বাংলাদেশের ক্রিকেটে দুর্নীতিবিরোধী অভিযান আরও বিস্তৃত হচ্ছে। বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের ইন্টেগ্রিটি ইউনিটের স্বাধীন চেয়ারম্যান অ্যালেক্স মার্শাল জানিয়েছেন, দুর্নীতির অভিযোগে আরও কয়েকটি তদন্ত এখনো চলমান এবং আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে সেগুলোর কিছু বিষয়ে নতুন ঘোষণা আসতে পারে।
শনিবার মিরপুরে বিসিবি ইন্টেগ্রিটি ইউনিট আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ কথা বলেন। মার্শালের ভাষ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে আটটি মামলার বিষয়ে প্রকাশ্যে পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে সাতজনের বিরুদ্ধে দুর্নীতিবিরোধী বিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ আনা হয়েছে এবং একজনকে ক্রিকেট সংশ্লিষ্ট কার্যক্রম থেকে বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে।
এরপরও তদন্ত শেষ হয়নি। মার্শাল বলেন, আরও কিছু মামলা তদন্তাধীন রয়েছে এবং আগামী কয়েক সপ্তাহে নতুন ঘোষণা প্রত্যাশা করা যেতে পারে। তবে তিনি কোনো তদন্তাধীন ব্যক্তির নাম বা অভিযোগের বিস্তারিত প্রকাশ করেননি। তাঁর বক্তব্য, তদন্ত শেষ হওয়ার আগে এ ধরনের তথ্য প্রকাশ করলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির ন্যায্য শুনানির অধিকার ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
বিসিবির নিজস্ব দুর্নীতিবিরোধী প্রক্রিয়াতেও চলমান তদন্ত গোপন রাখার বিধান রয়েছে। বোর্ডের প্রকাশিত প্রক্রিয়াগত নিয়ম অনুযায়ী, কোনো অভিযোগের বিষয়ে আনুষ্ঠানিক তদন্ত শুরু করা হবে কি না, সে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা ইন্টেগ্রিটি ইউনিটের দায়িত্বপ্রাপ্ত দুর্নীতিবিরোধী কর্মকর্তার হাতে থাকে। অভিযোগ আনার আগে তদন্তাধীন ব্যক্তির নাম প্রকাশ না করা এবং তদন্তের গোপনীয়তা বজায় রাখার কথাও সেখানে বলা হয়েছে।
অ্যালেক্স মার্শাল জানান, তদন্ত শেষে পাওয়া তথ্যকে সাধারণত তিনভাবে মূল্যায়ন করা হয়। শক্তিশালী প্রমাণ পাওয়া গেলে অভিযোগ আনার সুপারিশ করা হয়। অভিযোগ আনার মতো পর্যাপ্ত প্রমাণ না থাকলেও সন্দেহ থেকে গেলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে পর্যবেক্ষণে রাখা হতে পারে। আর কোনো প্রমাণ না মিললে সেই তদন্ত বন্ধ করে দেওয়া হয়।
সাম্প্রতিক দুর্নীতিবিরোধী পদক্ষেপের অংশ হিসেবে গত ১ সেপ্টেম্বর সাবেক বিসিবি পরিচালক ও অডিট কমিটির চেয়ারম্যান মুহাম্মদ মুখলেসুর রহমান শামীম, সাবেক নিরাপত্তা কর্মকর্তা জাকির হোসেন এবং সাবেক বিসিবি কাউন্সিলর রাকিবুল ইসলাম সানির বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগ আনে বিসিবি। অভিযোগগুলোর মধ্যে ম্যাচের ফল বা গতিপ্রকৃতি অনৈতিকভাবে প্রভাবিত করার চেষ্টা, দুর্নীতিতে সহায়তা, দুর্নীতির প্রস্তাব গোপন রাখা এবং তদন্তে সহযোগিতা না করার মতো বিষয় রয়েছে। তিনজনকেই সাময়িকভাবে ক্রিকেট সংশ্লিষ্ট কার্যক্রম থেকে নিষিদ্ধ করা হয়।
