এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষায় এক বা দুই বিষয়ে অকৃতকার্য ৪ লাখ ২২ হাজার ৯০৫ শিক্ষার্থীর জন্য মাত্র এক মাসের মধ্যে পুনঃপরীক্ষা আয়োজন করতে যাচ্ছে সরকার। ডিসেম্বরের ২ তারিখ থেকে পরীক্ষা শুরু করে একই মাসের ৩১ তারিখের মধ্যে খাতা মূল্যায়ন ও ফল প্রকাশের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। তবে এত বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীর পরীক্ষা, প্রশ্নপত্র তৈরি, কেন্দ্র ব্যবস্থাপনা এবং ফল প্রকাশের পুরো প্রক্রিয়া নির্ধারিত সময়ের মধ্যে শেষ করা কতটা সম্ভব, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
দ্য ডেইলি স্টারের ১ নভেম্বর প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে শিক্ষা বোর্ডগুলোর এই আয়োজনের সক্ষমতা নিয়ে উদ্বেগ তুলে ধরা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অল্প সময়ের মধ্যে এত বড় পরীক্ষার আয়োজন করতে হলে শিক্ষা বোর্ডগুলোকে একসঙ্গে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ কাজ সম্পন্ন করতে হবে।
এক বা দুই বিষয়ে ফেল করেছেন ৪ লাখ ২২ হাজার শিক্ষার্থী
২০২৬ সালের এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষায় দেশের ১১টি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে মোট ৫ লাখ ৯৪ হাজার ১১৩ জন শিক্ষার্থী অকৃতকার্য হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে এক বিষয়ে ফেল করেছেন ২ লাখ ৯৮ হাজার ৪০ জন এবং দুই বিষয়ে ফেল করেছেন ১ লাখ ২৪ হাজার ৮৬৫ জন।
সব মিলিয়ে এক বা দুই বিষয়ে অকৃতকার্য শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৪ লাখ ২২ হাজার ৯০৫। তাঁদের শুধু যেসব বিষয়ে অকৃতকার্য হয়েছেন, সেসব বিষয়েই আবার পরীক্ষা দেওয়ার সুযোগ দেওয়া হবে।
শিক্ষার্থীদের একটি শিক্ষাবর্ষ নষ্ট হওয়া ঠেকাতে এই উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পরিকল্পনা অনুযায়ী, পুনঃপরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলে শিক্ষার্থীরা পরবর্তী শিক্ষাবর্ষের অপেক্ষা না করেই উচ্চশিক্ষায় ভর্তির প্রক্রিয়ায় অংশ নেওয়ার সুযোগ পাবেন।
এবার এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষায় সম্মিলিত পাসের হার ছিল ৫২ দশমিক ১২ শতাংশ। গত বছর এই হার ছিল ৫৮ দশমিক ৮৩ শতাংশ।
২ ডিসেম্বর থেকে পরীক্ষা, মাসের মধ্যেই ফল
শিক্ষা বোর্ডের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, আগামী ২ ডিসেম্বর বিশেষ পুনঃপরীক্ষা শুরু করার পরিকল্পনা চূড়ান্ত হয়েছে। ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে পরীক্ষা গ্রহণ, উত্তরপত্র মূল্যায়ন এবং ফল প্রকাশের কাজ শেষ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান এবং আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটির সভাপতি অধ্যাপক সৈয়দ আখতারুজ্জামান ২ নভেম্বর দ্য ডেইলি স্টারকে এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
তিনি জানিয়েছেন, ডিসেম্বরের মধ্যেই তিনটি কাজ শেষ করতে হবে। পুরো প্রক্রিয়ার জন্য নির্ধারিত সময়সীমা আরও কমানোর সুযোগ নেই বলেও উল্লেখ করেছেন তিনি।
এর আগে ৩১ অক্টোবর এইচএসসি পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন এক মাসের মধ্যে বিশেষ পরীক্ষা আয়োজনের পরিকল্পনার কথা জানিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, শিক্ষার্থীদের প্রস্তুতির জন্য পর্যাপ্ত সময় দিতে হবে। আবার পরীক্ষা বেশি দেরিতে হলে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির প্রক্রিয়ায় সমস্যা তৈরি হতে পারে।
প্রশ্নপত্র তৈরি থেকে ফল প্রকাশ, বড় কর্মযজ্ঞ
