তরুণ বয়সে পড়াশোনা, পরীক্ষার চাপ, ভবিষ্যৎ ক্যারিয়ার, পারিবারিক প্রত্যাশা, সম্পর্ক এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ব্যবহার মানসিক সুস্থতার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। এ কারণে শারীরিক স্বাস্থ্যের পাশাপাশি তরুণদের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়েও সচেতন হওয়া প্রয়োজন।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাবে, ১০ থেকে ১৯ বছর বয়সী প্রতি সাতজন তরুণের একজন কোনো না কোনো মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যার অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যায়। উদ্বেগ ও বিষণ্নতা কিশোর ও তরুণদের অসুস্থতা ও কর্মক্ষমতা কমে যাওয়ার অন্যতম কারণ।

মানসিক স্বাস্থ্য কেন গুরুত্বপূর্ণ

তরুণ বয়সে মানসিক সুস্থতা শুধু ভালো থাকার সঙ্গে সম্পর্কিত নয়। মানসিক স্বাস্থ্য পড়াশোনা, কাজ, পরিবার, বন্ধুত্ব এবং ভবিষ্যৎ জীবনযাপনের ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যায় আক্রান্ত তরুণরা প্রয়োজনীয় সহায়তা না পেলে তাঁদের শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও সম্পর্কের ওপর দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। সময়মতো সহায়তা এবং নিরাপদ ও সহায়ক পরিবেশ পরিস্থিতির উন্নতিতে ভূমিকা রাখতে পারে।

ঘুমের অভ্যাস ঠিক করা জরুরি

মানসিক সুস্থতার জন্য পর্যাপ্ত ও নিয়মিত ঘুম গুরুত্বপূর্ণ। রাত জেগে পড়াশোনা, কাজ করা বা দীর্ঘ সময় মুঠোফোন ব্যবহার করার অভ্যাস ঘুমের সময়সূচি ব্যাহত করতে পারে।

তাই প্রতিদিন প্রায় একই সময়ে ঘুমাতে যাওয়া ও ঘুম থেকে ওঠার অভ্যাস করা, ঘুমের আগে অতিরিক্ত মুঠোফোন ব্যবহার কমানো এবং ঘুমের জন্য শান্ত পরিবেশ তৈরি করা উপকারী হতে পারে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যেও কিশোরদের স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের অংশ হিসেবে পর্যাপ্ত ঘুম, শারীরিক কার্যক্রম ও স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

নিয়মিত শারীরিক কার্যক্রম

শারীরিক কার্যক্রম শুধু শরীর সুস্থ রাখে না, মানসিক সুস্থতার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। নিয়মিত হাঁটা, খেলাধুলা, ব্যায়াম বা অন্য কোনো পছন্দের শারীরিক কার্যক্রম দৈনন্দিন জীবনের অংশ করা যেতে পারে।

বিশেষ করে দীর্ঘ সময় বসে পড়াশোনা বা কাজ করার মধ্যে ছোট বিরতি নেওয়া এবং বাইরে কিছু সময় কাটানোর অভ্যাস জীবনযাপনে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে ভারসাম্য

তরুণদের দৈনন্দিন জীবনের বড় অংশ এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সঙ্গে যুক্ত। এর মাধ্যমে যোগাযোগ, শেখা ও বিনোদনের সুযোগ থাকলেও অতিরিক্ত বা নিয়ন্ত্রণহীন ব্যবহার মানসিক সুস্থতায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ২০২৫ সালের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রযুক্তি ব্যবহারের প্রভাব জটিল এবং ইতিবাচক ও নেতিবাচক দুই ধরনের ফলই হতে পারে। তবে সাইবার হয়রানি, অবাস্তব শারীরিক সৌন্দর্যের মানদণ্ড এবং ক্ষতিকর আধেয় তরুণদের জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

ইউনিসেফ বাংলাদেশের ২০২৫ সালের একটি তরুণ জরিপেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভুল তথ্যকে মানসিক চাপ তৈরির অন্যতম বড় কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। জরিপে অংশ নেওয়া প্রায় দুই তৃতীয়াংশ তরুণ ও তরুণী অতিরিক্ত ভুল তথ্যকে চাপের উল্লেখযোগ্য কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।

তাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পুরোপুরি বাদ দেওয়ার চেয়ে ব্যবহারে সীমা তৈরি করা, ঘুমের আগে মুঠোফোন থেকে দূরে থাকা এবং ক্ষতিকর আধেয় এড়িয়ে চলা বেশি বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ হতে পারে।

নিজের অনুভূতি নিয়ে কথা বলুন

মানসিক চাপ বা উদ্বেগের বিষয়গুলো নিজের মধ্যে চেপে না রেখে বিশ্বস্ত বন্ধু, পরিবারের সদস্য, শিক্ষক বা অন্য কোনো সহায়ক ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলা গুরুত্বপূর্ণ।

কখনো কখনো সাময়িক মন খারাপ, পরীক্ষার চাপ বা কোনো কঠিন পরিস্থিতি স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া হতে পারে। কিন্তু দীর্ঘ সময় ধরে মন খারাপ থাকা, অতিরিক্ত উদ্বেগ, দৈনন্দিন কাজকর্মে আগ্রহ কমে যাওয়া বা স্বাভাবিক জীবনযাপনে সমস্যা তৈরি হলে বিষয়টিকে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা কিশোরদের জন্য পরিবার, বিদ্যালয় ও সম্প্রদায়ের নিরাপদ ও সহায়ক পরিবেশের ওপর গুরুত্ব দিয়েছে।