মার্শাল আরও জানান, সাম্প্রতিক সময়ে অভিযুক্ত কয়েকজন ইতোমধ্যে তাঁদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ মেনে নিয়েছেন এবং এখন তাঁদের শাস্তি চূড়ান্ত হওয়ার অপেক্ষা চলছে। তবে কারা অভিযোগ স্বীকার করেছেন বা তাঁদের কী ধরনের শাস্তি হতে পারে, সে বিষয়ে তিনি বিস্তারিত জানাননি।
এদিকে গত বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগের নিলামের আগে কয়েকজন স্থানীয় ক্রিকেটারকে বাদ দেওয়া নিয়ে যে আলোচনা তৈরি হয়েছিল, সে বিষয়েও ব্যাখ্যা দিয়েছেন মার্শাল। তিনি বলেন, ওই সুপারিশ শুধু বিপিএলের দ্বাদশ আসরকে কেন্দ্র করে দেওয়া হয়েছিল। সংশ্লিষ্ট ক্রিকেটারদের কেউ তখন আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযুক্ত ছিলেন না এবং অন্য ঘরোয়া প্রতিযোগিতায় তাঁদের খেলায় কোনো নিষেধাজ্ঞাও ছিল না।
ইন্টেগ্রিটি ইউনিটের সাধারণ আইনজীবী মাহিন এম রহমানও জানিয়েছেন, ওই ক্রিকেটারদের বিষয়ে এখনই চূড়ান্তভাবে দোষী বা নির্দোষ বলা যাচ্ছে না। অর্থাৎ তদন্ত বা মূল্যায়নের কোনো পর্যায়ে সন্দেহের তথ্য থাকলেও সেটিই অপরাধ প্রমাণের সমান নয়।
এর আগে বিপিএলের একাধিক আসর নিয়ে ওঠা দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ পর্যালোচনায় বিসিবি একটি স্বাধীন অনুসন্ধান কমিটি গঠন করেছিল। সেই কমিটির প্রতিবেদনে দুর্নীতির অভিযোগের পাশাপাশি প্রশাসনিক দুর্বলতা, খেলোয়াড় সুরক্ষা, নজরদারি এবং ভবিষ্যৎ সংস্কারের বিভিন্ন সুপারিশ উঠে আসে। পরবর্তী সময়ে বিসিবি ইন্টেগ্রিটি ইউনিটকে আরও স্বাধীন কাঠামোয় পরিচালনার উদ্যোগ নেয়।
মার্শালের বক্তব্য অনুযায়ী, ইন্টেগ্রিটি ইউনিটের দায়িত্ব বাংলাদেশের ঘরোয়া ক্রিকেটে দুর্নীতির অভিযোগ তদন্ত করা। সন্দেহজনক কার্যক্রম নিয়ে ক্রিকেটার, কোচ, দলীয় কর্মকর্তা, সাংবাদিক এবং আইসিসিসহ বিভিন্ন উৎস থেকে তথ্য আসে। সেই তথ্যের বিশ্বাসযোগ্যতা যাচাইয়ের পরই আনুষ্ঠানিক তদন্ত শুরু করা হয়।
ফলে এখন নজর থাকবে চলমান তদন্তগুলোর দিকে। ইন্টেগ্রিটি ইউনিটের প্রধান নিজেই আগামী কয়েক সপ্তাহে আরও ঘোষণার ইঙ্গিত দেওয়ায় বাংলাদেশের ক্রিকেটে দুর্নীতিবিরোধী প্রক্রিয়ায় নতুন অভিযোগ, শাস্তি বা অন্য কোনো সিদ্ধান্ত সামনে আসার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা না হওয়া পর্যন্ত কোনো ব্যক্তি বা ক্রিকেটারকে দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত বলে ধরে নেওয়ার সুযোগ নেই।
