ঘূর্ণিঝড় অর্ণবে বিপর্যস্ত বিশাখাপত্তনম, উত্তাল সমুদ্র ও বিদ্যুৎ বিভ্রাট

বিশাখাপত্তনম, ২৮ অক্টোবর: বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট অতি প্রবল ঘূর্ণিঝড় অর্ণবের প্রভাবে ভারতের অন্ধ্রপ্রদেশের উপকূলীয় শহর বিশাখাপত্তনমে ব্যাপক দুর্যোগ দেখা দিয়েছে। মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর, ভারী বৃষ্টি ও দমকা বাতাসে শহরের বিভিন্ন স্থানে গাছ উপড়ে পড়ে, সড়কে পানি জমে এবং বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যাহত হয়। উপকূলের কাছে সমুদ্র উত্তাল হয়ে ওঠায় সৈকতসংলগ্ন এলাকায়ও সতর্কতা জারি করা হয়।

ভারতের আবহাওয়া অধিদপ্তরের (আইএমডি) ২৮ অক্টোবর সকাল সাড়ে ৫টার বুলেটিন অনুযায়ী, ঘূর্ণিঝড়টির কেন্দ্র পশ্চিম-মধ্য বঙ্গোপসাগরে অন্ধ্রপ্রদেশ উপকূলের খুব কাছে অবস্থান করছিল। ঝড়টি তখন প্রায় স্থির ছিল এবং এর স্থলভাগে প্রবেশের প্রক্রিয়া আরও দুই ঘণ্টা চলতে পারে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়।

বিশাখাপত্তনমে ভারী বৃষ্টি, সড়কে পানি

ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাবে মঙ্গলবার সকাল থেকেই বিশাখাপত্তনমে আবহাওয়ার অবনতি হতে থাকে। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাতাসের তীব্রতা ও বৃষ্টিপাত বাড়ে। শহরের বিভিন্ন সড়ক পানিতে ডুবে যায় এবং নিচু এলাকায় জলাবদ্ধতা তৈরি হয়। উপকূলীয় বিচ রোডে বড় বড় ঢেউ তীরের কাছাকাছি আছড়ে পড়তে দেখা যায়।

বিভিন্ন স্থানে গাছ ও বড় ডালপালা ভেঙে পড়ায় যান চলাচল ব্যাহত হয়। গাছ পড়ে বিদ্যুতের তার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় শহরের একাধিক এলাকায় বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। কিছু এলাকায় বুধবার সকালেও বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক করতে কাজ চলছিল।

টাইমস অব ইন্ডিয়ার প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২৭ অক্টোবর সকাল সাড়ে ৮টা থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত বিশাখাপত্তনমে ২০০ দশমিক ২০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়। শহরটি ঘূর্ণিঝড়ের সম্ভাব্য স্থলভাগে প্রবেশের স্থান থেকে দূরে থাকলেও এর আগাম প্রভাব সেখানে তীব্রভাবে অনুভূত হয়।

ঘণ্টায় ১৫০ কিলোমিটার পর্যন্ত ঝোড়ো বাতাসের আশঙ্কা

আইএমডির পূর্বাভাস অনুযায়ী, ঘূর্ণিঝড় অর্ণবের প্রভাবে অন্ধ্রপ্রদেশ উপকূলে ঘণ্টায় ১১৫ থেকে ১২৫ কিলোমিটার বেগে স্থায়ী বাতাস এবং দমকা হাওয়ায় সর্বোচ্চ ১৪০ কিলোমিটার পর্যন্ত গতিবেগ হতে পারে। ঝড়টির প্রভাবে উপকূলীয় এলাকায় ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টিপাতের আশঙ্কাও ছিল। আবহাওয়া অধিদপ্তর আরও জানিয়েছে, অন্ধ্রপ্রদেশের নিচু উপকূলীয় এলাকায় স্বাভাবিক জোয়ারের উচ্চতার চেয়ে প্রায় ১ থেকে দেড় মিটার বেশি জলোচ্ছ্বাস দেখা দিতে পারে। এতে উপকূলের নিচু এলাকায় পানি ঢুকে পড়ার ঝুঁকি রয়েছে।

অন্ধ্রপ্রদেশ ও ওড়িশায় সতর্কতা, সরানো হয়েছে বাসিন্দাদের

ঘূর্ণিঝড়ের সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতি কমাতে অন্ধ্রপ্রদেশ ও প্রতিবেশী ওড়িশায় আগাম প্রস্তুতি নেওয়া হয়। রয়টার্সের ২৮ অক্টোবরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, দুই রাজ্য থেকে এক লাখ ৮০ হাজারের বেশি মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল। বেশ কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখা হয় এবং কিছু ট্রেন ও বিমান চলাচল বাতিল করা হয়।

অন্ধ্রপ্রদেশের কয়েকটি বিমানবন্দরে কার্যক্রম সাময়িকভাবে বন্ধ রাখার কথাও জানিয়েছে ভারতের বেসামরিক বিমান পরিবহন মন্ত্রণালয়। তবে ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাবে বিদ্যুৎ বিভ্রাট ও গাছপালা উপড়ে পড়ার খবর পাওয়া গেলেও রয়টার্সের ওই প্রতিবেদন প্রকাশের সময় পর্যন্ত অন্ধ্রপ্রদেশ ও ওড়িশায় কোনো প্রাণহানির খবর জানানো হয়নি।

বিশাখাপত্তনম জেলা প্রশাসনও পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রস্তুতি জোরদার করে। ইউনাইটেড নিউজ অব ইন্ডিয়ার (ইউএনআই) প্রতিবেদন অনুযায়ী, জেলার সৈকতগুলো সতর্কতামূলকভাবে বন্ধ রাখা হয়, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও অঙ্গনওয়াড়ি কেন্দ্রগুলোতে দুই দিনের ছুটি ঘোষণা করা হয় এবং জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা দল প্রস্তুত রাখা হয়।

কোথায় আঘাত হানছে ঘূর্ণিঝড় অর্ণব

আইএমডির পূর্বাভাস অনুযায়ী, ঘূর্ণিঝড় অর্ণবের স্থলভাগে প্রবেশের সম্ভাব্য পথ ছিল অন্ধ্রপ্রদেশের বাপটলা থেকে বিশাখাপত্তনমের মধ্যবর্তী উপকূল, ইয়ানামের দক্ষিণ দিক দিয়ে। ২৮ অক্টোবর সকাল সাড়ে ৫টার পর্যবেক্ষণে ঝড়টির কেন্দ্র নারসাপুর থেকে প্রায় ৩০ কিলোমিটার পূর্বে, ইয়ানাম থেকে ৪৫ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে এবং কাকিনাডা থেকে ৭০ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে অবস্থান করছিল।

সকাল সাড়ে ৫টার বুলেটিনে আবহাওয়া অধিদপ্তর জানায়, ঝড়টির কেন্দ্র তখনও বঙ্গোপসাগরে থাকলেও এর উত্তর দিকের বাইরের মেঘবলয় স্থলভাগে প্রবেশ করেছে। পরবর্তী দুই ঘণ্টার মধ্যে স্থলভাগে প্রবেশের প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার সম্ভাবনা ছিল। ঘূর্ণিঝড়টির গতিপথ ও তীব্রতার ওপর নির্ভর করে উপকূলীয় অঞ্চলে বৃষ্টি, প্রবল বাতাস ও জলোচ্ছ্বাসের ঝুঁকি অব্যাহত থাকার আশঙ্কা রয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ, সড়ক যোগাযোগ ও স্বাভাবিক জনজীবন পুরোপুরি ফিরতে কতটা সময় লাগবে, তা তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।