মানবাধিকার ও আন্তর্জাতিক আইনের পক্ষে লড়াই, নোবেল শান্তি পুরস্কার পেলেন নাভি পিল্লাই

দক্ষিণ আফ্রিকার আইনজ্ঞ ও সাবেক জাতিসংঘ মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার নাভানেথেম ‘নাভি’ পিল্লাই ২০২৬ সালের নোবেল শান্তি পুরস্কার পেয়েছেন। যুদ্ধাপরাধ, মানবতাবিরোধী অপরাধ ও গণহত্যার বিচার নিশ্চিত করা এবং আন্তর্জাতিক আইনকে শক্তিশালী করার ক্ষেত্রে দীর্ঘদিনের ভূমিকার স্বীকৃতি হিসেবে শুক্রবার, ৯ অক্টোবর নরওয়েজীয় নোবেল কমিটি তাঁর নাম ঘোষণা করে।

কমিটির ভাষ্য, আন্তর্জাতিক আইনভিত্তিক বৈশ্বিক ব্যবস্থা জোরদার করতে পিল্লাই সাহস ও নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করেছেন। বিশেষ করে গুরুতর আন্তর্জাতিক অপরাধের জন্য দায়ীদের বিচারের আওতায় আনার ক্ষেত্রে তাঁর অবদানকে স্বীকৃতি দিয়েছে কমিটি।

বর্ণবাদবিরোধী লড়াই থেকে আন্তর্জাতিক আদালতে

১৯৪১ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার ডারবানে ভারতীয় তামিল বংশোদ্ভূত এক পরিবারে জন্ম নেন নাভি পিল্লাই। বর্ণবাদী শাসনামলে বেড়ে ওঠা তাঁর কর্মজীবনের গতিপথে বড় প্রভাব ফেলে। আইন পেশায় যুক্ত হয়ে তিনি বর্ণবৈষম্য ও রাজনৈতিক নিপীড়নের বিরুদ্ধে লড়েছেন এবং দক্ষিণ আফ্রিকায় মানবাধিকারের পক্ষে কাজ করেছেন।

বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলনের সময় রাজনৈতিক বন্দিদের আইনি সহায়তা দেওয়ার অভিজ্ঞতা তাঁর পরবর্তী আন্তর্জাতিক কর্মজীবনের ভিত্তি তৈরি করে। পরবর্তী সময়ে তিনি বিভিন্ন আন্তর্জাতিক আদালত ও জাতিসংঘের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। এসব দায়িত্বে তাঁর কাজের মূল ক্ষেত্র ছিল মানবাধিকারের সুরক্ষা, আন্তর্জাতিক অপরাধের বিচার এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা।

রুয়ান্ডার গণহত্যার বিচারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা

পিল্লাইয়ের কর্মজীবনের উল্লেখযোগ্য অধ্যায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল ফর রুয়ান্ডা। তিনি এ ট্রাইব্যুনালের বিচারক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং পরে এর প্রেসিডেন্ট হন। ১৯৯৪ সালে রুয়ান্ডায় সংঘটিত গণহত্যার বিচারপ্রক্রিয়ায় তাঁর ভূমিকা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বিশেষভাবে আলোচিত হয়।

১৯৯৮ সালে জঁ-পল আকায়েসুর মামলায় ট্রাইব্যুনাল ধর্ষণকে গণহত্যার অংশ হিসেবে বিবেচনার ক্ষেত্রে ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত দেয়। যৌন সহিংসতাকে আন্তর্জাতিক অপরাধের বিচারে কীভাবে মূল্যায়ন করা হবে, সে বিষয়ে এ রায় গুরুত্বপূর্ণ নজির তৈরি করে। আন্তর্জাতিক অপরাধের বিচারব্যবস্থায় যৌন সহিংসতার গুরুত্ব প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রেও এ মামলার প্রভাব রয়েছে।

এরপর পিল্লাই আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) বিচারক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। এ আদালত গণহত্যা, যুদ্ধাপরাধ, মানবতাবিরোধী অপরাধ এবং আগ্রাসনের মতো গুরুতর অপরাধের বিচার করে। আন্তর্জাতিক আইনের আওতায় এসব অপরাধের দায় নির্ধারণ এবং বিচারপ্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে আদালতটির ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।

জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক প্রধান ছিলেন ছয় বছর

২০০৮ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০১৪ সালের আগস্ট পর্যন্ত জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন পিল্লাই। এ পদে থাকাকালে বিভিন্ন দেশে মানবাধিকার লঙ্ঘন, সংঘাতের সময় বেসামরিক মানুষের সুরক্ষা এবং বৈষম্যের বিরুদ্ধে জাতিসংঘের অবস্থান তুলে ধরার দায়িত্বে ছিলেন তিনি।

জাতিসংঘের মানবাধিকার দপ্তরের প্রধান হিসেবে তাঁর কাজের মধ্যে ছিল মানবাধিকার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ, সংশ্লিষ্ট সরকারগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ড অনুসরণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া। এ দায়িত্ব তাঁকে বৈশ্বিক মানবাধিকার ব্যবস্থার অন্যতম পরিচিত ব্যক্তিত্বে পরিণত করে।

