যক্তিত্ব গঠনে বড় ভূমিকা রেখেছে। অন্যের জন্য সব সময় ভালো কিছু করার চেষ্টা করতে গিয়ে চরিত্রটি নিজের ওপরও চাপ তৈরি করে।

২৯ অক্টোবর পাকিস্তানের সংবাদমাধ্যম ডন-এর বিনোদনবিষয়ক প্ল্যাটফর্ম ইমেজে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনেও অভিনেতার এই বক্তব্য তুলে ধরা হয়।

নাটকের গল্পেও রয়েছে সম্পর্ক ও মূল্যবোধের টানাপোড়েন

‘দার-এ-নিজাত’ শুধু প্রেমের গল্প নয়। এতে পারিবারিক সম্পর্ক, বিশ্বাস, ক্ষমা, আত্মত্যাগ, সামাজিক অবস্থান এবং ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তের প্রভাব তুলে ধরা হয়েছে।

নাটকের কেন্দ্রীয় চরিত্র আবু বকর ও জারিয়াবের সম্পর্কের মধ্য দিয়ে মানুষের মানসিকতা ও সম্পর্কের জটিলতা দেখানো হয়েছে। জারিয়াবের অতীত অভিজ্ঞতা, ব্যক্তিগত পছন্দ এবং আবু বকরের ধৈর্যশীল আচরণ গল্পকে এগিয়ে নিয়ে যায়।

নাটকের একটি দৃশ্যে জারিয়াবের মন খারাপের কারণ বুঝতে পেরে আবু বকর ক্ষমা চায়। দৃশ্যটি অভিনেতা শেহেরিয়ার মুনওয়ারের নিজেরও পছন্দের বলে জানিয়েছেন। ২১ অক্টোবর নিজের ইনস্টাগ্রাম স্টোরিতে দৃশ্যটির সম্পাদিত ভিডিও শেয়ার করে তিনি চরিত্রটির পরিণত আচরণের প্রশংসা করেন।

পর্দার চরিত্র ছাড়িয়ে বাস্তব সম্পর্কের আলোচনায় আবু বকর

আবু বকরকে ঘিরে দর্শকদের আগ্রহের পেছনে শুধু অভিনয় বা নাটকের গল্প নয়, সম্পর্কের ক্ষেত্রে মানুষের প্রত্যাশার বিষয়টিও উঠে আসছে। অনেক দর্শক চরিত্রটির মধ্যে এমন কিছু আচরণ দেখতে পাচ্ছেন, যা তাঁরা বাস্তব জীবনেও প্রত্যাশা করেন।

তবে নাটকের চরিত্রকে বাস্তব মানুষের সঙ্গে পুরোপুরি মেলানো যায় না। আবু বকরও গল্পের প্রয়োজনে তৈরি একটি চরিত্র, যার ভালো দিকের পাশাপাশি সীমাবদ্ধতাও রয়েছে।

শেহেরিয়ার মুনওয়ারের অভিনয় এবং উমেরা আহমেদের চরিত্র নির্মাণ মিলিয়ে আবু বকর এখন ‘দার-এ-নিজাত’-এর অন্যতম আলোচিত নাম। বাংলাদেশের দর্শকদের মধ্যেও চরিত্রটি নিয়ে আগ্রহ বাড়ছে, যা দেশের বাইরের টেলিভিশন নাটক কীভাবে অনলাইন প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে বাংলাদেশের দর্শকদের কাছে পৌঁছে যাচ্ছে, তারও একটি উদাহরণ।