সিটি করপোরেশন এলাকায় ব্যাটারিচালিত তিন চাকার রিকশা বা ই-রিকশা চলাচল নিয়ন্ত্রণে নতুন বিধিমালা জারি করেছে সরকার। নতুন নিয়ম অনুযায়ী, নিবন্ধন ও ফিটনেস সনদ ছাড়া কোনো ই-রিকশা সড়কে চলতে পারবে না। একজন ব্যক্তি নিজের জাতীয় পরিচয়পত্রের (এনআইডি) বিপরীতে সর্বোচ্চ পাঁচটি ই-রিকশা নিবন্ধন করতে পারবেন।

গত ২৯ অক্টোবর স্থানীয় সরকার বিভাগের জারি করা ‘সিটি করপোরেশন এলাকায় তিন চাকার স্বল্পগতির ব্যাটারিচালিত রিকশা চলাচল বিধিমালা, ২০২৬’ দেশের সব সিটি করপোরেশন এলাকায় কার্যকর হবে। রোববার (১ নভেম্বর) সচিবালয়ে সংবাদ সম্মেলনে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম জানান, সোমবার (২ নভেম্বর) থেকে দেশের ১৩টি সিটি করপোরেশনে ই-রিকশার নিবন্ধন কার্যক্রম শুরু করার পরিকল্পনা রয়েছে।

নতুন বিধিমালা অনুযায়ী, দুই যাত্রী ধারণক্ষমতার ই-রিকশার এককালীন নিবন্ধন ফি আট হাজার টাকা এবং চার যাত্রী ধারণক্ষমতার ই-রিকশার জন্য ১০ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। বার্ষিক নবায়ন ফি যথাক্রমে চার হাজার ও পাঁচ হাজার টাকা। ফিটনেস সনদের জন্য ফি এক হাজার টাকা। নিবন্ধন সনদের মেয়াদ হবে পাঁচ বছর। তবে নিবন্ধনের তারিখ থেকে ই-রিকশার অর্থনৈতিক আয়ুষ্কাল নির্ধারণ করা হয়েছে ১২ বছর। এই সময়সীমা শেষ হলে সংশ্লিষ্ট যানটির নিবন্ধন ও নম্বরপ্লেট বাতিল করতে হবে।

একটি জাতীয় পরিচয়পত্রের বিপরীতে এক বা একাধিক সিটি করপোরেশন থেকে সর্বোচ্চ পাঁচটি ই-রিকশা নিবন্ধন নেওয়া যাবে। তবে এক সিটি করপোরেশনে নিবন্ধিত ই-রিকশা অন্য সিটি করপোরেশন এলাকায় বাণিজ্যিকভাবে চালানো যাবে না। নিবন্ধনের জন্য নির্ধারিত আবেদনপত্রের সঙ্গে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও ফি জমা দিতে হবে। কর্তৃপক্ষ আবেদন পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় যাচাই শেষে ৩০ কর্মদিবসের মধ্যে নিবন্ধন দেওয়ার বিধান রাখা হয়েছে। আবেদন বাতিল হলে সাত কর্মদিবসের মধ্যে কারণ জানাতে হবে। সিদ্ধান্তে সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি ১০ কর্মদিবসের মধ্যে আপিল করতে পারবেন।

ই-রিকশার কাঠামো ও নিরাপত্তার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) নির্ধারিত প্রযুক্তিগত মান অনুসরণ করতে হবে। আগে থেকে চলাচল করা ই-রিকশাগুলোকেও প্রয়োজনীয় পরিবর্তন করে নির্ধারিত মানের আওতায় আনতে হবে। নিবন্ধনের পাশাপাশি ফিটনেস সনদ এবং সংশ্লিষ্ট ট্রাফিক বিভাগের প্রতিস্বাক্ষর বাধ্যতামূলক। প্রতিটি নিবন্ধিত ই-রিকশায় কিউআর কোডযুক্ত স্বতন্ত্র নম্বরপ্লেট দৃশ্যমান স্থানে রাখতে হবে। যানবাহনে স্পিডোমিটার অথবা ওডোমিটারও থাকতে হবে।

নতুন বিধিমালায় ই-রিকশার গতিসীমা নির্ধারণ করা হয়েছে ঘণ্টায় সর্বোচ্চ ২৫ কিলোমিটার। তবে স্কুল, হাসপাতাল, ধর্মীয় উপাসনালয় ও জনবহুল এলাকায় ঘণ্টায় ১৫ কিলোমিটারের বেশি গতিতে চলা যাবে না। যানবাহনের ধারণক্ষমতা অনুযায়ী চালক ছাড়া সর্বোচ্চ দুই বা চারজন যাত্রী বহন করা যাবে। যাত্রীর হাতে বহনযোগ্য ব্যক্তিগত মালামাল ছাড়া অন্য বাণিজ্যিক পণ্য পরিবহন নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