৪ লাখের বেশি শিক্ষার্থীর পুনঃপরীক্ষা আয়োজন করতে শিক্ষা বোর্ডগুলোকে একাধিক ধাপে কাজ করতে হবে। প্রতিটি বিষয়ের জন্য প্রশ্নপত্র তৈরি, মুদ্রণ ও নিরাপদে বিতরণের পাশাপাশি পরীক্ষার কেন্দ্র নির্ধারণ এবং প্রয়োজনীয় জনবল নিশ্চিত করতে হবে।
এরপর নির্ধারিত সময়ে পরীক্ষা গ্রহণ, উত্তরপত্র সংগ্রহ, পরীক্ষকদের কাছে বিতরণ এবং মূল্যায়নের কাজ শেষ করতে হবে। সবশেষে ফলাফল প্রস্তুত ও প্রকাশ করতে হবে।
একই সময়ে একাধিক বোর্ডের অধীনে বিপুলসংখ্যক পরীক্ষার্থীর পরীক্ষা নেওয়ার ক্ষেত্রে সমন্বয়ও গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে পরীক্ষার্থীদের বিষয়ভিত্তিক সংখ্যা, কেন্দ্রের ধারণক্ষমতা এবং পরীক্ষকদের প্রাপ্যতা বিবেচনায় নিতে হবে।
এত অল্প সময়ে প্রতিটি ধাপ সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করা শিক্ষা বোর্ডগুলোর জন্য বড় সাংগঠনিক চ্যালেঞ্জ হতে পারে। তবে এ বিষয়ে বোর্ডগুলোর নির্দিষ্ট জনবল পরিকল্পনা, কেন্দ্রসংখ্যা কিংবা মূল্যায়ন ব্যবস্থার বিস্তারিত তথ্য এখনো প্রকাশিত হয়নি।
শিক্ষার্থীদের প্রস্তুতির সময় নিয়েও উদ্বেগ
পুনঃপরীক্ষার সময় নির্ধারণে শিক্ষার্থীদের প্রস্তুতির বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে। শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন জানিয়েছেন, ফল প্রকাশের সাত বা ১৫ দিনের মধ্যে পরীক্ষা নেওয়া সম্ভব হলেও এতে শিক্ষার্থীরা পর্যাপ্ত প্রস্তুতির সুযোগ নাও পেতে পারেন।
অন্যদিকে, দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হলে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি কার্যক্রমে অংশ নেওয়ার ক্ষেত্রে তাঁদের সমস্যা হতে পারে। এ কারণে পরীক্ষা ও ভর্তি কার্যক্রমের মধ্যে সমন্বয় রাখার চেষ্টা করছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়।
শিক্ষার্থীদের জন্য এটি যেমন নতুন সুযোগ, তেমনি অল্প সময়ে আবার পরীক্ষার প্রস্তুতি নেওয়াও সহজ হবে না। বিশেষ করে যাঁরা একাধিক বিষয়ে অকৃতকার্য হয়েছেন, তাঁদের জন্য নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রস্তুতি সম্পন্ন করা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।
পুনর্নিরীক্ষণের ফল প্রকাশ ২৭ নভেম্বর
এদিকে এইচএসসি পরীক্ষার ফল পুনর্নিরীক্ষণের আবেদন গ্রহণ চলছে। ১ নভেম্বর থেকে শুরু হওয়া এই আবেদন প্রক্রিয়া চলবে ৭ নভেম্বর পর্যন্ত।
শিক্ষা বোর্ডের নির্ধারিত প্রক্রিয়ায় আবেদন গ্রহণের পর পুনর্নিরীক্ষণের ফল ২৭ নভেম্বর প্রকাশের পরিকল্পনা রয়েছে।
পুনর্নিরীক্ষণে যেসব শিক্ষার্থীর ফল পরিবর্তন হবে, তাঁদের বিষয়টি বিশেষ পুনঃপরীক্ষার চূড়ান্ত তালিকা তৈরির ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। ফলে পুনঃপরীক্ষার প্রস্তুতির পাশাপাশি পুনর্নিরীক্ষণের ফল প্রকাশের সময়ও শিক্ষা বোর্ডগুলোর জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
শিক্ষাবর্ষ বাঁচানোর উদ্যোগ, বাস্তবায়নই বড় পরীক্ষা
এক বা দুই বিষয়ে অকৃতকার্য শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ পরীক্ষার সুযোগ দেওয়ার উদ্দেশ্য হলো তাঁদের শিক্ষাজীবনের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা। এতে এক বছর অপেক্ষা না করেই উত্তীর্ণ হওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।
তবে এত বড় পরিসরে পরীক্ষা আয়োজনের ক্ষেত্রে তাড়াহুড়া করতে গিয়ে প্রশ্নপত্রের মান, পরীক্ষার নিরাপত্তা, উত্তরপত্র মূল্যায়ন ও ফলাফলের নির্ভুলতা যেন ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে।
শিক্ষার্থীদের জন্য নতুন সুযোগটি কতটা কার্যকর হবে, তা নির্ভর করছে শিক্ষা বোর্ডগুলোর প্রস্তুতি ও নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পুরো প্রক্রিয়া শেষ করার সক্ষমতার ওপর।
