শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত শিশুদের পাশে দাঁড়ানো, নিরক্ষরতা দূর করা এবং মেধাবী শিক্ষার্থীদের বিকাশে দেশজুড়ে কাজ করতে চান এমএইচ গ্লোবাল গ্রুপের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা গোলাম মর্তুজা সিআইপি। ডা. মোস্তফা-হাজেরা ফাউন্ডেশনের পাঁচ শূন্য প্রকল্পের আওতায় বৃত্তি কার্যক্রমকে সামাজিক আন্দোলনে পরিণত করার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন তিনি। তাঁর লক্ষ্য, ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এ উদ্যোগ ছড়িয়ে দিয়ে সুবিধাবঞ্চিত শিক্ষার্থীদের শিক্ষার সুযোগ তৈরি করা।

সম্প্রতি রাজধানীর রাজারবাগ পুলিশ লাইন স্কুল অ্যান্ড কলেজে ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে আয়োজিত বৃত্তি পরীক্ষা উপলক্ষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে এসব কথা বলেন গোলাম মর্তুজা। তিনি জানান, আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বিভিন্ন দেশে কাজ করার অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা ও সামাজিক উন্নয়নের ধারণাগুলো বাংলাদেশেও বাস্তবায়ন করতে চান তাঁরা।

গোলাম মর্তুজা বলেন, পাঁচ শূন্য প্রকল্প নিয়ে তাঁরা শুধু বাংলাদেশে নয়, বিশ্বের বিভিন্ন দেশেও কাজ করছেন। এই উদ্যোগের অন্যতম লক্ষ্য নিরক্ষরতা দূর করা। বৃত্তি পরীক্ষার মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা নিজেদের মেধা ও যোগ্যতা প্রমাণের সুযোগ পাবে। একই সঙ্গে শিক্ষার প্রতি আগ্রহ বাড়বে এবং সমাজে ইতিবাচক প্রতিযোগিতার পরিবেশ তৈরি হবে বলে তাঁদের প্রত্যাশা।

তিনি বলেন, 'আমরা চেষ্টা করছি এটাকে একটা সামাজিক স্পিরিট হিসেবে সারা বাংলাদেশে ছড়িয়ে দিতে। আমরা চাই, আমাদের ছাত্রছাত্রীরা এগিয়ে আসবে এবং প্রতিযোগিতার মাধ্যমে নিজেদের মেধা ও যোগ্যতার পরিচয় দেবে।'

ঢাকায় প্রথমবার বৃত্তি পরীক্ষা আয়োজন

গোলাম মর্তুজা জানান, অতীতে কয়েকবার ঢাকায় বৃত্তি পরীক্ষা আয়োজনের উদ্যোগ নেওয়া হলেও প্রয়োজনীয় সহযোগিতা ও সুযোগ-সুবিধার অভাবে তা বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি। এবার প্রথমবারের মতো রাজধানীতে এ কার্যক্রম আয়োজন করতে পেরে তাঁরা সন্তুষ্ট।

এ উদ্যোগ বাস্তবায়নে দুটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নিজেদের প্রাঙ্গণ ব্যবহারের সুযোগ দিয়ে সহযোগিতা করেছে বলে জানান তিনি। এর মধ্যে রাজারবাগ পুলিশ লাইন স্কুল অ্যান্ড কলেজের ভূমিকার কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করেন।

শুক্রবার ছুটির দিনেও প্রতিষ্ঠানের একজন শিক্ষিকা নিজের পারিবারিক সময়ের অংশ ব্যয় করে স্কুলে উপস্থিত থেকে কার্যক্রম পরিচালনায় সহযোগিতা করেছেন বলে জানান গোলাম মর্তুজা। তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে তিনি বলেন, ডা. মোস্তফা-হাজেরা ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকে ওই শিক্ষিকাকে আন্তরিক ধন্যবাদ ও শুভেচ্ছা জানাচ্ছেন তাঁরা।

গোলাম মর্তুজা বলেন, একটি সামাজিক উদ্যোগ সফল করতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, শিক্ষক, অভিভাবক ও স্থানীয় মানুষের সহযোগিতা অত্যন্ত প্রয়োজন। ঢাকায় এবার যে সহযোগিতা পাওয়া গেছে, তা ভবিষ্যতে আরও বড় পরিসরে কাজ করার অনুপ্রেরণা জোগাবে।

ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে পড়বে কার্যক্রম

বৃত্তি প্রকল্পের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা তুলে ধরে তিনি বলেন, আগামী দিনে ঢাকা শহরের বিভিন্ন এলাকায় এ কার্যক্রম সম্প্রসারণ করতে চান তাঁরা। পর্যায়ক্রমে দেশের অন্যান্য অঞ্চলেও বৃত্তি পরীক্ষা ও শিক্ষা সহায়তা কার্যক্রম নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।

বিশেষ করে আর্থিক সংকটের কারণে যেসব শিশু নিয়মিত পড়াশোনার সুযোগ পায় না, তাদের পাশে দাঁড়াতে চান তাঁরা। দরিদ্র, অসহায় ও সুবিধাবঞ্চিত শিক্ষার্থীদের শিক্ষার আলোয় এগিয়ে নেওয়াই ফাউন্ডেশনের অন্যতম উদ্দেশ্য।