চলাচলের এলাকা নিয়ন্ত্রণে সিটি করপোরেশন ও ট্রাফিক বিভাগ যৌথভাবে নির্দিষ্ট রুট ও জোন নির্ধারণ করবে। এক জোনে চলাচলের অনুমতি পাওয়া ই-রিকশা অন্য জোনে যেতে পারবে না। ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন এলাকায় আটটি জোন করার পরিকল্পনা রয়েছে। প্রতিটি জোনের ই-রিকশার জন্য আলাদা রং নির্ধারণ করা হবে, যাতে কোন যান কোন এলাকায় চলাচলের অনুমতি পেয়েছে, তা সহজে শনাক্ত করা যায়। প্রতিটি জোনে কতটি ই-রিকশা চলবে, সেটিও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ঠিক করবে।

জাতীয় মহাসড়ক, এক্সপ্রেসওয়ে, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে, প্রধান বাস রুট, বাস র‍্যাপিড ট্রানজিট (বিআরটি) করিডর এবং ফুটপাতে ই-রিকশা চলাচল নিষিদ্ধ করা হয়েছে। চালকদের সড়কের বাম পাশের লেন অনুসরণ করতে হবে। নিয়মবহির্ভূত ওভারটেকিং, হঠাৎ লেন পরিবর্তন, চলন্ত অবস্থায় মোবাইল ফোন ব্যবহার এবং ৪০ ডেসিবেলের বেশি শব্দের হর্ন ব্যবহার করা যাবে না। ট্রাফিক সিগন্যাল অমান্য, অতিরিক্ত যাত্রী বহন ও বিপজ্জনকভাবে যান চালানোর ক্ষেত্রেও প্রচলিত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার বিধান রয়েছে।

চালকদের জন্য প্রথম পর্যায়ে পরিচয়পত্র দেওয়ার ব্যবস্থা করা হবে। পরে পর্যায়ক্রমে ড্রাইভিং লাইসেন্স চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। চালকদের ট্রাফিক আইন, সড়ক নিরাপত্তা, যানবাহন ও ব্যাটারি রক্ষণাবেক্ষণ বিষয়ে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থাও করতে পারবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।

ব্যাটারি চার্জিংয়ের ক্ষেত্রেও নতুন নিয়ম করা হয়েছে। অনুমোদিত চার্জিং পয়েন্ট বা সিটি করপোরেশনের লাইসেন্সপ্রাপ্ত গ্যারেজ ছাড়া অন্য কোথাও ই-রিকশার ব্যাটারি চার্জ করা যাবে না। চার্জিং স্টেশনে সৌরবিদ্যুৎ ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহারে উৎসাহ দেওয়া হয়েছে। অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগ ব্যবহার করে ব্যাটারি চার্জ করলে প্রচলিত আইনে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

পুরোনো বা অকার্যকর ব্যাটারি খোলা জায়গা, মাটি, জলাশয় কিংবা সাধারণ বর্জ্যের সঙ্গে ফেলা যাবে না। এসব ব্যাটারি পোড়ানোও নিষিদ্ধ। নতুন ব্যাটারি বিক্রির সময় বিক্রেতাকে পুরোনো ব্যাটারি ফেরত নেওয়ার বিধান রাখা হয়েছে। পরে সেগুলো অনুমোদিত পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্রে পাঠাতে হবে। ই-রিকশার উৎপাদন ও প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রমও নিয়ন্ত্রণের আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে।

বিধিমালায় দুর্ঘটনার পর চালকের দায়িত্বও নির্ধারণ করা হয়েছে। দুর্ঘটনা ঘটলে চালককে গাড়ি থামিয়ে আহত ব্যক্তিকে সহায়তা করতে এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানাতে হবে। দুর্ঘটনার পর পালিয়ে যাওয়া শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হবে। পাশাপাশি যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দিলে যানটি চলাচল বন্ধ রেখে মেরামতের ব্যবস্থা করতে হবে।

ই-রিকশার মালিক ও চালকদের জন্য ঋণ সুবিধা এবং চার্জিং অবকাঠামো তৈরিতে সরকারি-বেসরকারি বিনিয়োগের সুযোগ রাখার কথাও বিধিমালায় উল্লেখ রয়েছে। অন্যদিকে, ই-রিকশার ভাড়া কিলোমিটারপ্রতি নির্ধারণের পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন প্রতিমন্ত্রী। তবে এ বিষয়ে এখনো নির্দিষ্ট ভাড়া ঘোষণা করা হয়নি।

সরকারের লক্ষ্য, নিবন্ধন, ফিটনেস পরীক্ষা, নির্দিষ্ট রুট ও গতিসীমার মাধ্যমে সিটি করপোরেশন এলাকায় ই-রিকশা চলাচলে শৃঙ্খলা আনা। তবে বিদ্যমান বিপুলসংখ্যক ই-রিকশাকে নতুন নিয়মের আওতায় আনা এবং মালিক-চালকদের জন্য নিবন্ধন প্রক্রিয়া বাস্তবায়ন করাই হবে পরবর্তী বড় চ্যালেঞ্জ।