অস্ত্র হাতে মাদকবিরোধী অভিযানে প্রতিমন্ত্রী, আইনভঙ্গের অভিযোগ খতিয়ে দেখছে পুলিশ
নিজস্ব প্রতিবেদক | ঢাকা
রাজধানীর গেণ্ডারিয়ায় মাদকবিরোধী অভিযানে আগ্নেয়াস্ত্র হাতে অংশ নেওয়ার ভিডিও প্রকাশের পর মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ও ঢাকা-৬ আসনের সংসদ সদস্য ইশরাক হোসেনের কর্মকাণ্ড তদন্ত করছে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি)। ঘটনার বিষয়ে প্রতিবেদন দিতে ওয়ারী বিভাগের উপকমিশনারকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তদন্তে আইনের কোনো ব্যত্যয় পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
গত ১৭ অক্টোবর গেণ্ডারিয়া রেলস্টেশনসংলগ্ন দয়াগঞ্জ এলাকায় অভিযান চালানোর ভিডিও নিজের ফেসবুক পেজে প্রকাশ করেন ইশরাক। ভিডিওতে তাঁকে এক হাতে মাইক ও অন্য হাতে আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে কয়েকজনকে ধাওয়া করতে দেখা যায়। তাঁর সঙ্গে থাকা আরেক ব্যক্তির হাতেও অস্ত্র দেখা যায়। ভিডিওটির কিছু অংশে অস্ত্র ঝাপসা করা থাকায় শুধু ফুটেজ দেখে সেটির ধরন নিশ্চিত করা যায়নি।
তদন্তের নির্দেশ দিয়েছে ডিএমপি
১৮ অক্টোবর ডিএমপি মিডিয়া সেন্টারে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় গোয়েন্দা বিভাগের অতিরিক্ত কমিশনার মো. শফিকুল ইসলাম জানান, ঘটনাটি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। ওয়ারী বিভাগের উপকমিশনারকে পুরো বিষয়টি খতিয়ে দেখে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে। আইনের ব্যত্যয় পাওয়া গেলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।
অভিযানের সময় একজন প্রতিমন্ত্রী পুলিশের দায়িত্ব পালন করতে পারেন কি না, সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নে ডিবিপ্রধান সরাসরি কোনো মন্তব্য করেননি। ফলে অভিযান পরিচালনায় প্রতিমন্ত্রীর ভূমিকা এবং অস্ত্র বহন বা প্রদর্শনের আইনি দিকগুলো তদন্তের পর্যালোচনায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
ছয়জনকে পুলিশের কাছে হস্তান্তর
গেণ্ডারিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মনিরুজ্জামান মনিরের ভাষ্য অনুযায়ী, অভিযানের সময় ছয়জনকে আটক করা হয়। পরে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে তাঁদের থানায় নিয়ে আসে। আটক ব্যক্তিদের কাছ থেকে সাদা গুঁড়ার মতো একটি পদার্থ পাওয়ার কথা জানিয়েছে পুলিশ। তবে সেটি মাদক, বিশেষ করে হেরোইন কি না, তা পরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিত করতে হবে।
ঘটনার আগে পুলিশকে অভিযান সম্পর্কে জানানো হয়েছিল কি না, তা নিয়েও বিভিন্ন বক্তব্য পাওয়া গেছে। পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, অভিযান সম্পর্কে আগে থেকে জানানো হয়নি; পরে তারা বিষয়টি জানতে পারে। অন্যদিকে, প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গে থাকা এক ব্যক্তি দাবি করেছেন, পুলিশকে জানানো হয়েছিল, তবে তাদের পৌঁছাতে সময় লেগেছে। এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো তদন্তের ফল এখনো প্রকাশিত হয়নি।
আত্মরক্ষার কথা বলেছেন প্রতিমন্ত্রী
১৮ অক্টোবর নিজের বক্তব্যে ইশরাক হোসেন বলেন, অভিযানের সময় তাঁর ও নিরাপত্তাকর্মীদের দিকে ৩০ থেকে ৩৫ জন এগিয়ে এসেছিলেন এবং পরিস্থিতি হুমকিমূলক হয়ে উঠেছিল। তাঁর দাবি, আত্মরক্ষার জন্য তিনি নিজের বৈধ লাইসেন্স করা আগ্নেয়াস্ত্র বের করেছিলেন। অস্ত্র দিয়ে কাউকে ভয় দেখানো বা গুলি করার কথা অস্বীকার করেন তিনি।
প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, এলাকায় মাদক বিক্রি নিয়ে স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগের পর তিনি একাধিকবার পুলিশের সঙ্গে বৈঠক করেছিলেন। কার্যকর পদক্ষেপ না পাওয়ার অভিযোগ তুলে তিনি নিজেই অভিযানে অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন বলে জানান। তবে পুলিশি নিষ্ক্রিয়তার অভিযোগ নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্যও রয়েছে। গেণ্ডারিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জানিয়েছেন, এর আগে ওই এলাকায় বিপুলসংখ্যক পুলিশ সদস্য নিয়ে অভিযান চালানো হয়েছিল।
অস্ত্রের লাইসেন্স থাকলেই কি প্রকাশ্যে ব্যবহার করা যায়?
আগ্নেয়াস্ত্রের বৈধ লাইসেন্স থাকা এবং সেটি প্রকাশ্যে কীভাবে বহন বা প্রদর্শন করা যাবে, দুটি আলাদা আইনি বিষয়। এ ঘটনায় অস্ত্রটি বৈধভাবে নিবন্ধিত কি না, কী পরিস্থিতিতে সেটি বের করা হয়েছিল এবং সংশ্লিষ্ট আচরণে আইন লঙ্ঘিত হয়েছে কি না, তা তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করতে হবে। কেবল ভিডিও দেখে অস্ত্রের ব্যবহারকে বৈধ বা অবৈধ ঘোষণা করা যায় না।
ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর একজন জনপ্রতিনিধির আইন প্রয়োগকারী সংস্থার ভূমিকা নেওয়া এবং জনসমক্ষে অস্ত্র প্রদর্শনের যথার্থতা নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। তবে তদন্ত শেষ হওয়ার আগে প্রতিমন্ত্রী বা অভিযানে অংশ নেওয়া অন্য কারও বিরুদ্ধে অপরাধ সংঘটিত হওয়ার চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক হবে না।
এখন ডিএমপির তদন্ত প্রতিবেদনের অপেক্ষা। তদন্তে কী তথ্য উঠে আসে এবং অস্ত্র বহন, প্রদর্শন ও অভিযান পরিচালনার ক্ষেত্রে কোনো আইনি ব্যত্যয় পাওয়া যায় কি না, তার ওপরই পরবর্তী পদক্ষেপ নির্ভর করবে।