পড়াশোনা ও কাজের চাপ সামলানো

একসঙ্গে অনেক কাজ করার চেষ্টা মানসিক চাপ বাড়াতে পারে। তাই বড় কাজকে ছোট ধাপে ভাগ করা, গুরুত্বপূর্ণ কাজের তালিকা তৈরি করা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী বিরতি নেওয়া কার্যকর হতে পারে।

পরীক্ষা বা চাকরির প্রস্তুতির সময় অন্যের সঙ্গে নিজের ফলাফল বা অগ্রগতি তুলনা না করে নিজের নির্দিষ্ট লক্ষ্য অনুযায়ী এগিয়ে যাওয়া মানসিক চাপ কমাতে সাহায্য করতে পারে।

স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন গড়ে তুলুন

মানসিক স্বাস্থ্য ভালো রাখার জন্য প্রতিদিনের জীবনযাপনের কিছু অভ্যাস গুরুত্বপূর্ণ। নিয়মিত ঘুম, পুষ্টিকর খাবার, শারীরিক কার্যক্রম, পর্যাপ্ত বিশ্রাম এবং পরিবার ও বন্ধুদের সঙ্গে ইতিবাচক যোগাযোগ একটি ভারসাম্যপূর্ণ জীবনযাপনে সহায়তা করতে পারে।

একই সঙ্গে ধূমপান, মাদক বা অন্য কোনো ক্ষতিকর অভ্যাস থেকে দূরে থাকা তরুণদের সামগ্রিক স্বাস্থ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে লজ্জা নয়

মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে কথা বলাকে দুর্বলতার লক্ষণ হিসেবে দেখা উচিত নয়। প্রয়োজন হলে মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ, চিকিৎসক বা প্রশিক্ষিত পরামর্শদাতার সহায়তা নেওয়া স্বাভাবিক স্বাস্থ্যসেবারই অংশ।

বাংলাদেশে মানসিক স্বাস্থ্যসেবার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ২০২৫ সালের প্রতিবেদনে দেশটির মানসিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় বিনিয়োগ ও সেবার পরিধি বাড়ানোর গুরুত্ব তুলে ধরা হয়েছে। একই সঙ্গে সংস্থাটি জানিয়েছে, বাংলাদেশে মানসিক স্বাস্থ্যসেবার সক্ষমতা বাড়াতে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

বিদ্যালয় ও পরিবারেও সচেতনতা প্রয়োজন

তরুণদের মানসিক স্বাস্থ্য ভালো রাখার দায়িত্ব শুধু তাঁদের নিজেদের নয়। পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সমাজেরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বাংলাদেশ কার্যক্রমে কিশোরদের সামাজিক ও আবেগীয় দক্ষতা উন্নয়নের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। ২০২৫ সালে বাংলাদেশে সংস্থাটির উদ্যোগে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা শক্তিশালী করার পাশাপাশি কিশোরদের সামাজিক ও আবেগীয় দক্ষতা বিকাশের কার্যক্রমও এগিয়েছে।

পরিবারে সন্তানের কথা মনোযোগ দিয়ে শোনা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সহায়ক পরিবেশ তৈরি এবং প্রয়োজন হলে দ্রুত পরামর্শ বা চিকিৎসার ব্যবস্থা করা তরুণদের মানসিক সুস্থতায় ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে।

কখন পেশাদার সহায়তা প্রয়োজন

মানসিক চাপ বা দুশ্চিন্তা যদি দীর্ঘস্থায়ী হয় এবং পড়াশোনা, কাজ, ঘুম, খাবার বা সামাজিক সম্পর্কের ওপর স্পষ্ট প্রভাব ফেলে, তাহলে পেশাদার সহায়তা নেওয়া উচিত।

মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা নির্ণয় বা চিকিৎসার ক্ষেত্রে নিজে থেকে সিদ্ধান্ত না নিয়ে চিকিৎসক বা মানসিক স্বাস্থ্য পেশাজীবীর পরামর্শ নেওয়া নিরাপদ। দ্রুত সহায়তা পাওয়া অনেক ক্ষেত্রেই সমস্যাকে আরও জটিল হওয়ার আগে মোকাবিলা করতে সাহায্য করতে পারে।

তরুণদের জন্য প্রয়োজন ছোট ছোট পরিবর্তন

মানসিক স্বাস্থ্য ভালো রাখতে সবকিছু একসঙ্গে পরিবর্তন করার প্রয়োজন নেই। প্রতিদিন পর্যাপ্ত ঘুম, নিয়মিত হাঁটা বা ব্যায়াম, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সময়ের সীমা, পড়াশোনার মাঝে বিরতি এবং বিশ্বস্ত মানুষের সঙ্গে যোগাযোগের মতো ছোট অভ্যাস দিয়ে শুরু করা যায়।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো নিজের মানসিক অবস্থাকে গুরুত্ব দেওয়া এবং প্রয়োজন হলে সহায়তা চাওয়া। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সাম্প্রতিক তথ্যও দেখাচ্ছে, তরুণদের মানসিক সুস্থতা রক্ষায় পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা এবং বৃহত্তর সমাজের সমন্বিত ভূমিকা প্রয়োজন।

তরুণ বয়সে তৈরি হওয়া স্বাস্থ্যকর অভ্যাস ভবিষ্যৎ জীবনেও প্রভাব ফেলতে পারে। তাই মানসিক স্বাস্থ্য সচেতনতাকে আলাদা কোনো বিষয় হিসেবে না দেখে দৈনন্দিন স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে দেখা প্রয়োজন।