পরবর্তী সময়ে তিনি অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ড নিয়ে জাতিসংঘের স্বাধীন তদন্ত কমিশনের নেতৃত্ব দেন। কমিশনটি গাজাসহ অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে সংঘটিত ঘটনাবলি ও আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনের অভিযোগ তদন্ত করে। কমিশনের প্রতিবেদনে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে গণহত্যার অভিযোগসংক্রান্ত সিদ্ধান্তও উঠে আসে। তবে এ ধরনের গুরুতর অভিযোগের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদন, আইনি মূল্যায়ন ও আদালতের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের মধ্যে পার্থক্য রাখা জরুরি।

আন্তর্জাতিক বিচারব্যবস্থায় এখনো সক্রিয়

দীর্ঘ আন্তর্জাতিক কর্মজীবনের পরও পিল্লাই বিচারিক দায়িত্বের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন। আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে (আইসিজে) গাম্বিয়া বনাম মিয়ানমার মামলায় তিনি গাম্বিয়ার মনোনীত অ্যাড হক বিচারক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। মামলাটিতে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে সংঘটিত কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে গণহত্যা সনদ লঙ্ঘনের অভিযোগ বিবেচনা করা হচ্ছে।

জাতিসংঘের প্রধান বিচারিক প্রতিষ্ঠান আইসিজে রাষ্ট্রের মধ্যে আইনি বিরোধ নিষ্পত্তি করে। অন্যদিকে আইসিসি ব্যক্তির বিরুদ্ধে নির্দিষ্ট আন্তর্জাতিক অপরাধের বিচার করে। দুটি প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব আলাদা হলেও আন্তর্জাতিক আইনের প্রয়োগ ও জবাবদিহি প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে উভয়ের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।

পুরস্কার ঘোষণার পর কী বললেন পিল্লাই

পুরস্কার ঘোষণার পর পিল্লাই আন্তর্জাতিক অপরাধের শিকার ব্যক্তিদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান। দ্য গার্ডিয়ানের সরাসরি সংবাদ প্রতিবেদনে বলা হয়, তিনি পুরস্কারটি আন্তর্জাতিক অপরাধের বেঁচে যাওয়া ভুক্তভোগীদের উৎসর্গ করেন এবং আইনের শাসন রক্ষায় সবাইকে একসঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানান।

তাঁর এই প্রতিক্রিয়ায় আন্তর্জাতিক বিচারব্যবস্থার কেন্দ্রীয় একটি প্রশ্ন সামনে আসে—গুরুতর অপরাধের শিকার মানুষের জন্য ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা এবং অপরাধীদের দায়বদ্ধ করা। যুদ্ধ বা রাজনৈতিক সংঘাতের সময়ও আন্তর্জাতিক আইনের প্রয়োগ কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে বিশ্বজুড়ে বিতর্ক রয়েছে।

নাভি পিল্লাইকে পুরস্কার দেওয়ার ঘোষণার পর হিউম্যান রাইটস ওয়াচও তাঁর কাজের প্রশংসা করে। সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক ফিলিপ বলোপিয়ন বলেন, মানবাধিকারকর্মী, তদন্তকারী ও আন্তর্জাতিক বিচারক হিসেবে পিল্লাইয়ের দীর্ঘ কর্মজীবন গুরুতর অপরাধের বিচার এবং আন্তর্জাতিক আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় উল্লেখযোগ্য প্রভাব রেখেছে।

আন্তর্জাতিক আইনের জন্য কী বার্তা

নোবেল শান্তি পুরস্কার সাধারণত সংঘাত নিরসন, শান্তি প্রতিষ্ঠা, মানবাধিকার রক্ষা এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতায় অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে দেওয়া হয়। পিল্লাইয়ের ক্ষেত্রে কমিটি বিশেষভাবে গুরুত্ব দিয়েছে আন্তর্জাতিক আইনকে শক্তিশালী করা এবং গুরুতর অপরাধের বিচার নিশ্চিত করার প্রচেষ্টাকে।

তাঁর পুরস্কারপ্রাপ্তি এমন এক সময়ে এলো, যখন আন্তর্জাতিক আদালতগুলোর এখতিয়ার, যুদ্ধাপরাধের তদন্ত এবং রাষ্ট্রের জবাবদিহি নিয়ে নানা বিতর্ক চলছে। আন্তর্জাতিক আইন থাকলেই যে সব ক্ষেত্রে ন্যায়বিচার নিশ্চিত হবে, এমন নয়; তদন্তের সুযোগ, আদালতের এখতিয়ার, রাষ্ট্রগুলোর সহযোগিতা এবং রায় কার্যকরের সক্ষমতাও গুরুত্বপূর্ণ।

পিল্লাইয়ের দীর্ঘ কর্মজীবন দেখিয়েছে, মানবাধিকার রক্ষায় আইন ও বিচারিক প্রতিষ্ঠান কীভাবে ভূমিকা রাখতে পারে। ২০২৬ সালের নোবেল শান্তি পুরস্কারের মধ্য দিয়ে সেই কাজের স্বীকৃতি দেওয়ার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক অপরাধের বিচার ও আইনের শাসন নিয়ে চলমান বৈশ্বিক আলোচনাও নতুন গুরুত্ব পেয়েছে।