শিক্ষার গুরুত্ব তুলে ধরে গোলাম মর্তুজা বলেন, মানুষের সঙ্গে অন্যান্য প্রাণীর মৌলিক পার্থক্যের অন্যতম বিষয় শিক্ষা। শিক্ষার মাধ্যমেই মানুষ নিজের চিন্তা, বিবেক ও যোগ্যতার বিকাশ ঘটাতে পারে। তাই শিক্ষাকে সমাজ পরিবর্তনের প্রধান হাতিয়ার হিসেবে কাজে লাগাতে চান তাঁরা।

তাঁর ভাষায়, শিক্ষার মাধ্যমে সমাজকে আলোকিত করাই তাঁদের প্রত্যাশা।

পাঁচ শূন্য প্রকল্পে যে লক্ষ্য

ডা. মোস্তফা-হাজেরা ফাউন্ডেশনের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, Five Zero Campaign বা পাঁচ শূন্য প্রকল্পের আওতায় নিরক্ষরতা, বেকারত্ব, গৃহহীনতা, ভিক্ষাবৃত্তি এবং চিকিৎসার অভাবে মৃত্যু প্রতিরোধের মতো সামাজিক সমস্যাগুলো মোকাবিলার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

প্রকল্পটির মাধ্যমে শিক্ষা, কর্মসংস্থান, বাসস্থান ও স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রে পিছিয়ে থাকা মানুষের জন্য সহযোগিতামূলক কার্যক্রম পরিচালনার কথা জানিয়েছে ফাউন্ডেশন। তবে এসব লক্ষ্য বাস্তবায়নে অঞ্চলভিত্তিক পরিকল্পনা, অর্থায়ন ও কার্যক্রমের পরিধি পর্যায়ক্রমে নির্ধারণ করা হবে বলে সংশ্লিষ্ট উদ্যোগের বক্তব্যে উঠে এসেছে।

গোলাম মর্তুজার মতে, শুধু আর্থিক সহায়তা দিয়ে সামাজিক সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। মানুষের মধ্যে সচেতনতা তৈরি এবং নিজেদের সক্ষমতা বিকাশের সুযোগ তৈরি করাও জরুরি। এ কারণেই বৃত্তি পরীক্ষাকে বৃহত্তর সামাজিক উদ্যোগের অংশ হিসেবে দেখছেন তাঁরা।

দেশের প্রতি দায়বদ্ধতার কথা জানালেন গোলাম মর্তুজা

আন্তর্জাতিক ব্যবসায়িক কার্যক্রমের পাশাপাশি বাংলাদেশের মানুষের জন্য কাজ করার আগ্রহের কথাও তুলে ধরেন গোলাম মর্তুজা।

তিনি বলেন, পেশাগত প্রয়োজনে মানুষ বিশ্বের যেকোনো দেশে কাজ করতে পারে। কিন্তু নিজের জন্মভূমির প্রতি দায়িত্ব ও দায়বদ্ধতা কখনো ভুলে যাওয়া উচিত নয়।

গোলাম মর্তুজার ভাষায়, 'আমরা মনে করি, এই মাটি থেকে আমাদের জন্ম। এই মাটির প্রতি আমাদের দায়বদ্ধতা সবচেয়ে বেশি। আমরা পেশা, চাকরি কিংবা নিজেদের প্রয়োজনে যেকোনো জায়গায় কাজ করতে পারি। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আমাদের নিজের জায়গায় ফিরে আসতে হবে। নিজেদের ঐতিহ্য, জন্ম ও জন্মস্থানকে অবহেলা করার কোনো সুযোগ নেই।'

তিনি আরও জানান, যুক্তরাজ্যের অর্থনীতিতে তাঁদের ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের উল্লেখযোগ্য অবদান রয়েছে। তাঁর দাবি, তাঁদের কোম্পানি ব্রিটিশ অর্থনীতিতে ৬৩০ মিলিয়ন পাউন্ডের বেশি অবদান রেখেছে। একই সঙ্গে বাংলাদেশের অর্থনীতিতেও তাঁরা কাজ করছেন।

তবে এই অর্থনৈতিক অবদানের হিসাব কোন সময়কাল ও কোন পদ্ধতিতে নির্ধারণ করা হয়েছে, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য তিনি বক্তব্যে তুলে ধরেননি।

বিশ্বজুড়ে মানবিক সহযোগিতার প্রত্যাশা

নিজেদের উদ্যোগের মূল দর্শন তুলে ধরে গোলাম মর্তুজা বলেন, তাঁরা যেখানেই থাকুন না কেন, মানুষের সহযোগিতায় কাজ করতে চান। ব্যবসায়িক সাফল্যের পাশাপাশি শিক্ষা ও মানবিক কার্যক্রমের মাধ্যমে মানুষের জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন আনাই তাঁদের উদ্দেশ্য।

তিনি বলেন, আল্লাহ মানুষকে মানুষের কল্যাণে কাজ করার সুযোগ দিয়েছেন। সেই দায়িত্ববোধ থেকেই বিভিন্ন দেশে সামাজিক ও মানবিক কার্যক্রম পরিচালনার চেষ্টা করছেন তাঁরা।

গোলাম মর্তুজার প্রত্যাশা, ডা. মোস্তফা-হাজেরা ফাউন্ডেশনের বৃত্তি কার্যক্রম শুধু একটি নির্দিষ্ট এলাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও সমাজের মানুষের সম্মিলিত অংশগ্রহণে এটি একসময় দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়বে।

তাঁদের এই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে আর্থিকভাবে পিছিয়ে থাকা আরও বেশি শিক্ষার্থী শিক্ষার সুযোগ পাবে বলে আশা করছেন আয়োজকেরা।