বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) Erasmus+ কর্মসূচির আওতায় ‘Jean Monnet Module’ চালু করেছে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়। জলবায়ু পরিবর্তন, ইউরোপীয় ইউনিয়নের নীতিমালা, পরিবেশ ব্যবস্থাপনা ও জলবায়ু-সহনশীল নগর উন্নয়ন নিয়ে তিন বছর মেয়াদি শিক্ষা ও গবেষণা কার্যক্রম পরিচালিত হবে এই উদ্যোগের আওতায়। এতে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগের অন্তত ১০০ জন স্নাতক ও স্নাতকোত্তর শিক্ষার্থী সরাসরি অংশগ্রহণের সুযোগ পাবেন।
বুধবার (৪ নভেম্বর) সকাল সাড়ে ১১টায় খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গবেষণাগারের সম্মেলন কক্ষে মডিউলটির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হয়। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) সদস্য অধ্যাপক ড. মো. আসলাম হোসেন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও গ্রামীণ পরিকল্পনা ডিসিপ্লিনের অধ্যাপক ড. মো. আশিক উর রহমানের প্রস্তাবিত ‘EU Governance, Green Deal and Climate-Resilient Urban Development (EUGREEN-CLIMURBAN)’ শীর্ষক প্রকল্পটি ইউরোপীয় ইউনিয়নের Erasmus+ কর্মসূচির অধীনে Jean Monnet Module হিসেবে নির্বাচিত হয়েছে।
জলবায়ু ও নগর উন্নয়নে গুরুত্ব
এই মডিউলের মূল লক্ষ্য ইউরোপীয় ইউনিয়নের শাসনব্যবস্থা, ইউরোপিয়ান গ্রিন ডিল, পরিবেশ ও জলবায়ুনীতি, টেকসই নগরায়ণ এবং জলবায়ু-সহনশীল উন্নয়ন সম্পর্কে শিক্ষার্থীদের ধারণা দেওয়া।
বিশেষ করে ইউরোপের নীতি ও অভিজ্ঞতার সঙ্গে বাংলাদেশের নগর পরিকল্পনা, পরিবেশ ব্যবস্থাপনা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলার কৌশল তুলনামূলকভাবে বিশ্লেষণ করা হবে। এর মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা আন্তর্জাতিক নীতিকাঠামো সম্পর্কে জানার পাশাপাশি বাংলাদেশের বাস্তব সমস্যার সমাধানে গবেষণার সুযোগ পাবেন।
প্রকল্পটির আওতায় তিন বছরে মোট ৪৮০ ঘণ্টার শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালিত হবে। বিভিন্ন ডিসিপ্লিনের স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ের অন্তত ১০০ জন শিক্ষার্থী সরাসরি যুক্ত হবেন। এ ছাড়া বিভিন্ন একাডেমিক ও জ্ঞান বিনিময় কার্যক্রমের মাধ্যমে পর্যায়ক্রমে ১২০ থেকে ১৫০ জন শিক্ষার্থীকে সম্পৃক্ত করার প্রত্যাশা রয়েছে।
অতিথি বক্তৃতা, সেমিনার ও গবেষণার সুযোগ
নিয়মিত পাঠদানের পাশাপাশি প্রকল্পের আওতায় আন্তর্জাতিক অতিথি বক্তৃতা, বিশেষজ্ঞ সেমিনার, কর্মশালা, শিক্ষার্থীদের ব্যবহারিক প্রকল্প, নীতিসংলাপ এবং গবেষণা কার্যক্রম পরিচালিত হবে। পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের দক্ষতা উন্নয়ন, পাঠ্যক্রম তৈরি ও গবেষণার ফলাফল মূল্যায়নের মতো কাজেও তাঁরা যুক্ত থাকবেন।
এ উদ্যোগে নেদারল্যান্ডসের Utrecht University এবং জার্মানির University of Stuttgart-এর শিক্ষকদের একাডেমিক সম্পৃক্ততার পরিকল্পনা রয়েছে। এর ফলে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের সঙ্গে ইউরোপীয় গবেষক ও শিক্ষাবিদদের জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা বিনিময়ের সুযোগ তৈরি হবে।
