বাংলাদেশে এনজিওগুলোর বিদেশি অনুদান বাড়লেও চাকরি হারানো উন্নয়নকর্মীদের বড় একটি অংশ এখনো কর্মসংস্থানের সংকটে রয়েছেন। এনজিও বিষয়ক ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে জুন পর্যন্ত বিদেশি অনুদানের প্রকৃত অর্থছাড় হয়েছে ১০ হাজার ১৪২ কোটি ৮৭ লাখ ৯৪ হাজার ৯৯৯ টাকা, যা আগের অর্থবছরের তুলনায় প্রায় ১০ শতাংশ বেশি।
তবে অনুদান বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এনজিও খাতে কর্মসংস্থান একই হারে বাড়েনি। এর অন্যতম কারণ হিসেবে গত বছর ইউএসএআইডির অর্থায়ন বন্ধ হয়ে যাওয়ায় উন্নয়ন প্রকল্পে বড় ধরনের ধাক্কা এবং অনেক কর্মীর চাকরি হারানোর বিষয়টি সামনে এসেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশে ইউএসএআইডির অর্থায়নে চলা ৫৯টি প্রকল্পের মধ্যে ৫৫টি বন্ধ হয়ে যায়। এর ফলে বিভিন্ন উন্নয়ন সংস্থা ও প্রকল্পে কর্মরত হাজারো মানুষ চাকরি হারান। চাকরি হারানোদের একটি অংশ পরবর্তীতে নতুন কর্মসংস্থান পেলেও অনেকে এখনো কাজের সন্ধানে রয়েছেন।
চাকরি হারানো উন্নয়নকর্মীদের সংগঠন Association of Unemployed Development Professionals বা AUDP-এর দাবি, ইউএসএআইডির সহায়তা বন্ধের পর বাংলাদেশে প্রায় ৫০ হাজার উন্নয়নকর্মী চাকরি হারিয়েছিলেন। সংগঠনটির হিসাবে, তাদের মধ্যে প্রায় ৩০ হাজার মানুষ এখনো বেকার রয়েছেন। এই সংখ্যা সংগঠনটির দাবি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
অন্যদিকে এনজিও বিষয়ক ব্যুরোর পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে, বিদেশি অনুদানের প্রবাহ উল্টো বেড়েছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে প্রকৃত অর্থছাড় ছিল ৯ হাজার ২২০ কোটি ৪০ লাখ টাকা। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা বেড়ে ১০ হাজার ১৪২ কোটি ৮৭ লাখ টাকায় দাঁড়িয়েছে।
তবে একই সময়ে অনুমোদিত প্রকল্পের সংখ্যা কমেছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ১ হাজার ৮৩৬টি প্রকল্পের বিপরীতে অর্থছাড় হলেও ২০২৫-২৬ অর্থবছরে অনুমোদিত প্রকল্পের সংখ্যা ছিল ১ হাজার ৬৫৪টি। অর্থাৎ প্রকল্প কমলেও বড় আকারের কিছু অর্থায়নের কারণে মোট বিদেশি অনুদানের অর্থছাড় বেড়েছে।
বিদেশি অনুদানের খাতভিত্তিক তথ্যেও এর একটি চিত্র পাওয়া যায়। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সবচেয়ে বেশি অর্থছাড় হয়েছে স্বাস্থ্য খাতে, প্রায় ২ হাজার ৯৭৪ কোটি টাকা। সামাজিক উন্নয়ন খাতে এসেছে প্রায় ১ হাজার ২৬১ কোটি টাকা।
এনজিও খাতের প্রতিনিধিদের মতে, বিদেশি অর্থায়নের বড় একটি অংশ এখন রোহিঙ্গা মানবিক সহায়তা ও বড় আকারের প্রকল্পে কেন্দ্রীভূত হচ্ছে। ফলে সামগ্রিকভাবে অনুদানের পরিমাণ বাড়লেও ছোট ও মাঝারি এনজিও এবং আগের প্রকল্পভিত্তিক কর্মীদের জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগ একই অনুপাতে বাড়ছে না।
বিশেষ করে কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শিবিরকেন্দ্রিক কার্যক্রমে এখনো বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ও স্থানীয় উন্নয়ন সংস্থায় কর্মসংস্থানের সুযোগ রয়েছে। ২০২৬ সালেও রোহিঙ্গা সহায়তা প্রকল্পে বিভিন্ন পদে নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি দেখা যাচ্ছে।
তবে এসব চাকরির সুযোগ আগের ইউএসএআইডি প্রকল্পে কাজ করা প্রত্যেক কর্মীর জন্য সরাসরি উপযোগী নয়। আন্তর্জাতিক এনজিওগুলোর প্রতিনিধিদের বক্তব্য অনুযায়ী, ইউএসএআইডি প্রকল্পে কাজ করা অনেক কর্মী তুলনামূলক ভালো বেতন ও বিশেষায়িত পরিবেশে কাজ করতেন। ফলে একই ধরনের পদে স্থানীয় বা ছোট এনজিওতে চাকরি নেওয়া অনেকের জন্য সহজ হচ্ছে না।
এদিকে এনজিও বিষয়ক ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে বর্তমানে বিদেশি অর্থায়নে কাজ করছে ২ হাজার ৮০২টি নিবন্ধিত স্থানীয় ও বিদেশি সংস্থা। এর মধ্যে প্রায় ২ হাজার ৫০৮টি দেশীয় এবং ২৯৪টি বিদেশি এনজিও।
বিশ্বজুড়েও উন্নয়ন ও মানবিক সহায়তা খাতে অর্থায়নের চাপ রয়েছে। জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা UNHCR সম্প্রতি ২০২৭ সালের বাজেট কমানোর পরিকল্পনা জানিয়েছে এবং বৈশ্বিক সহায়তা কমে যাওয়াকে এর অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছে। বাংলাদেশের রোহিঙ্গা পরিস্থিতিতেও আন্তর্জাতিক অর্থায়নের ঘাটতি নিয়ে জাতিসংঘ উদ্বেগ জানিয়েছে।
ফলে বাংলাদেশের এনজিও খাতে বর্তমান চিত্রটি কিছুটা বৈপরীত্যপূর্ণ। একদিকে বিদেশি অনুদানের মোট প্রবাহ বাড়ছে, অন্যদিকে প্রকল্পের ধরন, অর্থায়নের কেন্দ্রীভবন এবং আগের প্রকল্প বন্ধ হওয়ার কারণে অনেক উন্নয়নকর্মীর চাকরির সংকট রয়ে গেছে।
এখন বড় প্রশ্ন হলো, বিদেশি অনুদানের এই বাড়তি প্রবাহ কতটা নতুন প্রকল্প ও টেকসই কর্মসংস্থানে রূপ নেয় এবং চাকরি হারানো উন্নয়নকর্মীদের কতজন আবার তাদের অভিজ্ঞতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কাজে ফিরতে পারেন।



