মহাকাশ থেকে পৃথিবীকে দেখলে কোনো দেশ, জাতি কিংবা মানুষের মধ্যে বিভাজন চোখে পড়ে না। দেখা যায় শুধু একটি অপূর্ব সুন্দর গ্রহ, যেখানে সবাই একসঙ্গে বসবাস করছে। দীর্ঘ আট মাস মহাকাশে কাটিয়ে পৃথিবীতে ফিরে এমন অনুভূতির কথা জানিয়েছেন ফরাসি নভোচারী সোফি আদেনো।
শনিবার (১০ অক্টোবর) জার্মানির কোলনে ইউরোপীয় মহাকাশ সংস্থার প্রশিক্ষণকেন্দ্রে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তিনি তাঁর মহাকাশযাত্রার অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন।
আদেনো বলেন, পৃথিবী থেকে প্রায় ৪০০ কিলোমিটার ওপরে আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনে অবস্থানকালে তিনি পৃথিবীকে সম্পূর্ণ ভিন্নভাবে দেখার সুযোগ পেয়েছেন।
সেখান থেকে কোনো রাজনৈতিক বিভাজন কিংবা ভৌগোলিক সীমান্ত চোখে পড়ে না। বরং পৃথিবীকে মনে হয় একটি মূল্যবান গ্রহ, যা পুরো মানবজাতির অভিন্ন আবাসস্থল।
মহাকাশে থাকার অভিজ্ঞতা বর্ণনা করতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন ৪৪ বছর বয়সী এই নভোচারী। তিনি জানান, দীর্ঘ মহাকাশযাত্রায় আনন্দ থেকে শুরু করে কঠিন পরিস্থিতি পর্যন্ত নানা ধরনের মানবিক অনুভূতির মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে তাঁকে।
ইউরোপীয় মহাকাশ সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, গত ১৩ ফেব্রুয়ারি স্পেসএক্সের ক্রু-১২ অভিযানের সদস্য হিসেবে আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনের উদ্দেশে যাত্রা করেন সোফি আদেনো।
মহাকাশে মোট ২৩৭ দিন অবস্থান শেষে ৮ অক্টোবর যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া উপকূলে প্রশান্ত মহাসাগরে অবতরণ করেন তিনি ও তাঁর সহযাত্রীরা।
এই অভিযানের মাধ্যমে একজন ইউরোপীয় নভোচারীর একটানা মহাকাশে অবস্থানের নতুন রেকর্ড গড়েছেন আদেনো।
অভিযানে তাঁর সঙ্গে ছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসার নভোচারী জেসিকা মেয়ার ও জ্যাক হ্যাথাওয়ে এবং রাশিয়ার আন্দ্রেই ফেদিয়ায়েভ।
দীর্ঘ এই অভিযানে মহাকাশ গবেষণার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনের রক্ষণাবেক্ষণ এবং বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক পরীক্ষায় অংশ নেন তাঁরা।
এ সময় সোফি আদেনো প্রথম ফরাসি নারী হিসেবে আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনের বাইরে স্পেসওয়াক বা মহাকাশে হাঁটার অভিজ্ঞতা অর্জন করেন। তিনি মোট তিনবার স্পেসওয়াকে অংশ নেন।
পৃথিবীতে ফেরার অভিজ্ঞতাও সহজ ছিল না বলে জানিয়েছেন এই নভোচারী। প্রশান্ত মহাসাগরে অবতরণের পর তাঁদের ক্যাপসুল প্রায় ২৫ মিনিট ঢেউয়ের মধ্যে ছিল।
পৃথিবীতে ফিরে দীর্ঘ সময়ের ওজনহীন পরিবেশের প্রভাব কাটিয়ে উঠতেও শারীরিক পুনর্বাসনের প্রয়োজন হচ্ছে তাঁর।
মহাকাশে অবস্থানকালে শরীরের পেশি, হাড় এবং হৃদ্যন্ত্রের স্বাভাবিক কার্যক্রমে পরিবর্তন আসে। এ কারণে পৃথিবীতে ফিরে নভোচারীদের বিশেষ চিকিৎসা পর্যবেক্ষণ ও অনুশীলনের মধ্য দিয়ে যেতে হয়।
তবে শারীরিক চ্যালেঞ্জের মধ্যেও মহাকাশে কাটানো দিনগুলোর কথা স্মরণ করে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছেন আদেনো।
তাঁর অভিজ্ঞতা শুধু বৈজ্ঞানিক গবেষণার গুরুত্বই তুলে ধরেনি, পৃথিবীকে অভিন্ন আবাসস্থল হিসেবে দেখার একটি মানবিক বার্তাও সামনে এনেছে।