মডিউলটির একাডেমিক কার্যক্রমে অধ্যাপক ড. আশিক উর রহমানের নেতৃত্বে নগর ও গ্রামীণ পরিকল্পনা ডিসিপ্লিনের অধ্যাপক ড. মো. জাকির হোসেন, ফরেস্ট্রি অ্যান্ড উড টেকনোলজি ডিসিপ্লিনের অধ্যাপক ড. মো. নাজমুস সাদাত, ব্যবসায় প্রশাসন ডিসিপ্লিনের অধ্যাপক ড. মো. নূরুন্নবী এবং অর্থনীতি ডিসিপ্লিনের অধ্যাপক ড. মো. নাসিফ আহসান যুক্ত থাকবেন।
ইউজিসি ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের বক্তব্য
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ইউজিসি সদস্য অধ্যাপক ড. মো. আসলাম হোসেন বলেন, এই উদ্যোগের অন্যতম উদ্দেশ্য শিক্ষার্থীদের ইউরোপীয় ইউনিয়নের জলবায়ু ও উন্নয়ননীতি সম্পর্কে পরিচিত করা এবং জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে তাঁদের চিন্তাভাবনা ও দৃষ্টিভঙ্গি আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তুলে ধরার সুযোগ তৈরি করা।
তিনি আরও বলেন, শুধু ইউরোপীয় ইউনিয়ন বিষয়ে পাঠদান নয়, বরং ইউরোপের নীতি, অভিজ্ঞতা ও উদ্ভাবনী ধারণাকে বাংলাদেশের বাস্তবতার সঙ্গে তুলনামূলকভাবে বিশ্লেষণ করে শিক্ষার্থী ও গবেষকদের জন্য নতুন জ্ঞানের সুযোগ তৈরি করাই এ উদ্যোগের লক্ষ্য।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. রেজাউল করিম বলেন, উচ্চশিক্ষায় শুধু একাডেমিক উৎকর্ষ অর্জন করলেই হবে না, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও বৈশ্বিক যোগাযোগও বাড়াতে হবে। এই মডিউলের মাধ্যমে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের সঙ্গে ইউরোপীয় গবেষক ও শিক্ষাবিদদের জ্ঞান বিনিময়ের সুযোগ তৈরি হবে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. হারুনুর রশীদ খানও উদ্যোগটিকে দেশের উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার জন্য নতুন সম্ভাবনা হিসেবে উল্লেখ করেন।
উচ্চশিক্ষায় আন্তর্জাতিক সহযোগিতার নতুন অধ্যায়
Jean Monnet Module ইউরোপীয় ইউনিয়নের Erasmus+ কর্মসূচির একটি বিশেষায়িত উদ্যোগ। বিশ্বের বিভিন্ন উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ইউরোপীয় ইউনিয়নবিষয়ক শিক্ষা, গবেষণা ও নীতিসংলাপ সম্প্রসারণে এই কর্মসূচি কাজ করে।
বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো এই মডিউল চালুর মাধ্যমে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইউরোপীয় নীতি, সুশাসন, জলবায়ু পরিবর্তন ও টেকসই নগর উন্নয়ন বিষয়ে দীর্ঘমেয়াদি শিক্ষা ও গবেষণার ভিত্তি তৈরির প্রত্যাশা করা হচ্ছে।
বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের আশা, এই উদ্যোগের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক একাডেমিক অংশীদারত্ব বাড়বে, বিভিন্ন বিষয়ের শিক্ষকদের মধ্যে যৌথ গবেষণার সুযোগ তৈরি হবে এবং শিক্ষার্থীরা আন্তর্জাতিক মানের গবেষণা ও জ্ঞানচর্চার সঙ্গে যুক্ত হতে পারবেন।
